manoj bajpayee
২৩শে এপ্রিল, ২০২৬
আজ জন্মদিন
বলিউডে সাফল্যের গল্প সাধারণত আলো, গ্ল্যামার আর তারকাখ্যাতির ভাষায় লেখা হয়। কিন্তু সেই চেনা ব্যাকরণ ভেঙে এক নতুন অভিধান তৈরি করেছেন যিনি তাঁর নাম মনোজ বাজপেয়ী (Manoj Bajpayee) - যেখানে অভিনয় কোনো কৃত্রিমতা নয়, বরং গভীর মানবিক সত্যের অনুসন্ধান। তিনি সেই অভিনেতা, যিনি নিজেকে নয়, চরিত্রকে সামনে নিয়ে আসেন। তাঁর অভিনয় অযথা চমক সৃষ্টি করে না, বরং ধীরে ধীরে আমাদের গ্রাস করে। আজ তাঁর ৫৭-তম জন্মদিন।
বড় হওয়া
২৩ এপ্রিল ১৯৬৯ সালে বিহারের চম্পারণ জেলার বেলওয়া গ্রামের মাটির গন্ধ নিয়ে বড় হওয়া মনোজের যাত্রা শুরু হয় কঠিন বাস্তবের সঙ্গে লড়াই করে। কৃষিজীবী বাবা ও গৃহবধূ মায়ের পরিবারে নিজের বাকি চার ভাইবোনের সাথে চরম দারিদ্রের মধ্যে কাটে কৈশোর। উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে অভিনেতা হওয়ার স্বপ্নকে মনের মণিকোঠায় রেখে মনোজ পাড়ি জমান দিল্লিতে। অভিনয় শেখার প্রবল তাগিদে দিল্লির রাষ্ট্রীয় নাট্য বিদ্যালয়ে পরপর তিনবার আবেদন সত্ত্বেও তিনি বিফল হন। মানসিক ভাবে কিছুদিন ভেঙে পড়লেও রঘুবীর যাদবের পরামর্শে তিনি নাট্য পরিচালক তথা প্রশিক্ষক ব্যারি জনের কর্মশালায় অংশ নেন। ব্যারি তাঁর অভিনয় দক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে তাঁকে নিজের অভিনয় সহকারি হিসেবে নিয়োগ করেন আর দিল্লির থিয়েটার-ই হয়ে ওঠে তাঁর অভিনয়ের প্রথম স্কুল। কথিত আছে - নাছোড় মনোজ চতুর্থবারের জন্য রাষ্ট্রীয় নাট্য বিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য আবেদন করলে তারা তাকে শিক্ষার্থী হিসেবে গ্রহণের পরিবর্তে শিক্ষক হিসেবে যোগদানের প্রস্তাব দেয়। আসলে কোনো প্রত্যাখ্যানই তাঁকে ভেঙে ফেলতে পারেনি বরং তৈরি করেছে এক জেদি শিল্পী, যিনি পরবর্তীকালে তাঁর কাজের মধ্যে দিয়ে ইতিহাস রচনা করবেন এবং জনমানসের কাছে প্রমানিত হবে - প্রস্তুতি, অধ্যাবসায় ও আত্মবিশ্বাসই সাফল্যের একমাত্র রাস্তা।
পেশাদার অভিনয় জীবন
থিয়েটারের পাশাপাশি টেলিভিশনের পর্দায় ‘সিকস্ত’ এবং ‘কলাকার’ ধারাবাহিকে অভিনয় শুরু করেন। অন্যধারার হিন্দি চলচ্চিত্রকার গোবিন্দ নিহালিনির ‘দ্রোহকাল’ (১৯৯৪) চলচ্চিত্রে এক মিনিটের একটি চরিত্রে অভিনইয়ের মধ্যে দিয়ে মনোজ বড়পর্দায় পা রাখেন। দূরদর্শনে প্রচারিত ধারাবাহিক নাটক ‘স্বভিমান’ (১৯৯৫) গৃহস্থ দর্শকদের কাছে তাঁকে পরিচিতি এনে দেয়। পরবর্তীকালে ‘ব্যান্ডিট