২৯শে জুলাই, ২০২৬

info@thefourthaxis.in

The Fourth Axis

header-ad

দ্বৈত চরিত্রই বাঁচিয়ে রেখেছে ‘বাবু কালচার’

দ্বৈত চরিত্রই বাঁচিয়ে রেখেছে ‘বাবু কালচার’

কলকাতার বাবু কালচারের পরিচিত চিত্র। ছবি -Google. গ্রাফিক্স - দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস।

দ্বৈত চরিত্রই বাঁচিয়ে রেখেছে ‘বাবু কালচার’

একদিকে বাঈজির নূপুরে রাত ও কলকাতার বাবুদের রঙিন সাম্রাজ্য, অন্যদিকে বাংলা নবজাগরণের পৃষ্ঠপোষকতা - এই দুমুখী চরিত্রই বহন করছে বাংলার বাবু কালচার।

কলকাতা মানেই শুধু ব্রিটিশ আমলের রাজধানী নয়, এক সময় এটি ছিল আড়ম্বর, বিলাসিতা আর সাংস্কৃতিক জৌলুসেরও রাজধানী। উনিশ শতকের কলকাতার ইতিহাসের পাতায় আজও সমান উজ্জ্বল এবং বিতর্কিত একটি অধ্যায়—‘বাবু সংস্কৃতি’। ঝাড়বাতির আলো, বিদেশি মদের পেয়ালা, বাঈজিদের নাচ-গান আর রাতভর মেহফিলের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক জটিল সমাজবাস্তবতা।

ব্রিটিশ শাসনের সময় কলকাতা যখন দ্রুত বাণিজ্য ও প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে উঠে আসছে, তখনই জন্ম নেয় এক নতুন ধনী শ্রেণি। জমিদারি, ব্যবসা-বাণিজ্য, রাজস্ব আদায় কিংবা ইংরেজ শাসকদের ঘনিষ্ঠতার সুবাদে বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে ওঠা এই অভিজাতদেরই সমাজ চিনত ‘বাবু’ নামে। তাঁদের জীবনযাত্রা ছিল সাধারণ মানুষের কল্পনারও বাইরে।

উত্তর কলকাতার বিশাল প্রাসাদোপম বাড়িগুলিতে প্রায়ই বসত জমকালো আসর। ইউরোপীয় আসবাব, দামি ঝাড়বাতি, বিদেশি সুগন্ধি এবং বিরাট ভোজসভা ছিল সেই আভিজাত্যের অংশ। সম্পদের প্রদর্শন যেন এক ধরনের সামাজিক প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছিল। প্রচলিত কাহিনিতে এমনও শোনা যায়, কেউ কেউ কেবল ধনসম্পদের অহঙ্কার দেখাতেই নোটে আগুন লাগিয়ে সিগারেট ধরাতেন।

আরও পড়ুন

কলকাতার রাস্তা থেকে মুছে যাচ্ছে হাতে টানা রিক্সা, স্মৃতি আর সংকটে জড়ানো শহুরে গল্প
কলকাতার বুকেই ছিল এক টুকরো চিন! ডাম্পলিংয়ের ধোঁয়া, লাল লণ্ঠনের আলো আর হারিয়ে যাওয়া এক পাড়ার গল্প

তবে বাবু সংস্কৃতির সবচেয়ে আলোচিত দিক ছিল বাঈজিদের মেহফিল। লখনউ, বেনারস ও দিল্লি থেকে আগত খ্যাতনামা বাঈজিরা ছিলেন অভিজাত সমাজের অন্যতম আকর্ষণ। তাঁদের ঠুমরি, দাদরা, গজল ও কথক নৃত্যের আসরে রাতভর মজে থাকতেন শহরের ধনী বাবুরা। কোথাও সেই আসর ছিল উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের পীঠস্থান, আবার কোথাও তা ছিল নিছক ভোগবিলাসের প্রতীক।

কিন্তু বাবুদের ইতিহাসকে শুধুমাত্র মদ, নারী ও আমোদ-প্রমোদের গল্প বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এই শ্রেণির বহু মানুষই বাংলা নবজাগরণের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তাঁদের অর্থসাহায্যে গড়ে উঠেছিল নাট্যমঞ্চ, ছাপাখানা, সাহিত্যসভা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বাংলা থিয়েটারের বিকাশ, সংবাদপত্র প্রকাশ এবং আধুনিক শিক্ষার প্রসারে তাঁদের অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য।

এই দ্বৈত চরিত্রই বাবু সংস্কৃতিকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। একদিকে রাতভর বাঈজিদের নাচে মজে থাকা অভিজাত সমাজ, অন্যদিকে সমাজ সংস্কার ও শিক্ষার প্রসারে অনুদান দেওয়া একই মানুষ। বিলাসিতা ও সংস্কৃতিচর্চা যেন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ হয়ে উঠেছিল।

তবে সমসাময়িক সমাজে বাবুরা সমালোচনারও মুখে পড়েছিলেন। ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের সাহিত্যে তাঁদের অতিরঞ্জিত বিলাসিতা, ইংরেজি অনুকরণ এবং আত্মপ্রচারের প্রবণতা বারবার উঠে এসেছে। বিশেষ করে হুতোম প্যাঁচার নকশা-র পাতায় সেই সময়ের সমাজজীবনের নানা অসঙ্গতি আজও জীবন্ত।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জাতীয়তাবাদী চেতনার উত্থান, সমাজ সংস্কার আন্দোলনের বিস্তার এবং শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থানে বাবু সংস্কৃতির জৌলুস ম্লান হতে শুরু করে। কিন্তু উত্তর কলকাতার বনেদি বাড়ি, সাবেকি দুর্গাপুজো এবং পুরনো আলোকচিত্রে এখনও রয়ে গেছে সেই যুগের স্মৃতি।

কলকাতার ইতিহাসে বাবু সংস্কৃতি তাই শুধুই অপচয়ের কাহিনি নয়, আবার নিছক গৌরবগাথাও নয়। এটি এমন এক সময়ের প্রতিচ্ছবি, যেখানে বাঈজির নূপুরের শব্দ, মদের পেয়ালার ঝংকার এবং নবজাগরণের আলো একসঙ্গে মিশে তৈরি করেছিল শহরের সবচেয়ে রঙিন, সবচেয়ে বিতর্কিত এবং সবচেয়ে নাটকীয় অধ্যায়।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক

দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক

অনলাইন বাংলা ম্যাগাজিন।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য