

ভারতীয় ক্রীড়ার খনি সোনিপত। ছবি - Google
সোনিপতের সাফল্য কোনও একটি খেলায় আটকে নেই। ২০২৬ সালের এশিয়ান গেমসে জেলার খেলোয়াড়েরা হকি, কাবাডি, কুস্তি, অ্যাথলেটিক্স এবং তিরন্দাজিতে নিজেদের দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। ভারতীয় মহিলা ও পুরুষ হকি দল, মহিলা ও পুরুষ কাবাডি দল—সব ক্ষেত্রেই সোনিপতের খেলোয়াড়দের অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। পুরুষ হকির সেমিফাইনালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের জয়সূচক গোলও করেন সোনিপতের অভিষেক নাইন। সব মিলিয়ে জেলার খেলোয়াড়েরা ১৩টি সোনা-সহ মোট ১৫টি পদক জেতেন।
ভারতের ক্রীড়াক্ষেত্রে হরিয়ানার অবদান নতুন নয়। কুস্তি, হকি, কবাডি থেকে শুরু করে তিরন্দাজি ও অ্যাথলেটিক্স—বিভিন্ন খেলায় দেশের সাফল্যের পিছনে বার বার উঠে এসেছে এই রাজ্যের খেলোয়াড়দের নাম। সেই হরিয়ানার সোনিপত এখন কার্যত ভারতের পদক তৈরির অন্যতম কেন্দ্র। ২০২৬ সালের এশিয়ান গেমসে এই জেলার খেলোয়াড়েরা ১৩টি সোনা জিতে দেশের সাফল্যে বড়ো ভূমিকা নিয়েছেন। কিন্তু এই সাফল্যের গল্প শুধুই প্রতিভা কিংবা উন্নত পরিকাঠামোর নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পরিবারের ত্যাগ, গ্রামের মানুষের সহযোগিতা, সীমিত সুযোগের মধ্যে অনুশীলন এবং ছোটবেলা থেকে তৈরি হওয়া খেলাধুলার সংস্কৃতি।
সোনিপতের ক্রীড়াসাফল্যের অন্যতম বড় দিক হল, এখানে খেলোয়াড় তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয় অনেক সময় বাড়ির উঠোন কিংবা চাষের জমি থেকেই। কুশল দালালের কথাই ধরা যাক। প্রথমে বক্সিং শুরু করলেও পরে সেই খেলা ছেড়ে তিরন্দাজির দিকে ঝোঁকেন তিনি। কাউকে ঘুষি মারার খেলায় তাঁর মন বসেনি। তুলনায় শান্তির খেলায় বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করেছিলেন কুশল। পরিবারের কাছে নিজের ইচ্ছার কথা জানাতেই তাঁরা বাধা দেননি। বরং ছেলের নতুন স্বপ্ন পূরণের জন্য এগিয়ে এসেছেন। কিন্তু সমস্যা ছিল অনুশীলনের জায়গা নিয়ে। আশপাশে তিরন্দাজির উপযুক্ত ব্যবস্থা না থাকায় সিওয়াঙ্কা গ্রামের পাঁচ একর জমির একটি অংশ পরিষ্কার করে তৈরি করা হয় অনুশীলনের জায়গা। ধানের খড় দিয়ে বানানো হয় লক্ষ্যভেদ করার নিশানা। আধুনিক পরিকাঠামোর অভাবকে এ ভাবেই নিজেদের উদ্যোগে সামলানোর চেষ্টা করে কুশলের পরিবার। এই ঘটনা বুঝিয়ে দেয়, সোনিপতের ক্রীড়াসাফল্যের পিছনে শুধু প্রতিযোগিতার মঞ্চে পাওয়া পদক নেই; রয়েছে ঘরের মানুষের বিশ্বাস এবং সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার মানসিকতা।
সোনিপতের সাফল্য কোনও একটি খেলায় আটকে নেই। ২০২৬ সালের এশিয়ান গেমসে জেলার খেলোয়াড়েরা হকি, কাবাডি, কুস্তি, অ্যাথলেটিক্স এবং তিরন্দাজিতে নিজেদের দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। ভারতীয় মহিলা ও পুরুষ হকি দল, মহিলা ও পুরুষ কাবাডি দল—সব ক্ষেত্রেই সোনিপতের খেলোয়াড়দের অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। পুরুষ হকির সেমিফাইনালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের জয়সূচক গোলও করেন সোনিপতের অভিষেক নাইন। সব মিলিয়ে জেলার খেলোয়াড়েরা ১৩টি সোনা-সহ মোট ১৫টি পদক জেতেন।
