১লা নভেম্বর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
সুন্দরবনে টিকে থাকার রক্তক্ষয়ী লড়াই ও ভিন্ন সংস্কৃতির জন্ম

সুন্দরবনের জীবন। ছবি - AI

সুন্দরবনে টিকে থাকার রক্তক্ষয়ী লড়াই ও ভিন্ন সংস্কৃতির জন্ম

tfa logo icon

সংক্ষিপ্তসার

রয়্যাল বেঙ্গল বনাম রক্তপিপাসু জলদস্যু- কাকে বেশি ভয় পায় সুন্দরবন?

শ্বাসমূল আর হেতালের জঙ্গলে রাতের বেলায় মৃত্যুদূত নিঃশব্দে ঘুরে বেড়ায়। ওত পেতে থাকে দক্ষিণরায়ের বাহন বিশ্ববিখ্যাত রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। আবার নদীপথে আচমকা স্পিডবোট ছুটিয়ে ঘাড়ের উপর এসে পড়ে রক্তপিপাসু জলদস্যুর দল। পেটের দায়ে গহীন জঙ্গলে যাওয়া মানুষগুলোর কাছে বাঘ আর জলদস্যু, এই দুই বিভীষিকাই সবচেয়ে নির্মম সত্যি।

মূল বিষয়

শীতের রাতে সুন্দরবনের গোলপাতায় ছাওয়া সরু খাঁড়িগুলোতে যখন ঘন কুয়াশা নামে, তখন এক অদ্ভুত নৈঃশব্দ্য চারপাশকে গ্রাস করে। নৌকার ছইয়ের নিচে টিমটিম করে জ্বলা হ্যারিকেনের আলোয় ভয় বুকে নিয়ে জেগে থাকেন মৎস্যজীবী আর বাওয়ালিরা। তাঁদের চোখে ঘুম থাকে না। কারণ এই শ্বাসমূল আর হেতালের জঙ্গলে রাতের বেলায় মৃত্যুদূত নিঃশব্দে ঘুরে বেড়ায়। ওত পেতে থাকে দক্ষিণরায়ের বাহন বিশ্ববিখ্যাত রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার।

তবে ভয় এখানেই শেষ নয়। নদীপথে আচমকা স্পিডবোট ছুটিয়ে ঘাড়ের উপর এসে হাজির হয় রক্তপিপাসু জলদস্যুর দল। পেটের দায়ে গহীন জঙ্গলে যাওয়া মানুষগুলোর কাছে বাঘ আর ডাকাত বা জলদস্যু, এই দুই বিভীষিকাই সুন্দরবনের সবচেয়ে নির্মম সত্যি।

জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এই মানুষগুলোর টিকে থাকার লড়াই কোনও রূপকথার গল্প নয়। এটি চূড়ান্ত দারিদ্র্য, সীমাহীন বঞ্চনা আর ভিটেমাটি আঁকড়ে পড়ে থাকার এক মর্মান্তিক ইতিহাস।

জঙ্গলের অন্ধকারে বিপদ মাথায় বাস

সুন্দরবনের এই দুর্গম অঞ্চলে মানুষের বসবাস একদিনে গড়ে ওঠেনি। এর পেছনে লুকিয়ে আছে এক দীর্ঘ বঞ্চনা আর টিকে থাকার তাগিদ। আঠারো এবং উনিশ শতকে ব্রিটিশ আমলে জঙ্গল কেটে আবাদি জমি তৈরির কাজ শুরু হয়। সেই সময় মেদিনীপুর, বাঁকুড়া বা ওড়িশা থেকে সাঁওতাল, মুন্ডা এবং বহু ভূমিহীন গরিব মানুষকে এখানে আনা হয়েছিল জঙ্গল সাফ করার জন্য। পরবর্তীকালে দেশভাগের সময় এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পর বহু উদ্বাস্তু মানুষ মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজতে সীমান্ত পেরিয়ে এই নোনা জল আর কাদার দেশে এসে আশ্রয় নেন। তাঁদের আর কোথাও যাওয়ার জায়গা ছিল না। মূল ভূখণ্ডের সমাজ ব্যবস্থা তাঁদের জায়গা দেয়নি। তাই হিংস্র বাঘ আর কুমিরের মুখে দাঁড়িয়ে জঙ্গল কেটে বসতি গড়া ছাড়া তাদের কাছে দ্বিতীয় কোনও পথ ছিল না। সেই শুরু। তারপর থেকে বংশপরম্পরায় এই জঙ্গলই হয়ে উঠেছে এই মানুষগুলোর বেঁচে থাকার একমাত্র রসদ।

