

কবীর সুমন। ছবি -Google.
১০ই আগস্ট, ২০২৬
'উত্তর চেয়ে আকাশ পেতেছে কান’
সমকালীন ঘটনা, দুর্ঘটনা নিয়ে গান বাঁধার রেওয়াজ বাংলা গানে প্রায় ছিল না বলা ভালো। ‘সঞ্জীব পুরোহিত’, ‘পাপড়ি দে’, ‘গ্রাহাম স্টুয়ার্ট স্টাইনস’, সোদপুরের গণপিটুনিতে নিহত বালক – হয়েছে তাঁর গানের বিষয়। এসেছে সামাজিক-রাজনৈতিক বিবৃতিও। সেসব গানের সুরের চলন স্বভাবতই অন্যরকম, ‘বোল্ড অ্যান্ড স্ট্রেইট’। যে সমস্ত বিষয় মেইনস্ট্রিম নিউজপেপারের মূল খবরে উঠে আসত না, কবীর সুমনের গানে উঠে এসেছে তা বারবার। ‘গানের জন্য গান’ নয়। গানের মধ্যে দিয়ে আপনার আমার কাছে পৌঁছে গেছে অনেক খবর যা সচরাচর আমাদের নজরে আসে নি। ‘ইনফরমেশন গ্যাপ’ পূরণ করার চেষ্টা করেন আজও।
একই কর্ডের মাইনর আর মেজর পাশাপাশি ব্যবহার করা নতুন কিছু নয়। সারা বিশ্বে নানা গানে ব্যবহৃত হয় এই কর্ডের চলন। রবীন্দ্রনাথের গানেও আছে। তাহলে সুমন কোথায় আলাদা? যেমন ধরুন, 'আমার প্রেমের গান'। মূল কর্ড ডি মাইনর। গোটা গান জুড়ে কোথাও ডি মেজরের ব্যবহার নেই মাত্র শেষের দিকে একটা জায়গা ছাড়া।
‘সব অভিমান আকাশের চেনা চেনা / সবার জন্যে সুদিন কি আসবে না / উত্তর চেয়ে আকাশ পেতেছে কান…'
‘উত্তর চেয়ে’-তে এসে শিফটটা হয়। আর সাথে সাথে পালটায় গোটা গানের মুড। এতক্ষণ যে চাপা বিষাদ চলছিল গানে, তা মুক্তি পেয়ে যায় এক লহমায়। গানের দেহ ছেড়ে সংগীতের বৃহত্তর জগতে যাত্রা শুরু হয়। অথবা, 'বিভূতিভূষণ' গানের শেষে আচমকা জুড়ে দেন দক্ষিণ ভারতীয় রাগের চলন। 'সংগীতের মুক্তি' ঘটে।
ঐতিহ্যের পথ উজিয়ে এসে সুমনের গান আমাদের নিয়ে যায় আগামীর দেশে। ভারতীয় রাগসংগীতের তালিম থেকে আধুনিক বাংলা গানে যাত্রার এই পথ মসৃণ ছিল না কখনওই। দুই যুগের এক জীবন্ত সেতুর মত থেকে যাচ্ছে 'সুমনের গান'।
আমাদের মধ্যে অন্যায় দেখলে গর্জে ওঠার এক স্বাভাবিক প্রবণতা আছে। কিন্তু সাধ আর সাধ্যের চিরন্তন দ্বন্দ্ব পেরিয়ে ওঠা সহজ নয়। আমাদের ভেতরে ছাই-চাপা কথাগুলো কেউ বলে উঠলে আমাদের ভালো লাগে। তার তাপ বাড়তে বাড়তে তৈরি হয় আইকন-প্রিয়তা। একসময়ে আর সেই ব্যক্তিকে আমরা দেখতে পাইনা, এমনকি তাঁর কাজ ছাপিয়ে উঠে মগজে রাজ করতে থাকে আইকন-প্রিয়তা। শুরু হয় প্রত্যাশা, প্রিয় আইকনের কাঁধে চাপিয়ে দিই 'পারফেক্ট' থাকার দায়িত্ব কিন্তু নিজে তা প্র্যাকটিস করি না। ভুলে যাই, তিনিও একজন মানুষ, তাঁরও আমারই মত রাগ, ঘেন্না, অভিমান, ভালোবাসা, স্খলন - সমস্ত আছে, হয়ত আমার থেকেও তীব্রতর তা কখনও। আমি যা অ্যাপ্রুভ করি তার বাইরে কথা বললেই আমি বিষোদগার করি সেই আইকনের বিরুদ্ধে। মানুষটা, তাঁর কাজ ঢাকা পড়ে যায়।
কবীর সুমনের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হয় নি। একজন প্রতিষ্ঠান বিরোধীকে সমাজ চিরকাল পালটা ধাক্কা দিয়েছে। কিন্তু সংগীত, শিল্পকর্ম একসময় ছাপিয়ে যায় শিল্পীকে। সেভাবে কি আমরা কখনও দেখতে পারব? এত ঝড় ঝাপটা পেরিয়ে এখনও টিকে আছে যে জাতি তার কাছে এতটুকু প্রত্যাশা বোধহয় করা যায়।
আমাদের যতই আপত্তি থাকুক, কবীর সুমনকে বাংলা গানের ইতিহাস মনে রাখবে একজন ধারা পালটে দেওয়া সংগীতকার ও আধুনিক প্রশিক্ষিত পারফরমার হিসেবে, যাঁর আধুনিক বাংলা গান ও বাংলা খেয়াল নিয়ে অজস্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা ভাবাবে রসিক মানুষদের, যতদিন বাংলা গান বেঁচে থাকবে।
লেখক একজন সংস্কৃতিকর্মী ও স্বাধীন সাংবাদিক, যিনি দীর্ঘদিন ধরে বাংলা গান, চলচ্চিত্র ও সাহিত্য নিয়ে চর্চা করছেন। The Fourth Axis-এ তিনি নিয়মিত বাংলা সঙ্গীতের ইতিহাস ও নান্দনিকতা নিয়ে বিশ্লেষণাত্মক কলাম লেখেন।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অভিজ্ঞ, সংবেদনশীল, অনুসন্ধিৎসু এবং সমকালীন ও আগামী সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কর্মঠ কিছু তরুণ-তরুণী নিয়ে দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক। ভারতীয় বাঙালি সংস্কৃতির পথ ধরে গ্লোবাল লেন্স দিয়ে দুনিয়াকে দেখে সকলের সামনে পরিবেশন করাই তাঁদের লক্ষ্য। মিলেনিয়াল-জেনX-এর অভিজ্ঞতা ও জেনZ-র উৎসাহর যথাযথ রসায়নে গঠিত 'দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক'।
