

প্যারা এশিয়াডে টিম ইন্ডিয়া। ছবি: Google
২০২৩ সালে হাংঝৌয়ে ভারত পাঠিয়েছিল প্রায় ৩০৯ জন প্রতিযোগীকে। এ বার আইচি-নাগোয়ায় ভারতীয় দলের সদস্যসংখ্যা ছিল ১৬৮। অর্থাৎ, প্রায় অর্ধেক খেলোয়াড় নিয়েই আগের বারের পদকসংখ্যাকে ছাপিয়ে গিয়েছে ভারত।
এশীয় প্যারা গেমসে ভারতীয় ক্রীড়ার উত্থান যেন এক অবিশ্বাস্য সাফল্যের কাহিনি। ২০১০ সালে চিনের গুয়াংঝৌয়ে যে ভারত মাত্র ১৪টি পদক জিতেছিল, ১৬ বছরের ব্যবধানে সেই দেশই জাপানের আইচি-নাগোয়া এশীয় প্যারা গেমসে ঝুলিতে ভরেছে ১১৪টি পদক। শুধু পদকসংখ্যায় নজির গড়াই নয়, এবারের প্রতিযোগিতায় ভারত শেষ করেছে চতুর্থ স্থানে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়, আগের বারের তুলনায় অনেক কম সংখ্যক খেলোয়াড় নিয়েই এই সাফল্য পেয়েছে ভারতীয় দল।
ভারতের ঝুলিতে এসেছে ৩০টি সোনা, ৩৫টি রুপো এবং ৪৯টি ব্রোঞ্জ। সব মিলিয়ে ১১৪টি পদক। এর আগে ২০২৩ সালে হাংঝৌ এশীয় প্যারা গেমসে ভারতের পদকসংখ্যা ছিল ১০৮। এ বার সেই নজিরও ছাপিয়ে গিয়েছে ভারত। একই সঙ্গে পদক তালিকায় পঞ্চম স্থান থেকে চতুর্থ স্থানে উঠে এসেছে দেশ। দক্ষিণ কোরিয়াকে পিছনে ফেলে এই জায়গা ধরে রাখার কৃতিত্বও ভারতীয় প্যারা-অ্যাথলিটদের।
এই সাফল্যের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয় খেলোয়াড়সংখ্যার তুলনায়। ২০২৩ সালে হাংঝৌয়ে ভারত পাঠিয়েছিল প্রায় ৩০৯ জন প্রতিযোগীকে। এ বার আইচি-নাগোয়ায় ভারতীয় দলের সদস্যসংখ্যা ছিল ১৬৮। অর্থাৎ, প্রায় অর্ধেক খেলোয়াড় নিয়েই আগের বারের পদকসংখ্যাকে ছাপিয়ে গিয়েছে ভারত। প্রতিযোগীদের সংখ্যা কমলেও পদকের সংখ্যা বেড়েছে ছয়টি। এই পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে, আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতীয় প্যারা-অ্যাথলিটদের প্রস্তুতি, প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের কৌশল এবং পদক জয়ের ক্ষমতা কতটা উন্নত হয়েছে।
ভারতের এই ঐতিহাসিক সাফল্যের পিছনে সবচেয়ে বড় অবদান অ্যাথলেটিক্সের। ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ড থেকে ভারত পেয়েছে ৬৫টি পদক। তার মধ্যে রয়েছে ২২টি সোনা, ১৯টি রুপো এবং ২৪টি ব্রোঞ্জ। অর্থাৎ, দেশের মোট পদকের অর্ধেকেরও বেশি এসেছে এই একটি বিভাগ থেকে। ২০২৩ সালের হাংঝৌ প্রতিযোগিতায় অ্যাথলেটিক্সে ভারত পেয়েছিল ৫২টি পদক। এ বার সেই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৬৫।
পদক তালিকায় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অবদান প্যারা-ব্যাডমিন্টনের। এই বিভাগ থেকে এসেছে ১৬টি পদক—তিনটি সোনা, পাঁচটি রুপো এবং আটটি ব্রোঞ্জ। অ্যাথলেটিক্স ও ব্যাডমিন্টন মিলিয়ে ভারত পেয়েছে ৮১টি পদক। এ ছাড়া প্যারা-সাঁতার থেকে ১১টি, তিরন্দাজি থেকে ছ'টি এবং শুটিং থেকে পাঁচটি পদক এসেছে। তবে ব্যাডমিন্টনে আগের বারের তুলনায় পদক কমেছে। ফলে ভবিষ্যতে আরও বেশি বিভাগে পদক জয়ের ক্ষমতা বাড়ানোই হবে ভারতের অন্যতম লক্ষ্য।
