২৯শে অক্টোবর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
নাইট শিফটে নাজেহাল? ফিট থাকার সহজ ৫ টিপস!

রাত ২টোয় অফিস, কিন্তু ব্রেক দরকার! ছবি:AI

নাইট শিফটে নাজেহাল? ফিট থাকার সহজ ৫ টিপস!

tfa logo icon

সংক্ষিপ্তসার

নাইট শিফট কীভাবে উল্টে দিচ্ছে আমাদের সার্কাডিয়ান রিদম?

নাইট শিফটে কাজ শরীর ও মেটাবলিজমের বারোটা বাজাচ্ছে? সার্কাডিয়ান রিদম, হরমোনের ক্ষতি ও নাইট শিফটের ক্রনিক ক্লান্তি সামলানোর বিজ্ঞানসম্মত বাস্তব সমাধান জানুন।

মূল বিষয়

শহরের রাস্তা যখন নিঝুম, ট্রাফিকের সিগন্যালগুলো যখন হলুদ হয়ে জ্বলছে-নিভছে, ঠিক তখন অনেকের দিন শুরু হয়। আইটি হাবের চকচকে কাচের টাওয়ার, হাসপাতালের এমার্জেন্সি ওয়ার্ড, বিপিও কিংবা কারখানার প্রোডাকশন ফ্লোর—দিনের আলো নিভে যাওয়ার পর একটা বড় অংশের মানুষ স্ক্রিন আর যন্ত্রের সামনে বসে দেশকে সচল রাখছেন।

কিন্তু ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে কি মানুষের শরীর আদৌ তাল মেলাতে পারছে?

বিজ্ঞান বলছে, মানব শরীর কোনো যান্ত্রিক রোবট নয়। লাখ লাখ বছরের বিবর্তনে আমাদের জিন তৈরি হয়েছে সূর্যের আলোয় জাগতে এবং রাতের অন্ধকারে শরীরকে মেরামতি করতে। যখনই সেই প্রাকৃতিক নিয়মকে জোর করে উল্টে দেওয়া হয়, তখন ভেতর থেকে বিদ্রোহ ঘোষণা করে আমাদের ‘সার্কাডিয়ান রিদম’ (Circadian Rhythm)।

নাইট শিফট কেবল চোখের ঘুম কাড়ে না, নিঃশব্দে শরীরের মেটাবলিজম আর হরমোনের স্বাভাবিক ভারসাম্যকে উপড়ে ফেলে।

১. সার্কাডিয়ান রিদম কী এবং শরীর কীভাবে সময় চেনে?

সার্কাডিয়ান রিদম হলো মানুষের শরীরের ২৪ ঘণ্টার অভ্যন্তরীণ বায়োলজিক্যাল ঘড়ি। আমাদের মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাসে থাকা ‘সুপ্রাকায়াসমেটিক নিউক্লিয়াস’ (SCN) এই ঘড়িকে পরিচালনা করে।

  • আলোর খেলা: চোখের রেটিনায় যখনই ভোরের আলো পড়ে, মস্তিষ্ক সংকেত পাঠায়—‘এখন জেগে ওঠার সময়’। তখন মেলাটোনিন (ঘুমের হরমোন) বন্ধ হয়ে কর্টিসল (অ্যাক্টিভিটি হরমোন) ক্ষরণ শুরু হয়।
  • অন্ধকারের সঙ্কেত: আলো নিভলে কর্টিসল কমে আসে এবং মেলাটোনিন শরীরে ছড়িয়ে পড়ে গভীর ঘুমের প্রস্তুতি নিতে।
  • নাইট শিফটের সমস্যা: নাইট শিফটে কাজ করার সময় ফ্লুরোসেন্ট আলো আর কম্পিউটার স্ক্রিন চোখের রেটিনায় পড়ে শরীরকে বিভ্রান্ত করে দেয়। মেলাটোনিন ক্ষরণ আটকে যায়, কিন্তু প্রকৃতির নিয়মে রাত দুটো থেকে ভোর চারটের মধ্যে শরীরের তাপমাত্রা ও রক্তচাপ সর্বনিম্ন স্তরে নেমে যায়। ফলে শরীর যখন বিশ্রাম চায়, মস্তিষ্ক তখন জোর করে কাজ চালাতে বাধ্য হয়।

২. ঘুম-জাগরণের ছক ভাঙলে শরীরের ভেতর কী ঘটে?

