

কেবিনে প্রবীণ ও তরুণদের আড্ডা। ছবি: AI
পর্দার আড়ালের প্রেম থেকে বিপ্লবী বৈঠক—কলকাতার শতাব্দীপ্রাচীন কেবিন কালচার আজ কোন সংকটে? ভেটকির জায়গায় বাসা মাছ আর হারিয়ে যাওয়া স্বাদের ভেতরের গল্প।
সন্ধে নামলেই উত্তর কিংবা মধ্য কলকাতার অলিগলিতে মৃদু আলোর ছায়া। নোনা ধরা দেওয়াল, মাথার ওপর বনবন করে ঘোরা ভারী লোহার পাখা, আর প্লাইউড কিংবা কাঠের পার্টিশনে ঘেরা ছোট্ট এক চিলতে ঘেরাটোপ—যার প্রবেশমুখে ঝুলছে একফালি সুতির পর্দা। বেয়ারা এসে প্লেটে দিয়ে গেল একজোড়া ধোঁয়া ওঠা ফিশ কবিরাজি, পাশে কড়া ঝাঁঝের দিশি কাসুন্দি আর কুচোনো পেঁয়াজ। আসলে, বাঙালির কাছে ‘কেবিন’ কেবল একটা রেস্তোরাঁ ছিল না; ছিল এক গোপন আশ্রয়। কাঠের পার্টিশন আর মায়াবী পর্দা ঘেরা। কলকাতার ‘কেবিন কালচার’ কি স্রেফ নস্টালজিয়ায় টিকে আছে?
একদা প্রেসিডেন্সি-স্কটিশের প্রেম থেকে শুরু করে স্বদেশি আন্দোলনের গুপ্ত বৈঠক—সবেরই সাক্ষী এই কেবিন কালচার। কিন্তু আজকের ঝাঁ-চকচকে ক্যাফে আর মাল্টিকুইজিন ফুড হাবের জমানায় দাঁড়িয়ে রূঢ় সত্যটা অস্বীকার করার উপায় নেই। কেবিনগুলো টিকে আছে বটে, কিন্তু আড্ডার সেই পুরনো গন্ধ আর প্লেটের সেই কিংবদন্তি স্বাদ—দুটোই কি ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে না? দেখে নেওয়া যাক সেই ছবিটাই।
উনিশ শতকের শেষ আর বিশ শতকের শুরুতে কলকাতার কেবিনগুলো যখন মাথা তুলছে, তখন সমাজের নিয়মকানুন ছিল ভীষণ কড়া। অন্তঃপুরবাসিনী মহিলাদের প্রকাশ্যে পুরুষদের সঙ্গে বসে রেস্তোরাঁয় খাওয়ার চল ছিল না। সেই সামাজিক দূরত্ব ঘোচাতেই চালু হয়েছিল কাঠের পার্টিশন আর পর্দার আড়াল—যাকে ভদ্র ভাষায় নাম দেওয়া হয় ‘কেবিন’।

কেবিনের খাবার কোনো দিন আধুনিক ফাস্টফুডের মতো ছিল না; ওটা ছিল আদ্যোপান্ত ব্রিটিশ অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান রান্নার সঙ্গে বাঙালি মশলার এক দুর্দান্ত বোঝাপড়া:

আজ যখন একজন ভোজনরসিক পুরনো দিনের স্মৃতি হাতড়ে কোনো শতাব্দীপ্রাচীন কেবিনে ঢোকেন, অনেক সময়ই তাঁদের মন ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। কথাগুলো অপ্রিয় হলেও সত্যি:

আজকের জেন-জি বা মিলেনিয়াল যখন কফি শপে যায়, তারা খোঁজে হাই-স্পিড ওয়াই-ফাই, আরামদায়ক সোফা আর মনখোলা মুক্ত পরিবেশ।
কেবিনের সেই ‘পর্দার আড়াল’ আজকের প্রজন্মের কাছে অনেকটাই অপ্রাসঙ্গিক। তাদের প্রেম কিংবা আড্ডা এখন প্রকাশ্যে, খোলামেলা। আড়াল খোঁজার সেই আদিম সমাজটাই তো বদলে গেছে। ফলে কেবিনের কাঠের খোপগুলো আজকের তরুণদের কাছে রোমাঞ্চকর লাগলেও, ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কাটানোর জন্য তারা বেছে নিচ্ছে খোলামেলা স্পেস। কেবিন এখন আর দৈনন্দিন হ্যাংআউট নয়; হয়ে উঠেছে মাঝেসাঝে ‘নস্টালজিয়া ট্রিপে’ যাওয়ার ট্রাভেল স্পট।
কেবল দীর্ঘশ্বাসে ঐতিহ্য বাঁচে না
কলকাতার ‘দিলখুশা কেবিন’, ‘মিত্র ক্যাফে’, ‘ফেভারিট কেবিন’ কিংবা ‘বসিরহাট কেবিন’—এরা স্রেফ দোকান নয়, কলকাতার সামাজিক ইতিহাসের জীবন্ত আর্কাইভ।
কিন্তু ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে তাকে সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হয়। খাঁটি উপাদানের সঙ্গে আপস না করা, স্বাস্থ্যবিধির উন্নতি ঘটানো এবং খাবারের সেই আসল স্বাদ ফিরিয়ে আনা জরুরি। মানুষ আজও লাইন দিয়ে দাঁড়াতে রাজি, যদি সেই এক কামড়ে আশির দশকের গন্ধ ফিরে পাওয়া যায়। নতুবা, নস্টালজিয়ার সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে আর যাই হোক, আসল ‘কেবিন কালচার’কে আগামী প্রজন্মের পাতে বাঁচিয়ে রাখা যাবে না।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
সাংবাদিক, লেখক ও চিত্রনাট্যকার। দক্ষিণ কলকাতায় বেড়ে ওঠা। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। কাজ করেছেন নিউজ ১৮ বাংলা, আনন্দবাজার অনলাইন এবং দ্য ওয়াল-র মতো সংবাদমাধ্যমে। এ ছাড়া শিক্ষকতা ও চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গেও যুক্ত থেকেছেন। সমকাল, সমাজ ও মানুষের মনস্তত্ত্ব থেকেই তাঁর সাহিত্য ও চিত্রনাট্যের মূল রসদ খুঁজে নেন। দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ানো এবং পশু-পাখি, প্রকৃতি ও বিজ্ঞানচর্চা তাঁর আগ্রহের বিষয়। মুদ্রিত গল্প সংকলন এবং উপন্যাস এ পর্যন্ত ৩টি; ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত লেখা অজস্র। বর্তমানে চিত্রনাট্য লেখেন বাংলা ধারাবাহিক, ওয়েব সিরিজ এবং বিদেশি ছবির জন্যও।
