hand-rickshaw
২৫শে এপ্রিল, ২০২৬
কলকাতা: তিলোত্তমার ভোরবেলা। অলস পড়ে থাকা রাস্তা, হালকা চায়ের গন্ধ, মাঝেমধ্যে টুং টাং শব্দ, ধীরগতি দু'চাকায় ভর করা রিক্সা এগিয়ে চলেছে। হাতে টানা। 'সওয়ার বাবুটি'ও দুলছেন তার গতির তালে তালে। শহরের চেনা দৃশ্য। তার বোধহয় বিদায় নেওয়ার সময় আসন্ন শহরের বুক থেকে।
শহরের শিরায় মিশে থাকা ইতিহাস
হাতে টানা রিক্সা শুধু একটি যান নয়, এটি কলকাতার আত্মার অংশ। উনিশ শতকের শেষভাগে এই রিক্সা শহরে আসে, আর অচিরেই হয়ে ওঠে নাগরিক জীবনের অপরিহার্য অঙ্গ। উত্তর কলকাতার ভাঙাচোরা গলি, বৃষ্টিতে ডোবা রাস্তা—সব জায়গাতেই ছিল তার অবাধ যাতায়াত।
কিন্তু এই ইতিহাসের উল্টো পিঠে রয়েছে ঘাম, দারিদ্র্য আর বেঁচে থাকার লড়াই। ভিনরাজ্য থেকে আসা অসংখ্য মানুষ তো বটেই, এই শহরের অনেকেও জীবিকার খোঁজে এই পেশায় জড়িয়ে পড়েছিলেন। দিনের পর দিন মানুষ টেনে তাঁরা টিকিয়ে রেখেছেন নিজেদের পরিবার—এ এক নীরব সংগ্রামের কাহিনি। অন্য রাজ্য থেকে রোজগারের তাগিদে আসা সেই মানুষগুলোও একসময় হয়ে উঠলেন আমাদের সহনাগরিক।

মানবাধিকার, আধুনিকতা ও বিতর্ক
সময় পালটায়, পালটায় তার পছন্দ, নতুন আইডিয়া পুরনোকে ফেলে দিতে বলে। যা একসময় অপরিহার্য ছিল, একদিন বাতিল হয়ে যায়। একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে, যেখানে প্রযুক্তি আকাশ ছুঁয়েছে, সেখানে একজন মানুষ আর একজন মানুষকে টানছে, এ দৃশ্য আমাদের অস্বস্তিতে ফেলে। আধুনিক সময় মেনে নিতে পারে না এ দৃশ্য যন্ত্রযুগে দাঁড়িয়ে। স্বাভাবিকভাবে একদিন প্রশাসন এগিয়ে আসে এর সমাধানে।
২০০৬ সালে হাতে টানা রিক্সাকে ‘অমানবিক’ আখ্যা দিয়ে বেআইনি ঘোষণা করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট—এই প্রথার অবসান। কিন্তু তারপর?
পেটের দায় বনাম নীতির লড়াই
প্রশাসনের নির্দেশ কাগজে লেখা থাকলেও, জীবনের খাতা কিন্তু অন্য হিসেব মেনে চলে। রিক্সা উঠে গেলে তাঁরা যাবেন কোথায়? নতুন কাজ কি এত সহজে জুটবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না দিয়েই কি বন্ধ করা যায় একটি জীবিকা? এখানেই তৈরি হয় সেই নিঃশব্দ দ্বন্দ্ব— একদিকে মানবিকতা, অন্যদিকে বেঁচে থাকার লড়াই! একদিকে সভ্যতার দাবি, অন্যদিকে পেটের টান!
'যন্ত্রযুগ'
আজকের কলকাতা বদলে গেছে। অ্যাপ ক্যাব, মেট্রো, ই-রিক্সা—সব মিলিয়ে শহর ছুটছে গতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। এসেছে মোটর-চালিত পেডেল-রিক্সা। সেখানে হাতে টানা রিক্সা যেন সময়ের বাইরে পড়ে থাকা এক টুকরো ইতিহাস। আগের তুলনায় হাত টানা রিক্সার সংখ্যা কমেছে । অনেকেই পেশা বদলেছেন, কেউ হারিয়ে যাচ্ছেন শহরের ভিড়ে। তবু পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।
বর্ষার দিনে, যখন রাস্তায় হাঁটু জল, তখন আবার দেখা যায় সেই মানুষটিকে—হাঁপাতে হাঁপাতে টেনে নিয়ে চলেছেন যাত্রীকে! যেন শহর তখন স্বীকার করে নেয়, সব আধুনিকতার পরেও, কিছু প্রয়োজন এখনও থেকে যায়!
সভ্যতার 'কনফ্লিক্ট'
হাতে টানা রিক্সা কি শুধু লজ্জার প্রতীক? না কি এটি সংগ্রামের এক জীবন্ত দলিল? ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। কারণ এই রিক্সার চাকার সঙ্গে জড়িয়ে আছে কলকাতার ইতিহাস, আবার একই সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসমতা ও বঞ্চনার কাহিনিও।
শহরবাসীর মতে, সম্ভবত সময়ের নিয়মেই একদিন পুরোপুরি হারিয়ে যাবে হাতে টানা রিক্সা। শহর আরও আধুনিক হবে, আরও দ্রুত হবে। যে মানুষগুলো বয়ে নিয়ে যেতেন সওয়ার দিনভর মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, সভ্যতার 'কনফ্লিক্ট'-এর কবলে পড়ে তাঁরাও হারিয়ে যাবেন। হয়ত এক শহর থেকে অন্য শহরে, এক জীবিকা থেকে অন্য জীবিকায় কাটবে তাঁদের বাকি জীবনের সংগ্রাম। আমরা জানতে পারব না সে কথা।
কিন্তু তখনও কোনও পুরনো ছবিতে, কোনও গল্পে, বা স্মৃতির ভাঁজে থেকে যাবে এক মানুষ—যে আরেক মানুষকে টেনে নিয়ে চলেছে! সে গল্প বয়ে যেতে থাকবে সময়ের হাত ধরে যুগ থেকে যুগান্তরে। গল্পে মিশে থাকবে রোজের যুদ্ধ, টিকে থাকা, দ্বন্দ্ব, হারিয়ে যাওয়া।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অনলাইন বাংলা ম্যাগাজিন।