

ব্যক্তি-স্টারডমের জায়গা দখল করেছে সিনেমার ফ্র্যাঞ্চাইজি! ছবি- Google
পোস্টারে বড় মুখ দেখে টিকিট কাটার দিন কি শেষ? স্টারডমের মায়া কাটিয়ে দর্শক কেন আজ কনটেন্ট ও ফ্র্যাঞ্চাইজির দিকে ঝুঁকছেন, জেনে নিন বক্স অফিসের নতুন সমীকরণ।
সিনেমার পোস্টারে কেবল প্রিয় নায়কের চেনা মুখ দেখেই প্রেক্ষাগৃহে টিকিট কাটার সেই সুবর্ণ দিনগুলো দ্রুত ফিকে হয়ে আসছে। এক সময়ে বড় তারকাদের নাম ঘোষণা হওয়ামাত্রই প্রথম দিনের প্রথম শো হাউসফুল হয়ে যেত। তবে সাম্প্রতিক সময়ের বক্স অফিস রিপোর্ট সম্পূর্ণ এক নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। দুর্বল চিত্রনাট্য থাকলে মেগা তারকাদের কোটি কোটি টাকার ছবিও প্রথম সপ্তাহান্ত পার করতে হাঁসফাঁস করছে। এর বিপরীতে নামী তারকা ছাড়া শুধুমাত্র কনটেন্ট ও বলিষ্ঠ মেকিংয়ের জোরে অনেক ছবি বক্স অফিসে ইতিহাস তৈরি করছে। চলচ্চিত্র বাণিজ্য বিশেষজ্ঞদের গভীর নজর এখন superstar era box office shift-এর দিকে। প্রেক্ষাগৃহে কি সত্যিই তবে চিরাচরিত স্টারডমের জমানা শেষ হয়ে কনটেন্টের যুগ শুরু হল?
আগের যুগে সুপারস্টারদের ঘিরে এক অদ্ভুত রহস্যময় আবরণ বা ‘অরা’ (Aura) বজায় থাকত। তাঁদের একঝলক দেখার সুযোগ মিলত শুধুমাত্র বড় পর্দায় অথবা দূরদর্শনের বিশেষ অনুষ্ঠানে।
সেই কারণে প্রিয় তারকাকে দেখার জন্য সাধারণ মানুষের মনে এক দুর্নিবার তীব্র ব্যাকুলতা তৈরি হতো। কিন্তু আজকের সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে সেই অধরা দূরত্ব সম্পূর্ণ উধাও হয়ে গেছে।
ইনস্টাগ্রাম রিলস, এক্স হ্যান্ডল আর বিমানবন্দরে পাপারাৎজিদের দৌলতে তারকারা এখন প্রতিদিন দর্শকের হাতের মুঠোয়। অভিনেতারা সারাদিন কী খাচ্ছেন, কোথায় যাচ্ছেন কিংবা কী পোশাক পরছেন—সবকিছুই নিয়মিত প্রকাশ্যে আসছে। এর ফলে তারকার সেই জাদুকরী অধরা রূপটি দ্রুত স্বাভাবিকতায় পর্যবসিত হয়েছে। শুধুমাত্র অভিনেতাকে দেখার লোভে তাই দর্শক এখন আর পকেটের অতিরিক্ত টাকা খরচ করে সিনেমা হলে যাচ্ছেন না।
মাল্টিপ্লেক্স সংস্কৃতির হাত ধরে সিনেমা দেখার সামগ্রিক খরচ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিবারের চারজন সদস্য নিয়ে একটি ছবি দেখতে গেলে হাজার টাকার ওপরে খরচ হয়ে যায়।
এই বিপুল খরচের কারণে দর্শক এখন অনেক বেশি হিসেবি ও খুঁতখুঁতে হয়ে উঠেছেন। দর্শক এখন বুঝতে পেরেছেন যে দুর্বল ছবিতে বড় তারকা থাকলেও টিকিটের মূল্যের সদ্ব্যবহার হয় না।
এর ফলে সোশ্যাল মিডিয়ার মাউথ-পাবলিসিটি এবং পর্যালোচকদের প্রতিক্রিয়ার ওপর সাধারণ মানুষ বেশি নির্ভর করছেন। প্রথম শো শেষ হওয়ার আধা ঘণ্টার মধ্যে ইউটিউব ও রেডিটে সাধারণ দর্শকদের রিভিউ ছড়িয়ে পড়ছে। ছবি দুর্বল হলে তারকা উপস্থিতিও সিনেমাকে মুখ থুবড়ে পড়া থেকে বাঁচাতে পারছে না। আধুনিক ফিল্ম ডিস্ট্রিবিউশন ও দর্শক মনস্তত্ত্ব আরও গভীরে বুঝতে পড়ুন আমাদের সিনেমা হলে দর্শক ফেরানোর রাজনীতি ও পিআর কৌশল এবং মাল্টিপ্লেক্সের আকাশছোঁয়া টিকিটের দাম বনাম দর্শক সংকট।
বর্তমান বিনোদন দুনিয়ায় তারকাদের নামের চেয়েও অনেক বড় হয়ে উঠেছে জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজি ও ইউনিভার্স। মার্ভেল কিংবা ডিসির মতোই ভারতেও হরর-কমেডি ইউনিভার্স, স্পাই ইউনিভার্স কিংবা সফল ফ্র্যাঞ্চাইজির ব্র্যান্ড ভ্যালু বিপুলভাবে বাড়ছে।