আরও পড়ুন
ঘণ্টার পর ঘন্টা সোশ্যাল মিডিয়ায় কাটছে? সাবধান! কী হচ্ছে আপনার সঙ্গে, জানুন!
দরজায় খাবার, তবু মানুষ কেন ছুটছে রেস্তোরাঁয়?
পর্দা খসতেই, স্বাদ হারাল প্রেম? কলকাতার কেবিন কালচারের সংকট!

দিনকে রাত আর রাতকে দিন করার অভ্যাস দীর্ঘদিন চলতে থাকলে শরীরের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিস্টেমে চোট লাগে:

  • ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স ও মেটাবলিক সিন্ড্রোম: রাতে শরীরের পরিপাকতন্ত্র ঘুমের মোডে চলে যায়। সেই সময়ে ভারী খাবার খেলে ইনসুলিন ঠিকমতো কাজ করে না। ফলে নাইট শিফট কর্মীদের মধ্যে টাইপ-২ ডায়াবেটিস, ফ্যাটি লিভার এবং মেদ বাড়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
  • হৃদরোগের নীরব আশঙ্কা: রাতে শরীরের রক্তচাপ স্বাভাবিকভাবেই কমে যাওয়ার কথা। কিন্তু কাজ এবং স্ট্রেসের কারণে রক্তচাপের এই ‘ডিপিং’ (Dipping) ঘটে না। দীর্ঘমেয়াদে যা উচ্চ রক্তচাপ ও হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা বাড়ায়।
  • হরমোনের তারতম্য ও মেজাজ: মেলাটোনিন শুধু ঘুম পাড়ায় না, এটি শরীরের অন্যতম শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট ও সেল-রিপেয়ারিং উপাদান। এর ঘাটতিতে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয় এবং দেখা দেয় খিটখিটে মেজাজ, ক্রনিক উদ্বেগ ও ডিপ্রেশন।

৩. দিনে ঘুমানোর সীমাবদ্ধতা: কেন দিনের ঘুম রাতের বিকল্প নয়?

অনেকেই ভাবেন, ‘রাতে জেগেছি ঠিকই, দিনে তো টানা সাত ঘণ্টা ঘুমিয়ে নিচ্ছি!’ কিন্তু বাস্তব এতটা সহজ নয়।

  • হালকা ঘুম (Non-restorative Sleep): দিনের বেলা পারিপার্শ্বিক শব্দ, সূর্যের আলো এবং ট্রাফিকের আওয়াজে গভীর ঘুম বা ‘REM sleep’-এর ব্যাঘাত ঘটে। ঘুম ভাঙার পরও শরীর সতেজ লাগে না, বরং একটা স্থায়ী ক্লান্তি বা ব্রেন-ফগ ঘিরে থাকে।
  • সামাজিক বিচ্ছিন্নতা: দিনের বেলা যখন পরিবার ও সমাজ জেগে থাকে, নাইট শিফটের কর্মী তখন ঘুমানোর চেষ্টা করেন। ফলে পারিবারিক জীবন ও সামাজিক মেলামেশায় ফাঁক তৈরি হয়, যা মানসিক স্ট্রেস বাড়িয়ে দেয়।

৪. ক্ষতি কমানোর বাস্তব উপায়: কীভাবে শরীরকে মানিয়ে নেবেন?

