প্রতীকী ছবি: Google
২৬শে মে, ২০২৬
সকাল সাড়ে আটটা। নদীয়ার শক্তিনগর জেলা হাসপাতালের বহির্বিভাগের সামনে তখনই লম্বা লাইন। কেউ তেহট্ট থেকে এসেছেন, কেউ করিমপুর থেকে। টিকিট কেটে অপেক্ষা শুরু। কিন্তু অভিযোগ, বহুদিন ধরেই নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও চিকিৎসকের দেখা মিলত না। অনেক সময় রোগীকে বলা হত, “এখানে হবে না, বাইরে দেখান।”
এই ‘বাইরে দেখান’ সংস্কৃতিই দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গের সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় অভিযোগগুলির একটি। আর সেই অভিযোগের বিরুদ্ধেই এবার প্রকাশ্যে কড়া সুর শোনা যাচ্ছে প্রশাসনের তরফে । বনগাঁয় মন্ত্রী অশোক কীর্তনিয়ার সরাসরি হুঁশিয়ারি, “হাসপাতালেই অপারেশন করুন, ব্যবসা করতে হলে চাকরি ছাড়ুন।” অন্যদিকে শক্তিনগরে চিকিৎসকদের সময়মতো হাজিরা নিশ্চিত করতে কড়া নির্দেশিকা।
রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর প্রশাসনের এই সক্রিয়তা নতুন প্রশ্ন তুলছে, সরকারি হাসপাতালের পরিষেবার হাল কি সত্যিই বদলাতে চলেছে? নাকি এটি শুধুই সাময়িক কড়াকড়ি?

গত এক দশকে পশ্চিমবঙ্গে স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর বিস্তার হয়েছে উল্লেখযোগ্য ভাবে। জেলা ও মহকুমা স্তরে নতুন ভবন, সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল, আধুনিক যন্ত্রপাতি, স্বাস্থ্যসাথীর মতো প্রকল্প— সব মিলিয়ে কাগজে-কলমে স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বেড়েছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র অনেক ক্ষেত্রেই আলাদা
রাজ্যের বহু সরকারি হাসপাতালে এখনও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ঘাটতি প্রকট। গ্রামীণ ও সীমান্তবর্তী জেলার হাসপাতালগুলিতে সার্জারি, কার্ডিয়োলজি, নিউরোলজি বা ক্রিটিক্যাল কেয়ারের মতো বিভাগ কার্যত নামমাত্র। বহু ক্ষেত্রে যন্ত্রপাতি থাকলেও তা চালানোর প্রশিক্ষিত কর্মী নেই।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, পশ্চিমবঙ্গের সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মূল সমস্যা 'ইনফ্রাস্ট্রাকচার বনাম সার্ভিস ডেলিভারি'র ফাঁক। অর্থাৎ ভবন তৈরি হয়েছে, কিন্তু পরিষেবা সেই হারে উন্নত হয়নি।
বনগাঁ হাসপাতালকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের ক্ষোভ দীর্ঘদিনের। হাসপাতালটি সুপার স্পেশালিটি হিসেবে ঘোষিত হলেও বাসিন্দাদের অভিযোগ— সামান্য জটিলতা হলেই রোগীকে কলকাতায় রেফার করা হয়।
এক্স-রে, আল্ট্রাসোনোগ্রাফি, অপারেশন— সব ক্ষেত্রেই দীর্ঘ অপেক্ষা। অভিযোগ, বহু চিকিৎসক সরকারি হাসপাতালের চেয়ে ব্যক্তিগত চেম্বার ও নার্সিংহোমে বেশি সময় দেন। ফলে সাধারণ রোগীদের একপ্রকার বাধ্য হয়েই বেসরকারি পরিষেবার দিকে ঝুঁকতে হয়।
এই আবহেই খাদ্য সরবরাহ ও সমবায় দপ্তরের মন্ত্রী অশোক কীর্তনিয়ার মন্তব্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি সরাসরি বলেন, “সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরা বাইরে অপারেশন করবেন না। ব্যবসা করতে হলে চাকরি ছাড়ুন।”
এই বক্তব্যের রাজনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে। কারণ বহুদিন ধরেই অভিযোগ, সরকারি হাসপাতালের ভিতরে এক ধরনের ‘রেফার অর্থনীতি’ গড়ে উঠেছে। সরকারি হাসপাতালের সীমাবদ্ধতা বা বিলম্বকে ব্যবহার করে রোগীকে নার্সিংহোমমুখী করা হয়। বিশেষত জেলা শহরগুলিতে গত কয়েক বছরে দ্রুত বেড়েছে নার্সিংহোম ব্যবসা। বনগাঁ, বহরমপুর, কৃষ্ণনগর, মালদা, বর্ধমান থেকে মেদিনীপুর প্রায় সর্বত্র একই অভিযোগ শোনা যায়।
নদীয়ার শক্তিনগর জেলা হাসপাতালে এবার সেই অনিয়ম রুখতে সরাসরি প্রশাসনিক কড়াকড়ি শুরু হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে— সকাল ৯টার মধ্যে বহির্বিভাগ শুরু করতে হবে এবং দুপুর ২টো অথবা শেষ রোগী দেখা না পর্যন্ত চিকিৎসকদের থাকতে হবে। নিয়ম ভাঙলে নজরদারি হবে। হাসপাতাল সুপার জয়ন্ত সরকারের বক্তব্য, বহির্বিভাগ চলাকালীন বাইরে প্র্যাক্টিস করা যাবে না।
