

দেশীয় গল্প ও মৌলিক মেকিং নিয়ে নতুন দিনের লড়াইয়ে পরিচালকেরা ছবি- AI
মাল্টিপ্লেক্সে ডাবিং ছবির প্রাইম স্লট বনাম মৌলিক আঞ্চলিক সিনেমার শো না পাওয়ার সংকট। কেন টালমাটাল সিনেপাড়া? জেনে নিন বাস্তব উদাহরণ ও বক্স অফিসের রাজনীতি।
প্রেক্ষাগৃহে টিকিট কাটতে গিয়ে আজকাল বহু সাধারণ দর্শক বিভ্রান্তিতে পড়ছেন। মাল্টিপ্লেক্সের মূল প্রাইম টাইম স্লটগুলো পুরোপুরি দখল করে বসে রয়েছে ভিনভাষী ডাবিং সিনেমা। একদিকে ‘দৃশ্যম ৩’-এর মতো মেগা সাসপেন্স থ্রিলারের দেশজুড়ে আগ্রাসন। অন্যদিকে দক্ষিণী প্যান-ইন্ডিয়া প্রজেক্টের বাংলা ও হিন্দি ডাবিং রমরমিয়ে চলছে। এর বিপরীতে বাংলায় ‘দ্য একেন: কেরালা-এ কুরুক্ষেত্র’, ‘দেসু ৭’ কিংবা ‘দ্য ক্যালকাটা ফাইলস’-এর মতো মৌলিক ছবিগুলো পর্যাপ্ত প্রেক্ষাগৃহ পাওয়ার লড়াই চালাচ্ছে। এই তীব্র বৈষম্য দেখে সিনেপাড়ার অন্দরমহলে শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক। চলচ্চিত্র বিশেষজ্ঞদের একাংশের গভীর নজর এখন dubbed movies vs regional cinema সংঘাতের দিকে। ডাবিং ছবির বিপুল আর্থিক আধিপত্যের মুখে আঞ্চলিক মৌলিক গল্পগুলো কি সত্যিই নিজেদের অস্তিত্ব হারাতে বসেছে?
প্যান-ইন্ডিয়া সিনেমার রমরমার পর ভিনভাষী ডাবিং ছবির জোয়ার বহুগুণ বেড়ে গেছে। তিনশো বা চারশো কোটি টাকার প্রজেক্ট যখন বাংলায় ডাবিং হয়ে আসে, তখন তার ভিএফএক্স আর শব্দের দাপট দর্শকের চোখ ধাঁধিয়ে দেয়।
সাধারণ মানুষ টিকিটের চড়া দাম দিয়ে লার্জার-দ্যান-লাইফ সিনেমাটিক অভিজ্ঞতা কিনতে চান। ফলে সেখানে মধ্যবিত্তের চেনা ড্রামা বা নিজস্ব মাটির গল্প অনেক সময়েই পিছিয়ে পড়ে।
বাস্তব উদাহরণ হিসেবে অজয় দেবগনের ‘দৃশ্যম ৩’ কিংবা সাম্প্রতিক বড় পৌরাণিক ডাবিং রিলিজগুলোর কথাই ধরা যাক। এই ছবিগুলোর বিশাল ক্যানভাস, আইম্যাক্স ফরম্যাট ও চড়া প্রচার সাধারণ দর্শকের মানসিক প্রত্যাশা অনেকটাই বাড়িয়ে দেয়। এর বিপরীতে একটি মৌলিক বাংলা ছবির গড় বাজেট থাকে এক থেকে আড়াই কোটি টাকা। ফলে টেকনিক্যাল চাকচিক্যের দিক থেকে সেই মেগা প্রজেক্টগুলোর সাথে লড়াই করা কার্যত অসম হয়ে ওঠে। তাছাড়া ডাবিং ছবিগুলোর পেছনে থাকে বিপুল অঙ্কের প্রচারের অর্থ। ফলে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে রাজপথের হোর্ডিং—সবকিছুই বড় বিজ্ঞাপনে ঢেকে যায়। এর ফলে খুব স্বাভাবিকভাবেই মৌলিক ছবি দর্শকের নজরে আসার আগেই ভিড়ে হারিয়ে যায়।

আঞ্চলিক চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সবচেয়ে বড় ক্ষোভের জায়গা হল প্রেক্ষাগৃহের শো-টাইম বণ্টন। সিঙ্গল স্ক্রিন কিংবা নামীদামি মাল্টিপ্লেক্স—উভয় জায়গাতেই বড় ডাবিং ও হিন্দি ছবিগুলোকে দিনে দশ-বারোটি পর্যন্ত শো দেওয়া হয়।
