

ময়দানের সেরা গোলগেটার চিমা। ছবি - Google
১৯৮৫-র জুলাই মাসে কলকাতা লিগে মহামেডান স্পোর্টিংয়ের হয়ে মাত্র ১৭ বছরে চিমার অভিষেক হয়। দুই বছর মহামেডানে খেলেই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন তিনি ভারতে থাকতে এসেছেন। সেইসময় চিমা নামেই ছিল আতঙ্ক, বড় দলের ডিফেন্ডাররা তাঁকে ভয় পেতেন।
একটা সময় কলকাতা ময়দানের সেই চেনা গর্জন ছিল, চি-ই-মা… চি-ই-মা। তাঁর মতো বিদেশী গোলগেটার কলকাতা ময়দানে আর আসেনি। ডি বক্সে চিমা ওকোরির মতো ভয়ঙ্কর স্ট্রাইকারকে কলকাতা ময়দানের ফুটবল সমর্থকরা এখনও ভোলেনি। চিমা মানেই ভরসার নাম, চিমা মানেই নির্ভরতা, ঠিক গোল করে দেবেন।
আজ, ৮ অক্টোবর এই বিধ্বংসী স্ট্রাইকারের জন্মদিন। ৫৭টি বসন্ত পেরিয়ে তিনি পা দিলেন ৫৮ বছরে। বর্তমানে চিমা থাকেন ইংল্যান্ডের সাসেক্সে, সেখানে তিনি ফুটবলারদের এজেন্ট হিসেবে কাজ করেন। কলকাতায় থাকাকালীন তাঁর পাকাপাকি ঠিকানা ছিল দেশপ্রিয় পার্কে। সেখানে থাকতে থাকতেই বিয়ে করেন কলকাতার অ্যাংলো ইন্ডিয়ান তরুণী ক্যাথিকে, পরে অবশ্য তাঁর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়ে গিয়েছিল।
চিমা মানে কলকাতা ময়দানের এক সোনালি অধ্যায়। তিনি তিনবারের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছিলেন। ১৯৮৭ সালে মহামেডান স্পোর্টিংয়ের হয়ে চিমার নামের পাশে ছিল ২৬টি গোল, কলকাতা লিগে ওই গোলের রেকর্ড আজও অমলিন হয়ে রয়েছে। তবে তিনি বেশি সফল লাল হলুদ জার্সি পরেই। ইস্টবেঙ্গলের ইতিহাসে চিমাই সর্বোচ্চ গোলের মালিক, মোট ১৩১টি গোল করেছেন এই ক্লাবের হয়ে। তিনি ভাঙেন পঞ্চপাণ্ডবের সদস্য ধনরাজের ১২৭টি গোলের নজির। চিমা এই গোলগুলি করেছিলেন মাত্র তিনটি মরশুমেই।
১৯৮৫-র জুলাই মাসে কলকাতা লিগে মহামেডান স্পোর্টিংয়ের হয়ে মাত্র ১৭ বছরে চিমার অভিষেক হয়। দুইবছর মহামেডানে খেলেই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন তিনি ভারতে থাকতে এসেছেন। সেইসময় চিমা নামেই ছিল আতঙ্ক, বড় দলের ডিফেন্ডাররা তাঁকে ভয় পেতেন। ১৯৮৪ সালে নাইজেরিয়া থেকে স্থাপত্যবিদ্যা পড়তে বিশাখাপত্তনমে আসেন চিমা। পড়তে পড়তেই চন্ডীগড় ইলেভেনে নাম লেখানো, ফুটবল বোদ্ধাদের চোখে পড়া, হায়দরাবাদ একাদশের হয়ে ডুরান্ডে খেলা, কলকাতার মহমেডান স্পোর্টিংয়ের রিক্রুটারদের চোখে পড়া। পথভ্রষ্ট মজিদ বাসকার, জঘন্য ফর্মের খাবাজি ও ১৯৮৫-তে ইস্টবেঙ্গলে চলে যাওয়া জামসিদ নাসিরি-র অভাব ঢেকে দেওয়ার বিদেশী ফুটবলার পেয়ে গেল মহমেডান স্পোর্টিং।
