

টিআরপি বনাম ট্রোলিংই মেগা সিরিয়ালের মনস্তত্ত্ব। প্রতীকী ছবি- Google
জানুন bengali mega serial script psychology এবং রাইটার্স রুমের ভেতরের বাস্তবতা। তিরিশ মিনিটের স্লট, ডেডলাইনের চাপ ও অতিনাটকীয় চিত্রনাট্যের পেছনের আসল সমাজতত্ত্ব।
সন্ধ্যা নামলেই বাংলার ড্রয়িংরুমে পরিচিত আবহসংগীত বেজে ওঠে। চায়ের কাপ হাতে গৃহিণী থেকে বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য—সকলেই নির্দিষ্ট সময়ে টিভির সামনে বসেন। সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রেন্ড লক্ষ্য করলে দেখা যায় মেগা সিরিয়ালের নানা দৃশ্য নিয়ে তীব্র ব্যঙ্গ। অবাস্তব পারিবারিক সংঘাত কিংবা অতি-নাটকীয় মোড় দেখে অনেকেই হাসাহাসি করেন। শহুরে শিক্ষিত দর্শকের একাংশ ড্রয়িংরুমে বসে এই চিত্রনাট্যের যৌক্তিকতা নিয়ে বারবার প্রশ্ন তোলেন। তবে প্রতি সপ্তাহের ব্রডকাস্ট অডিয়েন্স রিসার্চ কাউন্সিলের (BARC) রেটিং চার্ট সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তব তুলে ধরে। যে ধারাবাহিকগুলো নেটদুনিয়ায় সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হয়, সেগুলোই রেটিং তালিকার শীর্ষে জায়গা করে নেয়। এই বৈপরীত্যের কারণ বুঝতে হলে মানুষের গভীর অবচেতনের সমীকরণ বুঝতে হবে। আজকের দিনে গণমাধ্যমের অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক বিষয় হল bengali mega serial script psychology। তীব্র ট্রোলিং ও ব্যঙ্গ সত্ত্বেও কোটি কোটি মানুষ কেন আজও এই চেনা ড্রামায় মগ্ন থাকেন?
সিনেমার চিত্রনাট্য আর টেলিভিশনের দৈনিক ড্রাফটের কাজের ধরন সম্পূর্ণ আলাদা। সিনেমায় একটি দুই ঘণ্টার গল্প লিখতে অনেক মাস সময় মেলে। তবে মেগা সিরিয়ালের ক্ষেত্রে সময় মেপে পা ফেলতে হয়।
টেলিভিশন ব্রডকাস্টের সাধারণ নিয়মে প্রতিটি পর্বের জন্য মোট সময় থাকে ৩০ মিনিট। এর মধ্যে মূল গল্প থাকে উনিশ থেকে বিশ মিনিটের মতো। বাকি সময়টুকু যায় বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনে। সপ্তাহে সাত দিন এই নির্দিষ্ট স্লট টানটান রাখা এক অমানুষিক পরিশ্রমের কাজ।
চ্যানেলের রিসার্চ টিম প্রতি সপ্তাহে মিনিটের ভিত্তিতে রেটিং তথ্য পাঠায়। একে ইন্ডাস্ট্রির ভাষায় ‘মিনিট-টু-মিনিট গ্রাফ’ বলা হয়। কোন দৃশ্যে দর্শক চ্যানেল বদলে ফেলেছেন, তা খুঁটিয়ে দেখা হয়। ফলে লেখকদের রাতারাতি চিত্রনাট্যের ট্র্যাক বদলাতে বাধ্য হতে হয়। এই তীব্র চাপের মুখে দীর্ঘ ও সূক্ষ্ম সাহিত্যের চেয়ে দ্রুত আবেগমথিত সংঘাত তৈরি করাই প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়।
মধ্যবিত্ত জীবনের দৈনন্দিন লড়াই অত্যন্ত কঠিন ও একঘেয়ে। বাসের ভিড়, বাজারের চড়া দাম আর কর্মক্ষেত্রের চাপ মানুষকে প্রতিনিয়ত ক্লান্ত করে তোলে।
সেই কারণে সারাদিনের ক্লান্তি শেষে ড্রয়িংরুমে ফিরে মানুষ নিজের চেনা অভাবের পুনরাবৃত্তি দেখতে চান না। বরং অবসন্ন মন চায় কিছুক্ষণের জন্য বাস্তব ভুলে এক সাজানো জগতে হারিয়ে যেতে। সমাজবিজ্ঞানের পরিভাষায় একে বলা হয় ‘এসকেপিজম’ (Escapism)।
ধারাবাহিকের বিশালাকার বাড়ি, জমকালো শাড়ি আর আলোর রোশনাই দর্শকের অবদমিত ইচ্ছাকে তৃপ্তি দেয়। সাধারণ ঘরের মেয়ে যখন পর্দায় নিজের ব্যক্তিত্ব দিয়ে সব বাধা পেরিয়ে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে, তখন দর্শক তার মধ্যে নিজের স্বপ্ন দেখতে পান। এটি কেবল অবাস্তব চিত্রনাট্য নয়, বরং বহু মানুষের মানসিক ক্ষতের উপশম।
মেগা সিরিয়ালের সাফল্যের পেছনে নিছক চড়া রূপসজ্জা থাকে না। এর মূলে রয়েছে কিছু নিখুঁত মনস্তাত্ত্বিক ছক। রাইটার্স রুমে দৃশ্য নির্মাণের সময় কয়েকটি নির্দিষ্ট দিক সবসময় মাথায় রাখা হয়:
টেলিভিশনের এই সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিকটি আরও বিস্তারিত বুঝতে পড়ুন আমাদের টেলিভিশন রেটিং ও টিআরপি নির্ধারণের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি এবং টেলিভিশন ট্রোলিং বনাম বাঙালি মধ্যবিত্তের বিনোদন কালচার।
নগরায়ণের হাত ধরে যৌথ পরিবারের ধারণা সমাজ থেকে প্রায় মুছে গেছে। ছোট ফ্ল্যাটের চার দেওয়ালে বয়োজ্যেষ্ঠদের দিন কাটে চরম নিঃসঙ্গতার মধ্যে।
সন্তানরা কর্মসূত্রে দূরে থাকায় প্রবীণদের কাছে এই দৈনিক ধারাবাহিকগুলো এক নির্ভরযোগ্য সামাজিক অভ্যাসে পরিণত হয়। পর্দার চরিত্রগুলোর সুখ-দুঃখকে তাঁরা নিজেদের জীবনের অঙ্গ করে নেন।
তাছাড়া বাঙালির হারিয়ে যাওয়া পুজোর আয়োজন, বড় পরিবারের রান্না কিংবা বিয়ের পার্বণ ধারাবাহিকে ফলাও করে দেখানো হয়। ফেলে আসা সেই যৌথ জীবনের উষ্ণতা দেখতেই মানুষ আজও টিভির পর্দায় চোখ রাখেন। পরিবারের কমবয়সিরা হয়তো এই দৃশ্য দেখে হাসেন, তবে বয়স্ক সদস্যরা নিয়মিত সময় বের করে পর্দার সামনে বসে পড়েন। ফলে ধারাবাহিকগুলো হয়ে ওঠে প্রজন্মের মেলবন্ধনের এক অদ্ভুত মাধ্যম।
সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যঙ্গ এখন প্রচারের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। চিত্রনাট্যে সামান্য নাটকীয় অতিরঞ্জন থাকলেই তার ছোট ছোট ভিডিও ক্লিপ নিমেষে নেটমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
মিম পেজগুলো সেই দৃশ্য নিয়ে ব্যঙ্গ করে হাজার হাজার ভিউ জোগাড় করে। এর ফলে যাঁরা সাধারণত মেগা সিরিয়াল দেখেন না, তাঁদের মধ্যেও এক ধরণের কৌতূহল জন্মায়।
মার্কেটিং বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘হেট-ওয়াচিং’ (Hate-watching)। দর্শক ভালোবেসে দেখছেন নাকি খুঁত ধরতে দেখছেন, চ্যানেলের রেটিংয়ের ক্ষেত্রে সেই পার্থক্য অর্থহীন। আসল উদ্দেশ্য হল নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দর্শককে ধরে রাখা। সুতরাং নেতিবাচক সমালোচনা প্রকারান্তরে ধারাবাহিকের টিআরপি টিকিয়ে রাখতেই পরোক্ষভাবে সাহায্য করে।
যদি প্রশ্ন ওঠে, কেন এত মানুষ আজও মেগা সিরিয়ালে মজে থাকতে ভালোবাসেন, তবে তার মূলে কাজ করে এই মনস্তাত্ত্বিক বিষয়গুলো:
টেলিভিশন কখনও উচ্চাঙ্গ সাহিত্যের প্ল্যাটফর্ম হতে চায়নি। এটি মূলত মধ্যবিত্ত জীবনের অবসাদ কাটানোর এক সহজলভ্য বাণিজ্যিক বিনোদন মাধ্যম। ওটিটি প্ল্যাটফর্মে যখন ধূসর মনস্তত্ত্ব আর জটিল অপরাধের রমরমা, তখন ড্রয়িংরুমে মেগা সিরিয়ালের চাহিদা একটুও কমেনি। কারণ ক্লান্ত মানুষ দিনশেষে জটিল অঙ্ক মেলাতে চান না। তাঁরা চান সহজ নৈতিকতা ও চেনা আবেগের জয় দেখতে। তিরিশ মিনিটের স্লটে তাঁদের জন্য এই স্বস্তির পরিসরটুকু তৈরি করাই চিত্রনাট্যকারদের মূল লক্ষ্য। যুক্তি দিয়ে মেগা সিরিয়ালের অনেক মোড় হয়তো ব্যাখ্যা করা যায় না, কিন্তু দর্শকের দুর্বল অনুভূতির নাড়ি এই গল্পগুলো ঠিকই চিনে নেয়। আর ঠিক এই কারণেই তীব্র ট্রোলিং ও সমালোচনার ঝড় সামলেও বাংলা মেগা সিরিয়ালের এই রূপকথা বছরের পর বছর সফলভাবে বেঁচে থাকবে।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
সাংবাদিক, লেখক ও চিত্রনাট্যকার। দক্ষিণ কলকাতায় বেড়ে ওঠা। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। কাজ করেছেন নিউজ ১৮ বাংলা, আনন্দবাজার অনলাইন এবং দ্য ওয়াল-র মতো সংবাদমাধ্যমে। এ ছাড়া শিক্ষকতা ও চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গেও যুক্ত থেকেছেন। সমকাল, সমাজ ও মানুষের মনস্তত্ত্ব থেকেই তাঁর সাহিত্য ও চিত্রনাট্যের মূল রসদ খুঁজে নেন। দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ানো এবং পশু-পাখি, প্রকৃতি ও বিজ্ঞানচর্চা তাঁর আগ্রহের বিষয়। মুদ্রিত গল্প সংকলন এবং উপন্যাস এ পর্যন্ত ৩টি; ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত লেখা অজস্র। বর্তমানে চিত্রনাট্য লেখেন বাংলা ধারাবাহিক, ওয়েব সিরিজ এবং বিদেশি ছবির জন্যও।