বিশেষ করে কর্মব্যস্ত মানুষের সুবিধার জন্য সন্ধ্যা ছ’টা বা সাড়ে সাতটার প্রাইম টাইম স্লটগুলো আগেভাগেই বড় ছবির জন্য বরাদ্দ হয়ে যায়। অথচ মৌলিক বাংলা সিনেমাগুলোকে দেওয়া হয় সকাল এগারোটা কিংবা দুপুর আড়াইটের মতো অপ্রচলিত সময়।
সাম্প্রতিক সময়ে দেখা গেছে, উৎসবের আবহে ‘দ্য একেন: কেরালা-এ কুরুক্ষেত্র’ বা ‘দেসু ৭’-এর মতো জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজি মুক্তি পেলেও বহু হলে লড়াই করে শো বের করতে হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে মূল প্রাইম টাইম থেকে বাংলা ছবিকে নামিয়ে সকালে ঠেলে দেওয়া হয়। এর ফলে সাধারণ চাকরিজীবী দর্শক ইচ্ছা থাকলেও নিজের অঞ্চলের সিনেমা দেখতে যাওয়ার সুযোগ পান না। এরপর কম টিকিট বিক্রির অজুহাত দেখিয়ে প্রথম সপ্তাহ শেষ হতে না হতেই হলমালিকেরা সেই দেশীয় ছবি নামিয়ে দেন। সিনেমা ব্যবসা ও বক্স অফিসের অন্দরমহল বুঝতে আরও পড়ুন আমাদের সিনেমা হলে দর্শক ফেরানোর রাজনীতি ও পিআর কৌশল এবং ভারতীয় প্যান-ইন্ডিয়া সিনেমার উত্থান ও ভবিষ্যৎ।
ডাবিং ছবির পক্ষে থাকা মহলের দাবি, শিল্পকে কোনও ভাষার ভৌগোলিক গণ্ডিতে বেঁধে রাখা ঠিক নয়। দর্শক নিজের মাতৃভাষায় বিশ্বমানের বিনোদন উপভোগ করার পূর্ণ অধিকার রাখেন।
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠে রয়েছে গভীর সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সংকট। অন্য ভাষার মুখের ভঙ্গির সাথে জোর করে বাংলা সংলাপ মেলাতে গিয়ে বহু ডাবিং ছবির সংলাপই কৃত্রিম রূপ ধারণ করে। যেমন অনেক দক্ষিণী অ্যাকশন দৃশ্যের ডাবিং সংলাপে যে অতি-নাটকীয়তা থাকে, তা বাংলা ভাষার সহজাত মাটির স্বাদের সাথে একেবারেই খাপ খায় না।
তাছাড়া শুধুমাত্র ডাবিং ছবির ওপর অতি-নির্ভরতা বাড়লে স্থানীয় টেকনিশিয়ান, সুরকার ও পার্শ্ব অভিনেতারা নিয়মিত কাজ হারান। কারণ একটি পুরো মৌলিক সিনেমা নির্মাণের বদলে শুধু কণ্ঠ ডাবিং করতে নামমাত্র খরচ ও সামান্য কর্মী লাগে। দীর্ঘমেয়াদে এই প্রবণতা স্থানীয় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির নিজস্ব মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে পারে। ফলে সত্যজিৎ রায় কিংবা ঋত্বিক ঘটকের উত্তরসূরিদের নিজস্ব সমাজের শিকড় খোঁজা মৌলিক গল্পগুলোর উৎপাদন ক্রমেই সংকুচিত হতে থাকে।
এই অসম লড়াই রুখতে ভারতের অন্যান্য রাজ্যের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি অনেক আগেই কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। উদাহরণ হিসেবে কর্ণাটকের কন্নড় চলচ্চিত্র মহলের কথা বলা যায়। তারা দীর্ঘদিন নিজেদের রাজ্যে ভিনভাষী ডাবিং ছবি প্রদর্শনের ওপর অলিখিত নিষেধাজ্ঞা বজায় রেখেছিল, যাতে স্থানীয় কন্নড় ভাষার ছবি সুরক্ষিত থাকে।
একইভাবে মহারাষ্ট্রে সরকার কড়া আইন প্রণয়ন করেছে। সেখানকার প্রতিটি মাল্টিপ্লেক্সে বছরে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক প্রাইম টাইম শো মারাঠি সিনেমার জন্য সংরক্ষণ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
