১৭ই জুন, ২০২৬

info@thefourthaxis.in

The Fourth Axis

header-ad

তারও চেয়ে বেশি ‘দস্যুর ভয়’

তারও চেয়ে বেশি ‘দস্যুর ভয়’

রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। ফাইল চিত্র -দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস।

তারও চেয়ে বেশি ‘দস্যুর ভয়’

সুন্দরবনের মানেই রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য, হাজারো খাঁড়ি-নদী আর বাঘের শাসনাধীন এই অঞ্চল ঘিরে রহস্যের শেষ নেই। আছে আবহমান উপকথাও। বাঘে-মানুষে লড়াইয়ের কাহিনী। কিন্তু এক সময়ে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে ডাকাতরাজ, জলদস্যুরাজ। বাঘ নয়, তখন ভয় ছিল মানুষে।

আজ থেকে তিনশো-চারশো বছর আগে সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ছিল প্রায় জনশূন্য। ঘন জঙ্গল, কুমিরভরা নদী আর অসংখ্য খাঁড়ির গোলকধাঁধা প্রশাসনের নাগালের বাইরে ছিল। সেই সুযোগেই গড়ে উঠেছিল জলদস্যুদের সাম্রাজ্য।

'মগ-ফিরিঙ্গি'

ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে সুন্দরবন এবং বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন জলপথে সবচেয়ে বড় আতঙ্ক ছিল মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুরা। ইতিহাসে যাদের 'মগ-ফিরিঙ্গি' নামে উল্লেখ করা হয়েছে। সে ছিল মগ-পর্তুগিজ জলদস্যুদের রক্তাক্ত অধ্যায়। তাদের দ্রুতগতির নৌকা নদীপথে হামলা চালাত আচমকা। বাণিজ্যিক জাহাজ, মাছ ধরার নৌকা কিংবা নদীতীরের গ্রাম—কিছুই রেহাই পেত না। লুটপাটের পাশাপাশি বহু মানুষকে অপহরণ করে আরাকান ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারে দাস হিসেবে বিক্রি করা হতো। ইতিহাসবিদদের মতে, সেই সময়ে গঙ্গার মোহনা থেকে যশোর, খুলনা, সাতক্ষীরা হয়ে সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ এলাকা কার্যত জলদস্যুদের দখলে ছিল। নদীপথে যাত্রা মানেই ছিল মৃত্যুর ঝুঁকি।

যেখানে দস্যুর ভয়, সেখানে সন্ধ্যা হয়

স্থানীয় লোককথায় বলা হয়, জঙ্গলে ঢুকে বাঘের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা যতটা ছিল, নদীতে নেমে ডাকাতের কবলে পড়ার আশঙ্কা ছিল তার চেয়েও বেশি। অনেক সময় গোটা গ্রামের পুরুষদের বেঁধে রেখে মহিলাদের গয়না, খাদ্যশস্য, গবাদি পশু পর্যন্ত লুট করে নিয়ে যেত দস্যুরা। রাতের অন্ধকারে মানুষ নদীর ধারে প্রদীপ জ্বালাতে ভয় পেত। ভ্রাম্যমাণ দস্যুদলের কাছে 'আলো' মানেই তা লুটযোগ্য কোনও গ্রামের চিহ্ন।

ডাকাত রাজাদের উত্থান

আরও পড়ুন

‘ম্যানগ্রোভের যোদ্ধা’ থেকে ‘ফিরে আসা ছায়া’! বাঘের লড়াইয়ে আশার আলো দেখছে পশ্চিমবঙ্গ

