প্রতীকী ছবি - দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস।
১৩ই জুন, ২০২৬
এক সময় যা ছিল মোবাইলের স্ক্রিনে বন্দি, আজ তা ঢুকে পড়েছে কলেজের আড্ডা, অফিসের ক্যান্টিন থেকে পারিবারিক কথোপকথনেও। ভাষা বদলাচ্ছে, নাকি বদলে যাচ্ছে আমাদের যোগাযোগের ধরন? কলকাতার কলেজ স্ট্রিটের আড্ডা থেকে সল্টলেকের আইটি অফিস, মফস্সলের ক্যাফে থেকে পারিবারিক ডিনার টেবিল— সর্বত্রই মুখে উঠে আসছে চ্যাটবক্সের শব্দ।
ভাষাবিদদের একাংশের মতে, পরিবর্তনটা নিছক শব্দের নয়; বদলে যাচ্ছে যোগাযোগের পুরো সংস্কৃতিই। আর সেই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে স্মার্টফোন।
এক সময় ভাষার বিবর্তন ঘটত সাহিত্য, সংবাদপত্র, নাটক কিংবা সিনেমার হাত ধরে। নতুন শব্দ অভিধানে ঢুকত, তারপর ধীরে ধীরে মানুষের মুখে। এখন সেই প্রক্রিয়া অনেক দ্রুত। হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক মেসেঞ্জার কিংবা শর্ট ভিডিও প্ল্যাটফর্মের ভাষা সরাসরি ঢুকে পড়ছে দৈনন্দিন কথাবার্তায়।
ফলে ‘ঠিক আছে’-র জায়গা নিচ্ছে ‘ওকে’, ‘ব্যক্তিগত বার্তা পাঠাও’ হয়ে যাচ্ছে ‘ডিএম করো’, ‘জানাব’ বদলে ‘আপডেট দেব’। এমনকি ‘হাসতে হাসতে শেষ’ বলার পরিবর্তে অনেকে সরাসরি বলে ফেলছেন— “একেবারে LOL!”
বাংলা বাক্যের মধ্যে ইংরেজি শব্দ, সংখ্যা, ইন্টারনেট-সংস্কৃতির সংক্ষিপ্ত রূপ— সব মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে এক নতুন ভাষাগত মিশ্রণ। ভাষাবিদেরা একে বলছেন ‘ডিজিটাল কোড-মিক্সিং’। এর পিছনে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ— ‘টাইপিং ইকোনমি’। মোবাইলের ছোট স্ক্রিনে দ্রুত যোগাযোগের প্রয়োজন থেকেই জন্ম নিয়েছিল সংক্ষিপ্ত শব্দের ব্যবহার। ‘Be Right Back’ থেকে BRB, ‘Laughing Out Loud’ থেকে LOL, ‘Direct Message’ থেকে DM। প্রথমে এগুলি ছিল লেখার শর্টকাট। পরে সেই শর্টকাটই মুখের ভাষার অংশ হয়ে ওঠে।
তবে এই পরিবর্তন নিয়ে বিতর্কও কম নয়। শিক্ষকদের একাংশের অভিযোগ, চ্যাট-ভাষার অতিরিক্ত ব্যবহার তরুণ প্রজন্মের বানান ও ব্যাকরণচর্চায় প্রভাব ফেলছে। স্কুল-কলেজের খাতা, প্রজেক্ট রিপোর্ট এমনকি আনুষ্ঠানিক লেখালিখিতেও কখনও কখনও ঢুকে পড়ছে মেসেজের সংক্ষিপ্ত ভাষা।
অন্যদিকে ভাষাতাত্ত্বিকদের বক্তব্য ভিন্ন। তাঁদের মতে, ভাষাকে কোনও নির্দিষ্ট ছাঁচে আটকে রাখা যায় না। সমাজ যেমন বদলায়, ভাষাও তেমনই বদলায়। এক সময় বাংলায় ফার্সি শব্দ ঢুকেছিল, পরে ইংরেজি। আজ ডিজিটাল যুগের শব্দ ঢুকছে। এটিই ভাষার স্বাভাবিক বিবর্তন। ‘স্ক্রিনশট’, ‘পিং’, ‘রিল’, ‘আনফলো’, ‘মিউট’, ‘ডিএম’ বা ‘ট্রেন্ডিং’— শব্দগুলি আর খুব একটা বিদেশি মনে হয় না। বরং এগুলি এখনকার প্রজন্মের দৈনন্দিন অভিধানের অংশ।
এক সময় যে ভাষা শুধুই মোবাইলের কিপ্যাডে বন্দি ছিল, তা আজ চায়ের দোকানের আড্ডায়, মেট্রোর কামরায়, অফিসের করিডরে এবং ঘরের ড্রয়িংরুমে পৌঁছে গিয়েছে। তাই প্রশ্নটা আর শুধু ভাষার নয়। আমরা কি ভাষাকে বদলে দিচ্ছি? নাকি আমাদের প্রতিদিনের স্ক্রিন, নোটিফিকেশন আর চ্যাটবক্সই নিঃশব্দে বদলে দিচ্ছে বাংলা ভাষার ভবিষ্যতকে?
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অনলাইন বাংলা ম্যাগাজিন।