

সতলুজ। ছবি - Google.
৩১শে জুলাই, ২০২৬
পাঞ্জাবের আকাশ তখন কুয়াশা আর আশঙ্কায় ধোঁয়াটে। আশির দশকের শেষ আর নব্বইয়ের দশকের শুরুর কথা। নদীর জলে ভেসে আসা চেনা-অচেনা লাশ, মাঝরাতে পুলিশি গাড়ির বিকট শব্দ আর গ্রামের পর গ্রামে আচমকা হাওয়া হয়ে যাওয়া একঝাঁক তরুণের অনুপস্থিতি—এই নিয়েই তৈরি হয়েছিল এক অবরুদ্ধ সময়ের ইতিহাস। সেই ইতিহাসকে রাষ্ট্রের খাতায় লেখা হয়েছিল ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ রক্ষা এবং ‘জঙ্গিবাদ দমন’-এর নামে। কিন্তু খাতায়-কলমে না-থাকা সেই হাজার হাজার মানুষের কী হল, যাদের দেহ গোপনে, রাতের অন্ধকারে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল শ্মশানের কাঠের চেনা মাপে?
পরিচালক হানি ত্রেহানের ছবি ‘Satluj’ (যা সেন্সরের চোখ রাঙানিতে প্রথমে ‘পঞ্জাব ৯৫’ নাম থেকে পরিবর্তিত হয়) ঠিক সেই না-বলা, মুছে দেওয়ার চেষ্টা করা নামগুলোরই এক প্রার্থনা। এ এক এমন এক মানুষের গল্প, যিনি ভয়ের উপত্যকায় দাঁড়িয়ে চোখ ফিরিয়ে নেওয়ার সহজ পথটি বেছে নেননি।
এক সাধারণ ব্যাংক ম্যানেজার, জাসওয়ান্ত সিং খালরা—অভিনেতা দিলজিৎ দোসাঞ্জ যার চরিত্রকে পর্দার সামনে নিয়ে এসেছেন এক অভূতপূর্ব সংযম আর গভীরতায়। বন্ধু কৃপালের হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যাওয়া এবং বন্ধু-মায়ের স্মৃতিলোপ পাওয়া অপেক্ষার যন্ত্রণা জাসওয়ান্তকে এক অদৃশ্য জগতের মুখোমুখি দাঁড় করায়। তিনি হয়ে ওঠেন ‘প্রেতাত্মাদের সংগ্রাহক’।
পৌরসভার সাধারণ খাতা, শ্মশানে ব্যবহৃত কাঠ ও মরদেহের ওজনের হিসাব, আর মর্গের নথিপত্র ঘেঁটে তিনি তৈরি করতে থাকেন এক অকাট্য আইনি তথ্যপ্রমাণ। রাষ্ট্র যে হাজার হাজার মানুষকে ‘বেওয়ারিশ’ তকমা দিয়ে গোপনে পুড়িয়ে মেরেছে, তার এক এক নির্মম পরিসংখ্যান তুলে আনেন তিনি। দিলজিতের চোখের ভাষায়, তাঁর শান্ত গলায় যে গভীরতা ফুটে উঠেছে, তা কোনো চিৎকার-চেঁচামেচি ছাড়াই রাষ্ট্রের ভিত কাঁপিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।
কিন্তু এই লড়াই শুধু একলা জাসওয়ান্তের ছিল না। তাঁর পাশে ছায়ার মতো দাঁড়িয়েছিলেন তাঁর স্ত্রী পরমজিৎ (গীতিকা বিদ্যা ওহলিয়ান)। পরমজিতের চোখের জল কেবল ভয়ের ছিল না, তা ছিল স্বামীর নীতিবোধের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা এবং সেই নৈতিকতার জন্য দিতে হওয়া সম্ভাব্য আত্মত্যাগের আশঙ্কার এক জটিল মেলবন্ধন।