কুইন’, ‘তমন্না’, ‘দাউদ’ -এর মতো বেশ কিছু হিন্দি চলচ্চিত্রে ছোট খাটো চরিত্রে কাজ করলেও সৌরভ শুক্লা ও অনুরাগ কাশ্যপ রচিত এবং রাম গোপাল বর্মা পরিচালিত ‘সত্যা’ (১৯৯৮) -তে ‘ভিকু মাতরে’ চরিত্র তাঁকে রাতারাতি ভারত জোড়া খ্যাতি এনে দেয়। শুধুমাত্র তাইই নয়, এই ছবিটি ভারতীয় সিনেমার ভাষা বদলে দেয় এবং মনোজ জাতীয় পুরস্কার ও ফিল্মফেয়ার সম্মানে ভূষিত হন।
পরবর্তী সময়ে তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলির মধ্যের বাস্তবতা এবং বহুমাত্রিকতা দর্শককের মনে সোজাসুজি অভিঘাত সৃষ্টি করে এবং নিয়ে যায় গভীর মননশীল সংলাপে, তা সে মূলধারার কাজ হোক কিংবা স্বাধীন চলচ্চিত্র অথবা ওয়েব সিরিজ।

‘শূল’- এ এক সৎ পুলিশ অফিসারের রুক্ষ আপসহীন বাস্তবতা, ‘পিঞ্জর’ - এ দেশভাগের বেদনা, ‘রাজনীতি’- তে রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন, ‘গ্যাংস অফ ওয়াসেপুর’- এ ‘সর্দার খান’ -এর জটিল, নির্মম, ভয়ংকর রুক্ষ অথচ মানবিক রূপ, ‘অস্ক’এ মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব, ‘রোড’-এর অন্ধকার চরিত্র, ‘আলীগড়’-এ অধ্যাপক সিরাসের নিঃসঙ্গতা, ‘ভোঁসলে ‘-র নীরবতা, ‘গলি গুলিয়াঁ’- এর অসহায়তা, ‘ফ্যামিলি ম্যান’-এর অতি সাধারণের জীবনযাপনের সাথে দেশের কর্তব্যপালন - সমস্ত ক্ষেত্রেই তিনি স্বমহিমায় বিরাজমান। দর্শকের কাছে তিনি কোনো স্টার কিংবা অভিনেতা নন, একজন আস্ত জ্বলজ্যান্ত মানুষ। মনোজ কেবল একটি চরিত্রের অভিনেতা নন, বরং অভিনয়ের স্বয়ং পরীক্ষাগার।
পুরস্কার
শিল্পক্ষেত্রে তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য ২০১৯ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করে। তাঁর যাত্রা আমাদের মনে করিয়ে দেয় - সাফল্য কোনো শর্টকাট নয়, এটি ধৈর্য, ব্যর্থতা আর বিশ্বাসের সমষ্টি আর সেই পথেই তৈরি হয় একজন সত্যিকারের শিল্পী।
আসলে, মনোজ বাজপেয়ী কোনো ক্ষণস্থায়ী আলো নন - তিনি এক দীর্ঘ প্রতিধ্বনি, যা সময় পেরিয়ে আরও গভীর হয়। যখন সব আলো নিভে যায়, গল্প শেষ হয় - তখনও কিছু অনুভূতি থেকে যায়, আর সেই অবশিষ্ট অনুভূতির নামই মনোজ বাজপেয়ী।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
জন্ম মুর্শিদাবাদের আজিমগঞ্জে। সাংবাদিকতা ও চলচ্চিত্র নিয়ে পড়াশোনা। সময় কাটে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চর্চায়। বর্তমানে লেখালিখি, ডিজিটাল কন্টেন্ট এবং চলচ্চিত্র নির্মাণ নিয়ে কর্মব্যস্ত।