দর্শক এখন কোনো একক ব্যক্তির চেয়ে গল্পের পরিচিত চরিত্র ও সিনেম্যাটিক জগৎ বেশি পছন্দ করছেন। ফ্র্যাঞ্চাইজির পরের পর্বেও কী ঘটবে, তা জানার তীব্র কৌতূহল মানুষকে টিকিট কাটতে বাধ্য করে।
তাছাড়া ওটিটি প্ল্যাটফর্মের ব্যাপক প্রসারে বিশ্বজুড়ে নানা ভাষার উন্নত গল্প মানুষের হাতের নাগালে চলে এসেছে। এর ফলে বিশ্বমানের অভিনয়ের সাথে পরিচিত হয়ে ওঠা দর্শক সাধারণ অতিনাটকীয় মশলাদার ছবির ফাঁদে পা দিচ্ছেন না। অভিনেতার চেয়ে পরিচালক ও চিত্রনাট্যকারের দৃষ্টিভঙ্গি এখন বক্স অফিসের প্রধান ট্রাম্পকার্ড হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
তবে কি তারকাদের প্রয়োজন সিনেমা জগৎ থেকে চিরতরে ফুরিয়ে গেল? বাস্তব সত্য হল, স্টারডম হারিয়ে যায়নি, বরং তার সামগ্রিক সংজ্ঞা আমূল বদলে গেছে।
আজকের দিনে সেই অভিনেতাই আসল সুপারস্টার, যিনি প্রতিটি প্রজেক্টে নিজেকে ভেঙে নতুন চরিত্রে হাজির করতে পারেন। অন্ধ অনুরাগের ভিত্তিতে অন্ধভাবে টিকিট কাটার যুগ এখন অতীত।
তারকাদের এখন বুঝতে হচ্ছে যে অতিরিক্ত পারিশ্রমিক দাবি করার চেয়ে ছবির গল্প বাছাইয়ে বেশি মনোযোগ দেওয়া দরকার। বড় ক্যানভাসের মেগা বাজেটের ছবি তৈরিতে তারকার উপস্থিতি আজও দরকারি। কিন্তু সেই চাকচিক্যকে ধরে রাখার জন্য চিত্রনাট্যে মাটির কাছাকাছি বাস্তব আবেগ থাকা বাধ্যতামূলক।
বক্স অফিসের এই বর্তমান রূপান্তর ভারতীয় সিনেমার দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক এক লক্ষণ। এককালের একচ্ছত্র তারকানির্ভর ব্যবস্থা ভেঙে দিয়ে এখন মেধা ও গল্প বলার দক্ষতাই শেষ কথা বলছে। প্রযোজকরাও এখন বুঝতে পারছেন যে কেবল বড় তারকাকে দিয়ে দুর্বল গল্প ঢাকলে বিপুল ক্ষতির ঝুঁকি থেকে যায়। যখন ভালো কনটেন্ট ও বিশ্বাসযোগ্য চরিত্রায়ন মেলে, দর্শক তখনও প্রেক্ষাগৃহ ভরিয়ে তোলেন। ব্যক্তিপূজার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে ভারতীয় সিনেমা এখন সত্যিকারের চিত্রনাট্য-চালিত এক আধুনিক যুগে প্রবেশ করছে। আর এই নতুন সময়ে অভিনেতারা নন, শেষ পর্যন্ত দর্শকের রুচি ও খাঁটি চিত্রনাট্যই বক্স অফিসের আসল সম্রাটের আসনে অধিষ্ঠিত থাকবে।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
সাংবাদিক, লেখক ও চিত্রনাট্যকার। দক্ষিণ কলকাতায় বেড়ে ওঠা। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। কাজ করেছেন নিউজ ১৮ বাংলা, আনন্দবাজার অনলাইন এবং দ্য ওয়াল-র মতো সংবাদমাধ্যমে। এ ছাড়া শিক্ষকতা ও চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গেও যুক্ত থেকেছেন। সমকাল, সমাজ ও মানুষের মনস্তত্ত্ব থেকেই তাঁর সাহিত্য ও চিত্রনাট্যের মূল রসদ খুঁজে নেন। দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ানো এবং পশু-পাখি, প্রকৃতি ও বিজ্ঞানচর্চা তাঁর আগ্রহের বিষয়। মুদ্রিত গল্প সংকলন এবং উপন্যাস এ পর্যন্ত ৩টি; ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত লেখা অজস্র। বর্তমানে চিত্রনাট্য লেখেন বাংলা ধারাবাহিক, ওয়েব সিরিজ এবং বিদেশি ছবির জন্যও।