চলচ্চিত্রটিতে এসএসপি সুগ্গা (সুবিন্দর ভিকি) এবং ডিজিপি বিট্টার (কনওয়ালজিৎ সিং) মতো চরিত্রদের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে কীভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও আইনি সুযোগ-সুবিধাকে পদোন্নতি ও ব্যক্তিস্বার্থের হাতিয়ার করে তোলা হয়েছিল। সুবিন্দর ভিকির চরিত্রটি হান্না আরেন্টির সেই বিখ্যাত 'Banality of Evil' বা 'সহিংসতার সাধারণীকরণ'-এর এক জীবন্ত প্রতীক। সেখানে মানুষকে তুলে নিয়ে হত্যা করাটা কোনো অপরাধ নয়, বরং দৈনন্দিন অফিসের কাজের মতোই এক রুটিন প্রশাসনিক প্রক্রিয়া।
এর বিপরীতে সিবিআই অফিসার সমুদ্র সিং (অর্জুন রামপাল)-এর উপস্থিতি রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরেও আইনি চেতনার সদ্ব্যবহারের কথা মনে করিয়ে দেয়। তিনি স্পষ্টভাবে মনে করিয়ে দেন যে, অতীতে ঘটে যাওয়া দাঙ্গা বা সীমান্তপারের সন্ত্রাসকে অজুহাত করে কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বছরের পর বছর সাধারণ নাগরিকদের ওপর বিচারবহির্ভূত অত্যাচার চালাতে পারে না।
গুলজারের ‘মাচিস’ ছবির যেখানে বিদ্রোহী তরুণদের দৃষ্টিকোণ থেকে পাঞ্জাবের ক্ষতকে দেখা হয়েছিল, সেখানে হানি ত্রেহান দেখিয়েছেন একজন সাধারণ নাগরিকের চোখে আইন ও স্মৃতিরক্ষার লড়াই। আর সেই লড়াইয়ের মূল্য জাসওয়ান্ত সিং খালরাকে দিতে হয়েছিল নিজের জীবন দিয়ে—১৯৯৫ সালে তাঁকেও তুলে নিয়ে গিয়ে চিরতরে গায়েব করে দেওয়া হয়।
ইতিহাসের যে পাতাকে রাষ্ট্র মুছে ফেলতে চায়, তাকে সেলুলয়েডে তুলে আনা সহজ ছিল না। প্রায় চার বছর সেন্সর বোর্ডের (CBFC) গোলকধাঁধায় আটকে ছিল ছবিটি। প্রায় ১২৭টি জায়গায় কাঁচি চালানোর নির্দেশ, নাম পরিবর্তন এবং শেষ পর্যন্ত যখন ওটিটি প্ল্যাটফর্ম 'Zee5'-এ ছবিটি নিঃশব্দে মুক্তি পেল, তার ঠিক ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই সরকারি আদেশে তা সরিয়ে নেওয়া হয়। এমনকি IMDb থেকে মুছে দেওয়া হয় ৯.৬ রেটিং পাওয়া এর ডিজিটাল চিহ্নটুকুও।
অভিযোগ? ছবিটিতে নাকি ‘ভারসাম্য’ নেই, তা নাকি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি। সেন্সর বোর্ড এমন সব দৃশ্যে আপত্তি জানিয়েছিল যা আদালতের নথিতেও স্বীকৃত সত্য। কিন্তু যে সত্যি এতটাই জ্বলন্ত, তাকে কি শুধু ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে ব্লক করে আটকে রাখা যায়?