মানুষখেকোর সঙ্গে রোজের লুকোচুরি

পেটের খিদের জ্বালা মানুষকে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়াতেও বাধ্য করে। কাঁকড়া ধরতে বা মধু সংগ্রহ করতে মৎস্যজীবী বা মৌলিদের ঢুকতে হয় সুন্দরবনের গহীন জঙ্গলের কোর এরিয়ায়। ছোট নৌকায় পাঁচ বা ছয়জনের দল নিয়ে যখন তাঁরা খাঁড়িতে ঢোকেন, তখন প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুর হাতছানি থাকে। বাঘের মোকাবিলা করার জন্য এখানকার মানুষ নিজস্ব কিছু কৌশল আয়ত্ত করেছেন। একসময় জঙ্গলে যাওয়ার সময় মাথার পেছনে মানুষের মুখের আদলে তৈরি রাবারের মুখোশ পরার রেওয়াজ শুরু হয়েছিল। বাঘ সাধারণত পেছন থেকে আক্রমণ করে। তাই পেছনের দিকে চোখ আঁকা মুখোশ দেখলে বাঘ বিভ্রান্ত হত।

তবে তীক্ষ্ণ বুদ্ধির রয়্যাল বেঙ্গল খুব দ্রুত এই কৌশল ধরে ফেলে। বাধ্য হয়ে দলবদ্ধভাবে কাজ করার কৌশল নেন মৎস্যজীবীরা। কাঁকড়া ধরার সময় একজন সবসময় লাঠি হাতে পাহারায় থাকেন। তবু অনে সময় রেহাই মেলে না।

বাঘের হামলায় পরিবারের উপার্জনকারী সদস্যের মৃত্যু হলে সেই পরিবারের উপর নেমে আসে গাঢ় অন্ধকার। এভাবেই ওখানে জন্ম নিয়েছে বাঘবিধবাদের এক করুণ সমাজ! নিয়ম ভেঙে জঙ্গলের কোর এলাকায় প্রবেশ করায় (যা নিষিদ্ধ) নিহতের পরিবার অনেক সময় সরকারি ক্ষতিপূরণও পায় না। ফলে শুরু হয় এক নতুন লড়াই।

খাঁড়ির দখল ও রক্তপিপাসু জলদস্যুদের ত্রাস

বাঘের চেয়েও একসময় সুন্দরবনে বেশি আতঙ্ক ছড়িয়েছিল জলদস্যুরা। বিশেষ করে বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তবর্তী দুর্গম নদীপথগুলো ছিল এদের মুক্তাঞ্চল। সুন্দরবনে জলদস্যুদের উৎপাত আজকের নয়। পর্তুগিজ হার্মাদ আর আরাকানি মগ দস্যুদের আমল থেকেই এই নদীপথগুলো ছিল বিপদের আরেক নাম। পরবর্তীকালে সেই জায়গা নেয় স্থানীয় ডাকাত দলগুলো। রাজু বাহিনী, মজনু বাহিনী বা আলীবর বাহিনীর মতো একাধিক সশস্ত্র দস্যুদল সুন্দরবনে একসময় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। মৎস্যজীবীদের নৌকা আটকে সর্বস্ব লুঠ করা এবং মুক্তিপণের জন্য জেলেদের অপহরণ করা ছিল এদের নিত্যদিনের কাজ।

আরও পড়ুন
ইছামতীর বুকে দুই বাংলার অঘোষিত মিলনমেলা
দার্জিলিংয়ের চায়ের কাপে কি মিশে রয়েছে শ্রমিকের চোখের জল?
মানত, লোকবিশ্বাস, ইতিহাসের গোলকধাঁধায় ‘অশুভ’ ঘোড়ার রহস্য!
বাংলার পর্যটনে নতুন ঝোঁক রাজবাড়ি হোমস্টে- র‌ইল তালিকা

মুক্তিপণ না পেলে গভীর জঙ্গলে গাছে বেঁধে সাধারণ হতদরিদ্র মৎস্যজীবীদের উপর অকথ্য অত্যাচার করা হত। মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে টাকা ধার করে প্রাণ বাঁচাতে হত জেলেদের। এই ঋণের চক্র থেকে সাধারণ মানুষের বের হওয়ার কোনও উপায় থাকত না। অনেকেই ঋণগ্রস্ত হয়ে প্রাণ ত্যাগ করতেন। এমন প্রান্তিক এলাকায় সহজে সরকারি নিয়ম খাটে না। তাই ঋণগ্রস্থ কেউ মারা গেলে তার দেনার বোঝা এসে চাপত পরবর্তী প্রজন্মের উপর। এইভাবে জন্মের আগে থেকেই সুন্দরবনের বহু মানুষ ঋণগ্রস্থ হয়ে পড়ত। এখনও এখানকার কিছু কিছু জায়গায় এমন অনিয়ম ঘটে।