বাংলাতেও এখন বিশিষ্ট পরিচালকেরা একযোগে একই ধরণের সরকারি সুরক্ষা নীতির দাবি তুলছেন। মাল্টিপ্লেক্সে অন্তত একটি নির্দিষ্ট শতাংশ প্রাইম টাইম স্থানীয় মৌলিক ছবির জন্য সংরক্ষিত রাখা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। আইনগত রক্ষাকবচ ছাড়া খোলা বাজারের এই আগ্রাসী প্রতিযোগিতায় প্রান্তিক সিনেমা টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। হলমালিকদের লাভের অঙ্ক যেমন বাস্তব, তেমনই একটি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব রক্ষার দায়ও এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
শুধুমাত্র আইন বা সংরক্ষণ দিয়ে ডাবিং ছবির জোয়ারকে দীর্ঘকাল ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। দর্শককে জোর করে হলে টেনে আনা যায় না। তাই মৌলিক সিনেমাকেও কনটেন্ট ও নির্মাণের দিক থেকে যুগোপযোগী করে তুলতে হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলায় শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও নন্দিতা রায়ের ছবি কিংবা ‘দ্য একেন’-এর পারিবারিক রহস্যভেদের মতো টানটান গল্প চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে যে নিখুঁত উপস্থাপনা থাকলে দর্শক বাংলা ছবি দেখতে হলে যাবেনই। একইভাবে দক্ষিণের ডাবিং ঝড় সত্ত্বেও যখন মাটিতে পা রাখা মৌলিক চরিত্র পর্দায় বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে, তখন হল হাউসফুল হয়। ডাবিং ছবি দর্শকদের বিনোদনের পরিধি বাড়িয়েছে ঠিকই, তবে তা যেন নিজস্ব মৌলিক গল্পের শ্বাসরোধ না করে। প্রেক্ষাগৃহ মালিকদের সদিচ্ছা, সরকারের নীতিগত সমর্থন এবং নির্মাতাদের নিজস্ব মাটির টান বজায় থাকলে ডাবিং সুনামির মাঝেও মৌলিক আঞ্চলিক সিনেমা নিজের জমি শক্ত করে ধরে রাখতে পারবে।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
সাংবাদিক, লেখক ও চিত্রনাট্যকার। দক্ষিণ কলকাতায় বেড়ে ওঠা। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। কাজ করেছেন নিউজ ১৮ বাংলা, আনন্দবাজার অনলাইন এবং দ্য ওয়াল-র মতো সংবাদমাধ্যমে। এ ছাড়া শিক্ষকতা ও চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গেও যুক্ত থেকেছেন। সমকাল, সমাজ ও মানুষের মনস্তত্ত্ব থেকেই তাঁর সাহিত্য ও চিত্রনাট্যের মূল রসদ খুঁজে নেন। দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ানো এবং পশু-পাখি, প্রকৃতি ও বিজ্ঞানচর্চা তাঁর আগ্রহের বিষয়। মুদ্রিত গল্প সংকলন এবং উপন্যাস এ পর্যন্ত ৩টি; ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত লেখা অজস্র। বর্তমানে চিত্রনাট্য লেখেন বাংলা ধারাবাহিক, ওয়েব সিরিজ এবং বিদেশি ছবির জন্যও।