ডিজিটাল মাধ্যম থেকে ছবিটি সরাতেই পাঞ্জাবের মাটি নিজের ইতিহাসকে বুকে তুলে নেওয়ার এক অভূতপূর্ব পথ খুঁজে নিল। প্রযুক্তিভিত্তিক ওটিটি প্ল্যাটফর্মের সীমা ছাড়িয়ে চলচ্চিত্রটি পৌঁছে গেল পাঞ্জাবের গ্রামে গ্রামে, গুরুদ্বারের প্রাঙ্গণে, খোলা মাঠে আর স্কুলের উঠোনে।
যেখানে বড় বড় ওটিটি সংস্থা হাত গুটিয়ে নিল, সেখানে পাঞ্জাবের স্থানীয় ডিজে (DJ) অপারেটররা, উদ্যমী তরুণ আর গুরুদ্বার কমিটিগুলো এক হয়ে গেল। সাউন্ড সিস্টেম, প্রজেক্টর, আর তাবু টাঙিয়ে শুরু হলো ‘Satluj’-এর প্রদর্শনী। মেহরাজ, নামলি বা মোগার মতো বিভিন্ন জায়গায় এক একটি স্ক্রিনিংয়ে জমা হতে শুরু করল ৩০০ থেকে ৫০০ মানুষ—কোথাও কোথাও তা হাজারের গণ্ডিও পেরিয়ে গেল।
বৃদ্ধরা যারা সেই অন্ধকার সময় চাক্ষুষ করেছিলেন, তারা পাশাপাশি বসালেন নতুন প্রজন্মকে। যে তরুণেরা খালরার নাম হয়তো শুধু বইয়ের পাতায় পড়েছিল, তারা বড় পর্দায় দেখতে পেল তাদের নিজেদের মাটির যন্ত্রণা। এই প্রদর্শনী কেবল শিখ সম্প্রদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রইল না; ক্ষতিগ্রস্ত হিন্দু পরিবারগুলোসহ সমস্ত ধর্মের মানুষ এসে একসঙ্গে বসে দেখল এই সত্যি গল্প।
তরণ তারণের ববি কুমারের মতো সাধারণ মানুষ, যিনি ১৯৯৩ সালে ভুয়ো এনকাউন্টারে নিজের দাদাকে হারিয়েছিলেন, তাঁর কাছে এই ছবি কোনো বিনোদন নয়— এক হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনদের বিচার চাওয়ার সম্মিলিত স্বর।
চলচ্চিত্রটির নাম রাখা হয়েছে পাঞ্জাবের প্রাণভোমরা নদী ‘Satluj’-এর নামে। যে নদীতে একদিন অসংখ্য বেওয়ারিশ লাশ ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল, আজ সেই নদীর মতোই এই ছবি আটকে থাকা বাঁধ ভেঙে বয়ে চলেছে মানুষের চেতনায়।
‘Satluj’ শুধু পাঞ্জাবের নব্বইয়ের দশকের অতীতকে তুলে ধরে না, এটি বর্তমানের যে কোনো আধুনিক গণতন্ত্রের জন্য এক সময়োপযোগী সতর্কবার্তা। জাতীয় নিরাপত্তার নামে যখনই নাগরিক অধিকারকে সংকুচিত করা হয়, হুইসেলব্লোয়ার বা সত্য প্রকাশকদের ‘দেশদ্রোহী’ বা ‘বিদেশি চক্রান্তের শিকার’ বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়, তখনই জাসওয়ান্ত সিং খালরাদের মতো মানুষদের জীবনের গল্প আমাদের সামনে আয়না হয়ে দাঁড়ায়।
হানি ত্রেহানের এই চলচ্চিত্র প্রমাণ করে দিল যে, ক্ষমতা দিয়ে সাময়িকভাবে কোনো ছবিকে ওটিটি থেকে সরানো যেতে পারে, কোনো নদীর গতিপথকে হয়তো আড়াল করা যেতে পারে, কিন্তু যে গল্প সত্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, সেই গল্পকে মানুষের মন থেকে মুছে ফেলা যায় না। অন্ধকারে জ্বালানো জাসওয়ান্ত সিং খালরার সেই মোমবাতি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ঝোড়ো হাওয়ায় নিভে যায়নি; বরং পাঞ্জাবের গ্রামের খোলা আকাশের নিচে আজ তা হাজার হাজার প্রদীপে পরিণত হয়েছে।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অনলাইন বাংলা ম্যাগাজিন।
