

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ও অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। ছবি - Google.
২২শে জুন, ২০২৬
একদিকে রাজ্যের বিপুল ঋণের বোঝা, অন্যদিকে কর্মসংস্থান, পরিকাঠামো ও সামাজিক সুরক্ষার ক্রমবর্ধমান চাপ। এই কঠিন আর্থিক বাস্তবতার মধ্যেই পশ্চিমবঙ্গের প্রথম বিজেপি সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশ হল সোমবার। আর সেই বাজেটের মূল সুর— প্রতিশ্রুতি পূরণ, জনমুখী ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক পুনর্গঠনের বার্তা।
অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত বিধানসভায় ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের জন্য প্রায় ৪.৪ লক্ষ কোটি টাকার বাজেট পেশ করেন। বাজেট বক্তৃতার শুরু থেকেই স্পষ্ট ছিল, এটি কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; বরং নতুন সরকারের রাজনৈতিক অগ্রাধিকার ও আগামী পাঁচ বছরের উন্নয়ন-রূপরেখার ঘোষণাপত্র।
সবচেয়ে আলোচিত ঘোষণা নিঃসন্দেহে সরকারি কর্মচারীদের জন্য। দীর্ঘদিনের আন্দোলন, আদালতের নির্দেশ এবং কেন্দ্রের সঙ্গে ডিএ-র ফারাক নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্কের আবহে সরকার ২০ শতাংশ ডিএ বৃদ্ধির ঘোষণা করেছে। ফলে রাজ্যের লক্ষাধিক সরকারি কর্মী ও পেনশনভোগীদের হাতে অতিরিক্ত অর্থ পৌঁছবে। একই সঙ্গে জানানো হয়েছে, ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে সপ্তম বেতন কমিশনের সুপারিশ কার্যকর করা হবে।
রাজনৈতিক মহলের মতে, ডিএ নিয়ে ক্ষুব্ধ সরকারি কর্মচারীদের একটি বড় অংশকে ফের সরকারের পাশে টানার কৌশল হিসেবেও এই সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ গত কয়েক বছরে ডিএ ইস্যু রাজ্যের অন্যতম বড় রাজনৈতিক প্রশ্নে পরিণত হয়েছিল।
তবে বাজেটের সবচেয়ে বড় চমক চাকরিপ্রার্থীদের জন্য। রাজ্যের বিভিন্ন সরকারি দফতরে এক লক্ষ শূন্যপদে নিয়োগের ঘোষণা করা হয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুলিশ, প্রশাসনিক পরিষেবা, সেচ, পূর্ত এবং স্থানীয় প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে এই নিয়োগ হওয়ার কথা। নিয়োগ দুর্নীতি নিয়ে দীর্ঘ বিতর্কের পরে স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর নিয়োগ ব্যবস্থার আশ্বাসও দিয়েছে সরকার।
অর্থনীতিবিদদের একাংশের মতে, এক লক্ষ সরকারি চাকরির ঘোষণা বাস্তবায়িত হলে তা শুধু বেকারত্ব কমাতেই সাহায্য করবে না, গ্রামীণ ও শহুরে অর্থনীতিতেও ক্রয়ক্ষমতা বাড়াবে। কারণ সরকারি চাকরি এখনও বাংলার মধ্যবিত্ত সমাজে অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান ভরসা।
মহিলাদের জন্য বরাদ্দ এই বাজেটের আর এক বড় আকর্ষণ। ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’-র জন্য ৩৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। সরকারের দাবি, এই প্রকল্পের মাধ্যমে আর্থিকভাবে দুর্বল পরিবারের মহিলাদের সরাসরি আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে দেশের বিভিন্ন রাজ্যে মহিলাদের উদ্দেশে নগদ সহায়তা প্রকল্প রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সফল হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতাকে সামনে রেখেই বাংলাতেও মহিলাদের আর্থিক ক্ষমতায়নকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে মনে করছে প্রশাসনিক মহল।
যুব সমাজের জন্য চালু হয়েছে ‘ভরসা’ প্রকল্প। স্নাতক বেকারদের প্রতি মাসে ৩ হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর, ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং নতুন প্রযুক্তি নির্ভর শিল্প গড়ে তুলতে বিশেষ ‘এআই মিশন’-এর কথাও বলা হয়েছে। সরকারের আশা, আগামী কয়েক বছরে প্রযুক্তি খাতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
স্বাস্থ্য ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হয়েছে। জেলা হাসপাতালগুলির আধুনিকীকরণ, নতুন চিকিৎসক নিয়োগ, টেলিমেডিসিন পরিষেবা সম্প্রসারণ এবং সুন্দরবনের মতো দুর্গম অঞ্চলে বিশেষ স্বাস্থ্য অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধিকে গ্রামীণ স্বাস্থ্য পরিষেবা শক্তিশালী করার প্রচেষ্টা বলেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
পরিকাঠামো উন্নয়নেও জোর দিয়েছে সরকার। নতুন রাস্তা, সেতু, শিল্প করিডর, লজিস্টিক পার্ক এবং নগর উন্নয়ন প্রকল্পে বড় বিনিয়োগের ঘোষণা করা হয়েছে। শিল্পমহলের কাছে ইতিবাচক বার্তা দিতে ‘সিঙ্গল উইন্ডো’ অনুমোদন ব্যবস্থা এবং বিনিয়োগবান্ধব প্রশাসনিক সংস্কারের কথাও বলা হয়েছে বাজেটে।
তবে বিরোধীরা ইতিমধ্যেই এই বাজেটকে ‘জনমোহিনী’ বলে কটাক্ষ করতে শুরু করেছে। তাদের দাবি, রাজ্যের আর্থিক অবস্থার সঙ্গে এত বিপুল ব্যয়ের সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। যদিও সরকারের বক্তব্য, কর আদায় বৃদ্ধি, শিল্প বিনিয়োগ এবং প্রশাসনিক অপচয় কমানোর মাধ্যমে এই ব্যয়ভার সামলানো সম্ভব হবে।
সব মিলিয়ে ২০২৬-২৭ সালের বাজেট এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে। সরকারি কর্মচারী, বেকার যুবক, মহিলা, কৃষক, মধ্যবিত্ত— প্রায় প্রতিটি শ্রেণির জন্য পৃথক ঘোষণা রেখে বিজেপি সরকার বুঝিয়ে দিয়েছে, ক্ষমতায় আসার পর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলিকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার দিকেই তারা এগোতে চায়। এখন নজর থাকবে একটাই প্রশ্নে— ঘোষণার ঝুলি কত দ্রুত বাস্তবের মাটিতে নামাতে পারে সরকার।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অনলাইন বাংলা ম্যাগাজিন।