১৯৮৫-৮৬ মহমেডান স্পোর্টিংয়ের হয়ে কলকাতা মাঠে কাঁপন ধরিয়ে দিলেন চিমা। ১৯৮১ সালের পরে আবার জনজোয়ার দেখা গেল তাদের মাঠে। ১৯৮৭ সালে মহামেডান থেকে চিমাকে ছিনিয়ে নিল ইস্টবেঙ্গল। সেইসময় ময়দানে জীবন-পল্টুর রমরমা, তাঁরা রাতের অন্ধকারে ফুটবলারদের ‘কিডন্যাপ’ করে নিজেদের ডেরায় নিয়ে আসতেন। সেইভাবেই ইলিয়ট রোডের মেসবাড়ি থেকে লাল হলুদ কর্তারা চিমাকে ইস্টবেঙ্গলের গাড়িতে তুলে এনে পরেরদিন দুপুরেই আইএফএ অফিসে সই করালেন।
১৯৮৭ থেকে ১৯৯০, টানা চার বছর ময়দানের সর্বোচ্চ বেতন পাওয়া ইস্টবেঙ্গল ফুটবলার ছিলেন চিমা। ওই সময়েই তাঁর সুপারস্টার হিসাবে উত্তরণ। ময়দানের তৎকালীন সূত্র অনুযায়ী ১৯৯০ সালে ইস্টবেঙ্গলে চিমার দর ছিল ২ লক্ষ ৭৫ হাজার টাকা। কৃশানু, বিকাশকে পাশে পেয়ে প্রায় অপ্রতিরোধ্য তখন ওই নাইজেরিয়ান। বিপক্ষ রক্ষণকে গুঁড়িয়ে দিয়ে ৪ বছরে ১৬২টি গোল করেন তিনি। ইস্টবেঙ্গলে থাকাকালীন চার বছরের মধ্যে ১৯৮৮তে কিছুদিনের জন্য দেশে ফিরে যান চিমা। বাকি তিনবারে কলকাতা লিগে মোট ৫২টি গোল করে তিনবারই কলকাতা লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছিলেন ‘কালো চিতা’।
এল সেই ১৯৯১ সাল। সেই বছর মোহনবাগানের হয়ে সই করেছিলেন চিমা। ময়দানের তৎকালীন সূত্র অনুযায়ী, রেকর্ড আট লক্ষ টাকার বিনিময়ে। তিনিই ছিলেন মোহনবাগানের প্রথম বিদেশী ফুটবলার। দু’ধাপে ৫ বছর মোহনবাগানে খেলেন তিনি। ১৯৯১, ১৯৯২, ১৯৯৭, ১৯৯৮ এবং ১৯৯৯। ১৯৯২ সালে কৃশানু, বিকাশকে আবার পাশে পেয়েছিলেন চিমা। ১৯৯৭-৯৮য়ে চাটুনি-র কোচিংয়ে মোহনবাগানের প্রথম জাতীয় লিগ জেতার পিছনে যথেষ্ঠ অবদান ছিল চিমার। ১৯৯৭ ঘরোয়া মরশুমে অমল দত্তর ডায়মন্ড সিস্টেমের অন্যতম উজ্জ্বল হিরে তিনি। মোহনবাগানের হয়ে কলকাতা লিগে চারবার সর্বোচ্চ স্কোরার হন তিনি। চারবারে গোল করেন মোট ৪৮টি। কলকাতা লিগে সাতবার টপ স্কোরার আর কেউ কোনওদিন হননি।
কলকাতা ডার্বিতে তার গোলসংখ্যা ছিল ১৬টি। লাল হলুদের হয়ে ১০ এবং সবুজ মেরুনের হয়ে ৬টি। কলকাতার তিন প্রধান দলের হয়ে তাঁর করা গোলসংখ্যা ছিল ২৮০টি। মহমেডানের হয়ে ৫৪টি, ইস্টবেঙ্গলের হয়ে ১২২টি ও মোহনবাগানের হয়ে ১০৪টি।
১৯৯৩ থেকে ১৯৯৬র মধ্যে ৫টি বিদেশী দলের হয়েও খেলেছেন তিনি। আবার ভারতে ফিরে ২০০১-০২ মরশুমে বেঙ্গল মুম্বাই এফ সি-র হয়েও খেলেন চিমা। তবুও কলকাতাই তাঁর ফুটবলের ধাত্রীভূমি, তাঁর ফুটবলের প্রতিষ্ঠার মঞ্চ হয়ে রয়েছে।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার সিনিয়র ক্রীড়া সাংবাদিক। দুটি ফুটবল বিশ্বকাপ এবং দুটি ক্রিকেট বিশ্বকাপ কভার করা এই সাংবাদিকের একাধিক আরও আন্তর্জাতিক ইভেন্ট করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে। শুভ্র দুটি বইও লিখেছেন, একটা বিশ্বকাপের গল্প যুদ্ধ এবং শেষটি স্বপ্নের নায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো।
