

অনেক ইতিহাসের সাক্ষী নিয়ে দাঁড়িয়ে ব্যান্ডেল চার্চ। ছবি - Google.
৩রা জুলাই, ২০২৬
কলকাতাকে অনেকেই বাংলায় ইউরোপীয় সভ্যতার সূতিকাগার বলে মনে করেন। কিন্তু ইতিহাসের পাতা উল্টে দেখলে জানা যায়, কলকাতার জন্মেরও বহু আগে হুগলি নদীর তীরে গড়ে উঠেছিল বাংলার প্রথম ইউরোপীয় জনপদ। সেই জনপদের নাম ব্যান্ডেল। আর সেই ইতিহাসের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সাক্ষী আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যান্ডেল চার্চ।
হুগলি জেলার এই ঐতিহাসিক চার্চ শুধু একটি ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, এটি বাংলায় ইউরোপীয় আগমন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, যুদ্ধ, কূটনীতি এবং সংস্কৃতির মেলবন্ধনের এক জীবন্ত দলিল। প্রায় সাড়ে চারশো বছরের ইতিহাস বহন করে চলা এই স্থাপত্য আজও পর্যটক, গবেষক এবং ইতিহাসপ্রেমীদের কাছে সমান আকর্ষণের কেন্দ্র।
১৫৩০-এর দশক থেকেই পর্তুগিজ নাবিকরা বাংলায় আসতে শুরু করেন। প্রথমে বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে এলেও পরে হুগলি নদীর তীরে স্থায়ী বসতি গড়ে তোলেন তাঁরা। মসলিন, রেশম, লবণ, নীল, মশলা ও অন্যান্য মূল্যবান পণ্যের ব্যবসার জন্য হুগলি দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বন্দর হিসেবে পরিচিতি পায়। এই বন্দরকে ঘিরেই গড়ে ওঠে ব্যান্ডেল। ইতিহাসবিদদের মতে, 'ব্যান্ডেল' নামটি এসেছে বাংলা শব্দ 'বন্দর' থেকেই।
তখনও কলকাতা বলে কোনও শহরের অস্তিত্ব নেই। জব চার্নকের কলকাতায় আগমনের প্রায় একশো বছর আগেই ব্যান্ডেলে ইউরোপীয়দের বসতি, গির্জা, বাজার, গুদামঘর, প্রশাসনিক কাঠামো—সব মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ উপনিবেশ গড়ে উঠেছিল। সেই কারণেই বহু ইতিহাসবিদ ব্যান্ডেলকেই বাংলার প্রথম ইউরোপীয় শহর বলে উল্লেখ করেন।
১৫৯৯ সালে অগাস্টিনিয়ান ধর্মযাজকেরা নির্মাণ করেন 'বেসিলিকা অব দ্য হোলি রোজারি'। এটাই বর্তমানের ব্যান্ডেল চার্চ। বাংলায় নির্মিত প্রাচীনতম খ্রিস্টীয় উপাসনালয়গুলির মধ্যে এটি অন্যতম। সেই সময় চার্চটি শুধু প্রার্থনার স্থান ছিল না, বরং ইউরোপীয় সমাজজীবনেরও কেন্দ্রবিন্দু ছিল।
কিন্তু সুখের দিন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ১৬৩২ সালে মুঘল সম্রাট শাহজাহান পর্তুগিজদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালান। অভিযোগ ছিল, পর্তুগিজরা দাস ব্যবসা, জলদস্যুতা এবং বেআইনি বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েছিল। দীর্ঘ অবরোধের পর মুঘল বাহিনী হুগলি দখল করে। ধ্বংস হয়ে যায় চার্চ, ভেঙে পড়ে পর্তুগিজ জনপদ। বহু মানুষ নিহত হন, অনেকে বন্দি হয়ে আগ্রায় নিয়ে যাওয়া হয়।