ব্যক্তিগত সাফল্যও ভারতের পদকসংখ্যা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। এ বারের প্রতিযোগিতায় ২৬ জন ভারতীয় খেলোয়াড় একাধিক পদক জিতেছেন। তাঁদের মধ্যে ছ'জন একাধিক সোনা পেয়েছেন। তিরন্দাজ শীতল দেবী দু'টি সোনা ও একটি রুপো জিতে বিশেষ নজর কেড়েছেন। অ্যাথলেটিক্সে দিলীপ গাভিত, নিশাদ কুমার, প্রবীণ সুরমা এবং সিমরন শর্মাও দু'টি করে সোনা জিতেছেন। শুটিংয়ে মোনা আগরওয়ালও দু'টি সোনা পেয়েছেন।
এই সাফল্য শুধু কয়েক জন তারকার কৃতিত্ব নয়, বরং ভারতীয় প্যারা-স্পোর্টসের ক্রমবর্ধমান শক্তির পরিচয়। একাধিক বিভাগে একই খেলোয়াড়ের পদক জয়ের ক্ষমতা যেমন বেড়েছে, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতায় ধারাবাহিকতা দেখানোর প্রবণতাও স্পষ্ট হয়েছে।
এশীয় প্যারা গেমসে ভারতের উত্থানকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসাবে দেখার উপায় নেই। প্যারালিম্পিক্সেও গত কয়েক বছরে উন্নতি করেছে দেশ। ২০১৬ সালের রিও প্যারালিম্পিক্সে ভারত পেয়েছিল চারটি পদক। টোকিও ২০২০-এ সেই সংখ্যা বেড়ে হয় ১৯। ২০২৪ সালের প্যারিস প্যারালিম্পিক্সে ভারত জেতে ২৯টি পদক—যা ছিল দেশের সর্বকালের সেরা ফল।
এশীয় প্যারা গেমসে ১৪ থেকে ১১৪ পদকে পৌঁছনোর যাত্রাও সেই বৃহত্তর পরিবর্তনেরই প্রতিফলন। উন্নত প্রশিক্ষণ, খেলোয়াড়দের প্রস্তুতির সুযোগ এবং বিভিন্ন বিভাগে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অভিজ্ঞতা অর্জনের ফলে ভারতীয় প্যারা-অ্যাথলিটরা এখন অনেক বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হয়ে উঠেছেন।
এ বার পদক তালিকায় চিন ৪৩৫টি পদক নিয়ে শীর্ষে শেষ করেছে। জাপান ১৮৬টি পদক নিয়ে দ্বিতীয় এবং উজবেকিস্তান ১৪৫টি পদক নিয়ে তৃতীয় হয়েছে। ভারতের সামনে এখন লক্ষ্য, চতুর্থ স্থান থেকে আরও উপরে ওঠা এবং অ্যাথলেটিক্সের পাশাপাশি অন্য বিভাগগুলিতেও পদকের সংখ্যা বাড়ানো।
২০১০ সালে ১০২ জন প্রতিযোগী নিয়ে মাত্র ১৪টি পদক জিতেছিল ভারত। আর ২০২৬ সালে প্রায় ১৬৮ জন খেলোয়াড়ের দল নিয়ে ১১৪টি পদক। এই পরিসংখ্যানই ভারতীয় প্যারা-স্পোর্টসের ১৬ বছরের পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রমাণ। তবে এই সাফল্য ধরে রাখতে হলে প্রয়োজন ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ, প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের পরিচর্যা এবং আরও বেশি বিভাগে আন্তর্জাতিক মানের প্রস্তুতি।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার সিনিয়র ক্রীড়া সাংবাদিক। দুটি ফুটবল বিশ্বকাপ এবং দুটি ক্রিকেট বিশ্বকাপ কভার করা এই সাংবাদিকের একাধিক আরও আন্তর্জাতিক ইভেন্ট করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে। শুভ্র দুটি বইও লিখেছেন, একটা বিশ্বকাপের গল্প যুদ্ধ এবং শেষটি স্বপ্নের নায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো।