এই সাফল্যের পিছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের পরিশ্রম এবং প্রশিক্ষণের ধারাবাহিকতা। স্পোর্টস অথরিটি অফ ইন্ডিয়ার কেন্দ্র, হরিয়ানা স্পোর্টস ইউনিভার্সিটির মতো প্রতিষ্ঠান খেলোয়াড়দের প্রশিক্ষণ ও উন্নতির সুযোগ করে দিচ্ছে। পাশাপাশি রয়েছে স্থানীয় প্রশিক্ষণকেন্দ্র, আখড়া এবং গ্রামভিত্তিক খেলাধুলার পরিবেশ। অনেক পরিবারের কাছেই খেলাধুলা এখন নিছক শখ নয়, বরং দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করার এবং নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার পথ।
মহিলা হকির ক্ষেত্রেও এই পরিবর্তন বিশেষভাবে চোখে পড়ার মতো। ভারতের মহিলা হকি দলের প্রাক্তন অধিনায়ক প্রীতম রানি সিওয়াচের অ্যাকাডেমিতে প্রায় ২০০ জন খেলোয়াড় প্রশিক্ষণ নেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ১৫০ জনই মেয়ে। একসময় মেয়েদের খেলাধুলায় অংশ নেওয়া নিয়ে সামাজিক বাধা থাকলেও এখন সেই ছবিতে বদল এসেছে। পরিবারগুলির আগ্রহ এবং প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ায় আরও বেশি মেয়ে মাঠে নামছেন।
ভারতীয় মহিলা হকি দলের মিডফিল্ডার নেহা গোয়ালের অভিজ্ঞতাও এই বদলের ইঙ্গিত দেয়। একটি ম্যাচে সেরা খেলোয়াড় হওয়ার জন্য পাওয়া ২,০০০ টাকার পুরস্কার তাঁর কাছে শুধু অর্থ ছিল না; তা হয়ে উঠেছিল হকিকে নিজের দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করার অনুপ্রেরণা। এই ধরনের ছোট ছোট প্রাপ্তি এবং স্বীকৃতি খেলোয়াড়দের এগিয়ে যাওয়ার শক্তি জোগায়।
সোনিপতের ক্রীড়াসংস্কৃতির মূল শক্তি হল পরিবার এবং সমাজের অংশগ্রহণ। কোনও খেলোয়াড়কে তৈরি করতে প্রয়োজন বছরের পর বছর অনুশীলন, সঠিক খাবার, প্রশিক্ষণ এবং প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারকে নিজেদের জমি, সময় এবং অর্থ ব্যয় করতে হয়। কোথাও তৈরি হয় অস্থায়ী অনুশীলনকেন্দ্র, কোথাও স্থানীয় প্রশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে গড়ে ওঠে নতুন প্রতিভা। এই ব্যবস্থার প্রতিটি স্তর একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত।
তবে শুধু প্রতিভা থাকলেই আন্তর্জাতিক পদক আসে না। প্রয়োজন নিয়মিত অনুশীলন, প্রতিযোগিতার চাপ সামলানোর ক্ষমতা এবং ব্যর্থতার পরেও ফিরে আসার মানসিকতা। সোনিপতের খেলোয়াড়েরা সেই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই এগিয়ে চলেছেন। তাঁদের সাফল্য নতুন প্রজন্মকে খেলাধুলায় আসতে উৎসাহ দিচ্ছে, আর নতুন খেলোয়াড়দের উপস্থিতি আরও শক্তিশালী করছে প্রশিক্ষণের পরিবেশকে।
সোনিপতের এই পদক-উৎসব তাই এক জেলার সাফল্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি দেখাচ্ছে, সঠিক দিশা, পরিবারের সমর্থন, স্থানীয় উদ্যোগ এবং প্রশিক্ষণের সুযোগ একসঙ্গে মিললে দেশের প্রত্যন্ত এলাকা থেকেও আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড় উঠে আসতে পারেন। পদকের ঝলকানি দেখা যায় মঞ্চে, কিন্তু সেই সোনালি সাফল্যের ভিত তৈরি হয় মাঠে, আখড়ায়, অ্যাকাডেমিতে - কখনও বা ধানের খড় দিয়ে বানানো লক্ষ্যভেদের নিশানার সামনে।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার সিনিয়র ক্রীড়া সাংবাদিক। দুটি ফুটবল বিশ্বকাপ এবং দুটি ক্রিকেট বিশ্বকাপ কভার করা এই সাংবাদিকের একাধিক আরও আন্তর্জাতিক ইভেন্ট করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে। শুভ্র দুটি বইও লিখেছেন, একটা বিশ্বকাপের গল্প যুদ্ধ এবং শেষটি স্বপ্নের নায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো।