যাঁদের পেশার তাগিদে নাইট শিফট ছাড়ার উপায় নেই, তাঁদের জন্য কিছু নিখুঁত স্ট্র্যাটেজি মেনে চলা জরুরি:

  • বাড়ি ফেরার পথে সানগ্লাস: সকালের শিফট শেষ করে বাড়ি ফেরার সময় গাঢ় কালো সানগ্লাস পরুন। চোখে ভোরের চড়া রোদ না লাগলে মস্তিষ্ক ‘দিন শুরু হয়ে গেছে’ ভেবে অতিরিক্ত কর্টিসল ছাড়বে না।
  • বেডরুমকে কৃত্রিম রাত বানান: ঘরে লাগান ব্ল্যাকআউট পর্দা (Blackout Curtains)। কোনোভাবেই যেন এক ফোঁটা সূর্যালোক ঘরে না ঢোকে। সাথে ইয়ারপ্লাগ ব্যবহার করে বাইরের শব্দ সম্পূর্ণ আটকে দিন।
  • খাবারের সময় নিয়ন্ত্রণ: রাত দুটো বা তিনটের পর বিরিয়ানি, পিৎজা বা অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাবার একেবারেই বাদ দিন। হালকা প্রোটিন, বাদাম বা ফল খান। ভারী ডিনারটা শিফট শুরুর আগেই সেরে নিন।
  • ক্যাফেইনের ট্র্যাপ থেকে দূরে: রাত দশটায় এক কাপ কফি চলতে পারে, কিন্তু ভোর চারটেয় কড়া কফি খেলে দিনের বেলার ঘুম পুরোপুরি নষ্ট হবে। শিফট শেষের অন্তত চার ঘণ্টা আগে চা-কফি বন্ধ করুন।
  • অ্যাঙ্কর স্লিপিং (Anchor Sleep): ছুটির দিনেও ঘুমের সময় পুরোপুরি উল্টে দেবেন না। অন্তত চার ঘণ্টার একটা নির্দিষ্ট সময় (যেমন সকাল ১০টা থেকে দুপুর ২টো) সপ্তাহের সাত দিনই ঘুমানোর চেষ্টা করুন, যাতে শরীর একটা ছন্দ ধরে রাখতে পারে।

ঘড়ির কাঁটা যতই আধুনিক কর্পোরেট কালচারের সাথে তাল মেলাক, লাখ লাখ বছরের বিবর্তনকে রাতারাতি বোকা বানানো অসম্ভব। নাইট শিফটের কাজ হয়তো রুটিরুজির বাস্তবতা, কিন্তু শরীরকে একটু বাড়তি সুরক্ষা না দিলে সেই সাফল্যের দামটা চুকোতে হয় নিজের স্বাস্থ্য বিসর্জন দিয়ে।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
তিয়াস বন্দ্যোপাধ্যায়
তিয়াস বন্দ্যোপাধ্যায়

সাংবাদিক, লেখক ও চিত্রনাট্যকার। দক্ষিণ কলকাতায় বেড়ে ওঠা। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। কাজ করেছেন নিউজ ১৮ বাংলা, আনন্দবাজার অনলাইন এবং দ্য ওয়াল-র মতো সংবাদমাধ্যমে। এ ছাড়া শিক্ষকতা ও চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গেও যুক্ত থেকেছেন। সমকাল, সমাজ ও মানুষের মনস্তত্ত্ব থেকেই তাঁর সাহিত্য ও চিত্রনাট্যের মূল রসদ খুঁজে নেন। দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ানো এবং পশু-পাখি, প্রকৃতি ও বিজ্ঞানচর্চা তাঁর আগ্রহের বিষয়। মুদ্রিত গল্প সংকলন এবং উপন্যাস এ পর্যন্ত ৩টি; ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত লেখা অজস্র। বর্তমানে চিত্রনাট্য লেখেন বাংলা ধারাবাহিক, ওয়েব সিরিজ এবং বিদেশি ছবির জন্যও।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য