জনশ্রুতি অনুযায়ী, বন্দি ধর্মযাজকদের মধ্যে একজন অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে যান। পরে সম্রাট শাহজাহান তাঁদের মুক্তি দেন এবং পুনরায় চার্চ নির্মাণের অনুমতিও দেন।
১৬৬০ সালে নতুন করে নির্মিত হয় বর্তমান ব্যান্ডেল চার্চ। ইউরোপীয় ও ভারতীয় স্থাপত্যরীতির মিশেলে তৈরি এই চার্চ আজও আগের মতোই মহিমায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। পরবর্তীকালে একাধিকবার সংস্কার হলেও মূল ঐতিহাসিক কাঠামো অক্ষত রাখা হয়েছে।
চার্চের সুউচ্চ ঘণ্টাঘর, খিলানযুক্ত প্রবেশপথ, রঙিন কাঁচের জানালা, প্রাচীন কাঠের বেদি, পুরনো সমাধিফলক এবং ইউরোপীয় শিল্পরীতিতে নির্মিত ভাস্কর্য আজও দর্শকদের মুগ্ধ করে।
ব্যান্ডেল চার্চের সবচেয়ে বড় আকর্ষণগুলির মধ্যে অন্যতম হল বিশাল একটি জাহাজের মাস্তুল। এটি কীভাবে এখানে এল, তা নিয়ে রয়েছে একটি জনপ্রিয় কিংবদন্তি।
কথিত আছে, বঙ্গোপসাগরে প্রবল ঝড়ে একটি পর্তুগিজ জাহাজ প্রায় ডুবে যাচ্ছিল। নাবিকেরা তখন ভার্জিন মেরির কাছে প্রার্থনা করেন। অলৌকিকভাবে জাহাজটি নিরাপদে হুগলি বন্দরে পৌঁছায়। কৃতজ্ঞতা প্রকাশের নিদর্শন হিসেবে জাহাজের অধিনায়ক সেই বিশাল মাস্তুলটি চার্চে দান করেন। আজও সেটি চার্চের সামনে ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে।
বড়দিন, নববর্ষ, গুড ফ্রাইডে কিংবা 'ফিস্ট অব আওয়ার লেডি অব দ্য রোজারি' উপলক্ষে হাজার হাজার ভক্ত ও পর্যটক এখানে আসেন। শুধু খ্রিস্টান সম্প্রদায় নয়, বিভিন্ন ধর্মের মানুষও মানত করতে এবং ঐতিহাসিক স্থাপত্য দেখতে ব্যান্ডেল চার্চে ভিড় জমান।
পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দফতরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হেরিটেজ পর্যটনকেন্দ্র হিসেবেও ব্যান্ডেল চার্চের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। কলকাতা থেকে অল্প সময়েই ট্রেন বা সড়কপথে পৌঁছে যাওয়া যায় এই ঐতিহাসিক স্থানে।
বাংলার ইতিহাসে ব্যান্ডেল চার্চ কেবল একটি গির্জা নয়। এটি স্মরণ করিয়ে দেয়, ইউরোপীয় শক্তির সঙ্গে বাংলার প্রথম স্থায়ী যোগাযোগ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বিস্তার, মুঘল সাম্রাজ্যের সঙ্গে সংঘাত এবং বহুসাংস্কৃতিক সমাজ গঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
আজ যখন অধিকাংশ মানুষ ইউরোপীয় ইতিহাসের সূচনা বলতে কলকাতার কথা ভাবেন, তখন ব্যান্ডেল চার্চ নীরবে মনে করিয়ে দেয়—এই ইতিহাসের শুরু হয়েছিল আরও আগে, হুগলি নদীর তীরে। চার শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে দাঁড়িয়ে থাকা এই স্থাপত্য তাই শুধু ইট-পাথরের গির্জা নয়; এটি বাংলার অতীতের এক অমূল্য উত্তরাধিকার, যেখানে প্রতিটি দেওয়াল, প্রতিটি ঘণ্টাধ্বনি আর প্রতিটি পুরনো ইট যেন ইতিহাসের এক একটি জীবন্ত গল্প শুনিয়ে চলে।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অনলাইন বাংলা ম্যাগাজিন।