ম্যানগ্রোভের পাতার খসখসানিতে, খাঁড়ির জলের তরঙ্গে আজও কান পাতলে শোনা যায় 'ডাকাত রাজা'দের গল্প। লোককথা অনুযায়ী, কিছু দস্যু নেতা এতটাই ক্ষমতাশালী ছিল যে তারা নিজেদের ছোটখাটো রাজা বলে মনে করত। নদীর নির্দিষ্ট অংশে তাদের অনুমতি ছাড়া কোনও নৌকা চলতে পারত না। বিভিন্ন খাঁড়ি ও দ্বীপে ছিল তাদের গোপন ঘাঁটি । সেখানেই লুটের মাল ভাগ হতো। অনেক জায়গায় এখনও মাটির নীচে গুপ্তধন লুকিয়ে থাকার গল্প শোনা যায়। ইতিহাস আর লোককথার মিশেলে এই সব চরিত্রের অনেক তথ্য আজ অস্পষ্ট হলেও সুন্দরবনের মানুষের স্মৃতিতে তারা এখনও জীবন্ত।

ব্রিটিশ পদক্ষেপ

১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধের পর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার শাসনভার হাতে পায়। কিন্তু সুন্দরবন ছিল তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। উনিশ শতকের শুরুতে ব্রিটিশ প্রশাসন সুন্দরবনের মানচিত্র তৈরি শুরু করে। জঙ্গল পরিষ্কার করে বসতি গড়ে তোলা হল। নজরদারি বাড়ানো হল নদীপথে। ধীরে ধীরে দৌরাত্ম্য কমতে শুরু করল জলদস্যুদের। তবে সম্পূর্ণ নির্মূল হতে কয়েক দশক সময় লেগেছিল।

বাঘে-মানুষে

দস্যুদের দাপট কমলেও রয়ে গেল বাঘের ভয়। বাঘে-মানুষে লড়াই, ভয়, মৃত্যু - এ ইতিহাস সুন্দরবনের ঘরে ঘরে। বহু মানুষ হারিয়ে গেছেন জঙ্গলের বুকে। মানুষকে বাঘের ভয় থেকে রক্ষা করার জন্য আবির্ভূত হলেন 'বনবিবি'। কথিত, দক্ষিণ রায় ছিলেন বাঘের দেবতা বা বাঘরূপী শক্তির প্রতীক। বনবিবি অসহায় মানুষকে রক্ষা করেন দক্ষিণ রায়ের হাত থেকে। সমস্ত সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে বনবিবি হলেন জঙ্গলের দেবী, মানুষের ভরসা।

মৌয়াল, বাওয়ালি, কাঁকড়া শিকারি কিংবা জেলেরা আজও জঙ্গলে প্রবেশের আগে বনবিবির পুজো করেন। কিন্তু লোকসংস্কৃতি গবেষকদের মতে, বনবিবির এই জনপ্রিয়তার পিছনে শুধু বাঘের ভয় নয়, মানুষের অত্যাচার থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষাও জড়িয়ে রয়েছে।

গাছের পাতায় 'নিঃশ্বাস ফেলে হাওয়া'

আজকের সুন্দরবন পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণ। প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটক বাঘ দেখার আশায় জঙ্গলে আসেন। কিন্তু এই প্রকৃতির স্বর্গের অন্তরালে লুকিয়ে রয়েছে ভয়, সংগ্রাম আর রক্তাক্ত ইতিহাসের বহু অজানা অধ্যায়। স্থানীয় প্রবীণদের মুখে এখনও শোনা যায় সেই রাতের গল্প, যখন নদীর বুক চিরে ভেসে আসত জলদস্যুদের নৌকা। তখন বাঘ নয়, মানুষের পায়ের শব্দেই কেঁপে উঠত সুন্দরবনের জনপদ। সুন্দরবনের ইতিহাস তাই শুধু মানুষ বনাম প্রকৃতির লড়াই নয়। এটি মানুষ বনাম মানুষেরও এক নির্মম ইতিহাস। যেখানে বহু সময়ে বাঘের থাবার চেয়েও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছিল মানুষের লোভ, ক্ষমতা আর নিষ্ঠুরতা।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক

দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক

অনলাইন বাংলা ম্যাগাজিন।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য