দস্যু দমন এবং আজকের সুন্দরবন

বিগত এক দশকে পরিস্থিতির অনেকটাই বদল ঘটেছে। ভারত ও বাংলাদেশের রক্ষীবাহিনী এবং পুলিশের যৌথ ও ধারাবাহিক অভিযানের ফলে বড় বড় দস্যুদলগুলো প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বা র‍্যাবের সাঁড়াশি অভিযানে বহু জলদস্যু আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে। বর্তমানে বড় আকারের সশস্ত্র দস্যুবৃত্তি প্রায় নেই বললেই চলে। তবে এই ত্রাস একেবারে নির্মূল হয়ে গেছে এমনটা জোর দিয়ে বলা যায় না।

গহীন খাঁড়িগুলোতে আজও ছোটখাটো স্থানীয় দুষ্কৃতীদের তোলাবাজি বা ভয় দেখানোর ঘটনা মাঝেমধ্যে শোনা যায়। রাতের অন্ধকারে ইঞ্জিন নৌকার শব্দ শুনলে আজও মৎস্যজীবীদের বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে ওঠে।

ফিরে যাওয়ার পথ নেই

এত কষ্টের পরেও তারা সুন্দরবন ছেড়ে যান না। এই নোনা মাটি তাঁদের অস্তিত্বের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। বারবার আয়লা, আমফান বা ইয়াশের মতো ঘুর্ণিঝড়ে ঘরবাড়ি তছনছ হয়ে যায়। নদীর বাঁধ ভেঙে নোনা জল ঢুকে নষ্ট হয় বিঘার পর বিঘা চাষের জমি। তবু তারা শহরমুখী হন না।

শহরের কংক্রিটের জঙ্গলে পরিযায়ী শ্রমিকের কাজ করার চেয়ে নিজেদের নদী আর জঙ্গলের ওপর অধিকার বোধ তাঁদের অনেক বেশি। তাছাড়া শিক্ষা আর বিকল্প কর্মসংস্থানের অভাবে অন্য কোথাও গিয়ে নতুন জীবন শুরু করার মতো অবস্থাও তাঁদের নেই। নদীর চরে নতুন করে বীজ বোনা আর ভাঙা বাঁধ নিজেদের হাতে মাটি কেটে মেরামত করার মধ্যেই তাঁরা জীবনের অর্থ খুঁজে পান। হেরে গিয়েও মাটি কামড়ে পড়ে থাকার এই যন্ত্রণা সুন্দরবনের মানুষের প্রতিদিনের সঙ্গী।

বিপদের দিনে বাইরের হাত ও ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই

এই দীর্ঘ লড়াইয়ে সুন্দরবনের মানুষ একেবারে একা ছিল, এমনটা নয়। বেশ কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং সরকারি উদ্যোগ তাঁদের টিকে থাকতে অনেকটাই সাহায্য করেছে। বাঘবিধবাদের স্বনির্ভর করার জন্য সেলাইয়ের কাজ শেখানো, হাঁস-মুরগি পালন এবং বিকল্প চাষাবাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। জঙ্গলের ওপর নির্ভরতা কমাতে গ্রামের পুকুরেই বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে কাঁকড়া ও মাছ চাষের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বন দফতরের উদ্যোগে জঙ্গলের প্রান্তে নাইলনের জালের বেড়া দেওয়া হয়েছে এবং সোলার লাইট বসানো হয়েছে। আলো থাকলে বাঘ লোকালয়ে ঢুকতে ভয় পায়। এই ছোট ছোট সাহায্যগুলোই বিপদসঙ্কুল এই অঞ্চলের মানুষকে কিছুটা হলেও স্বস্তি দিয়েছে।

এক অটুট ব্যতিক্রমী সংস্কৃতি

বাঘ আর জলদস্যুর এই সাঁড়াশি আক্রমণ থেকে বাঁচতে সুন্দরবনের মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন লৌকিক বিশ্বাসের। এখানে হিন্দু বা মুসলমানের ধর্মীয় ভেদাভেদ পেরিয়ে গড়ে উঠেছে এক অনন্য ও ব্যতিক্রমী লৌকিক আচার।

সুন্দরবনের অলিখিত নিয়ম হল জঙ্গলে ঢোকার আগে বনবিবির থানে মাথা ঠেকাতে হবে। লোককথা অনুযায়ী বনবিবি হলেন এই অরণ্যের রক্ষাকর্ত্রী। আর দক্ষিণরায় হলেন ব্যাঘ্রদেবতা। গভীর জঙ্গলে যখন আর কোনও ভরসা থাকে না তখন এই বিশ্বাসই মৎস্যজীবী আর মৌলিদের সাহস জোগায়। বিপদের মুখে ধর্মের ভেদাভেদ মুছে গিয়ে এভাবেই সুন্দরবন কেন্দ্রিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। এখানে একই নৌকায় বসে রহিম আর রাম দু'জনেই বনবিবির নাম জপ করেন।

এটাই সুন্দরবন। এটাই সুন্দরবনের ভয়ঙ্কর সৌন্দর্য! সেখানে এভাবেই জীবনের জয়গান গাওয়া হয়।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
কৌস্তভ ভৌমিক
কৌস্তভ ভৌমিক

কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য