স্বাস্থ্য দপ্তরের একাংশের মতে, এই পদক্ষেপ শুধুমাত্র শক্তিনগরের জন্য নয়। ভবিষ্যতে রাজ্যের অন্যান্য সরকারি হাসপাতালেও উপস্থিতি, পরিষেবা এবং রোগী ব্যবস্থাপনা নিয়ে আরও কঠোর মনিটরিং চালু হতে পারে।
সরকারি হাসপাতাল নিয়ে সাধারণ মানুষের অভিযোগ নতুন নয়—
তবে চিকিৎসকদের একাংশও পাল্টা যুক্তি দিচ্ছেন। তাঁদের বক্তব্য, শুধু চিকিৎসকদের দায়ী করলে সমস্যার সমাধান হবে না।
কারণ—
স্বাস্থ্য মহলের একাংশের মতে, সমস্যাটি মূলত 'সিস্টেমিক'। অর্থাৎ গোটা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক দুর্বলতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং বেসরকারি স্বাস্থ্য ব্যবসার বিস্তারের ফল।
বেসরকারি স্বাস্থ্য ব্যবসার বিস্তার
গত দুই দশকে পশ্চিমবঙ্গে বেসরকারি স্বাস্থ্য খাত দ্রুত বেড়েছে। কলকাতা থেকে জেলা শহর— সর্বত্র নার্সিংহোম ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিস্তার ঘটেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি ব্যবস্থার উপর মানুষের আস্থা কমার সুযোগেই এই বাজার বেড়েছে।
অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, সরকারি হাসপাতালে যে পরীক্ষা এক মাস পরে হবে, সেটি পাশের বেসরকারি কেন্দ্রে একই দিনে হচ্ছে, যদিও খরচ বহুগুণ বেশি। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলি চরম আর্থিক চাপে পড়ছে। ন্যাশনাল স্যাম্পল সার্ভের বিভিন্ন তথ্য বলছে, ভারতে চিকিৎসা খরচ এখনও বহু পরিবারের আর্থিক বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ। পশ্চিমবঙ্গও তার ব্যতিক্রম নয়।
রাজনৈতিক ছত্রছায়া ও স্বাস্থ্য প্রশাসন
সরকারি হাসপাতালগুলিতে অনিয়ম নিয়ে অতীতে বহুবার রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ উঠেছে। হাসপাতাল সূত্রে দাবি, প্রভাবশালী মহলের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় অনেক চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেত না। তাই নতুন প্রশাসনের কড়া নজরদারিকে অনেকেই 'বার্তা রাজনীতি' হিসেবেও দেখছেন। অর্থাৎ সরকার সাধারণ মানুষের কাছে এই বার্তা দিতে চাইছে যে স্বাস্থ্য পরিষেবার প্রশ্নে আর আপস করা হবে না।
তবে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে— নজরদারি কি যথেষ্ট? সমাধান কোথায়? স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র চিকিৎসকদের হুঁশিয়ারি দিয়ে সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সংকট মেটানো সম্ভব নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কার।
যেমন—
জেলা হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগ
আধুনিক যন্ত্রপাতির কার্যকর ব্যবহার
চিকিৎসকদের ডিজিটাল উপস্থিতি মনিটরিং
সরকারি হাসপাতালের রেফার নীতির স্বচ্ছতা
বেসরকারি নার্সিংহোমের উপর কড়া নিয়ন্ত্রণ
গ্রামীণ স্বাস্থ্য পরিকাঠামো শক্তিশালী করা
এবং রোগীকেন্দ্রিক প্রশাসনিক সংস্কৃতি তৈরি
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সরকারি হাসপাতালের উপর সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা।
আস্থার সংকটই সবচেয়ে বড় রোগ
পশ্চিমবঙ্গের সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সংকট হয়তো চিকিৎসক বা পরিকাঠামোর অভাব নয়, বরং আস্থার অভাব। কারণ সাধারণ মানুষ এখনও সরকারি হাসপাতালেই ভিড় করেন। কিন্তু একই সঙ্গে তাঁদের মনে একটা ভয় কাজ করে— “শেষ পর্যন্ত কি বাইরে যেতে হবে?”
বনগাঁ ও শক্তিনগরের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলি তাই শুধুই প্রশাসনিক কড়াকড়ির খবর নয়। এগুলি আসলে বাংলার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার গভীর অসুখের লক্ষণ।
এখন দেখার, সরকার বদলের পর এই কড়া নজরদারি সাময়িক বার্তা হয়েই থেকে যায়, নাকি সত্যিই সরকারি হাসপাতাল আবার সাধারণ মানুষের ভরসার জায়গা হয়ে উঠতে পারে।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অনলাইন বাংলা ম্যাগাজিন।