

প্রতীকী ছবি - AI
১০ই আগস্ট, ২০২৬
তিনশো বছরেরও বেশি পুরোনো শহর কলকাতা আজ এক অভূতপূর্ব সঙ্কটের দোরগোড়ায়। গঙ্গার শাখা হুগলির তীরবর্তী এই শহর ভৌগোলিকভাবেই জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হয়ে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, আগামী ৫০ বছরে এই শহরের আবহাওয়া ও পরিবেশ এতটাই ভয়াবহ রূপ নিতে পারে, যে তা নিয়ে এখন থেকেই সতর্ক না হলে অদূর ভবিষ্যতেই বড়সড় বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হবে কলকাতাবাসীকে।
ডিজিটাল যুগে দাঁড়িয়ে যখন আমরা স্মার্ট সিটির স্বপ্ন দেখছি, তখন শহর কলকাতার মেরুদণ্ড ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে। আগামী পাঁচ দশকে কলকাতার সামনে ঠিক কী কী সঙ্কট অপেক্ষা করছে তা দেখে নেওয়া যাক।
কলকাতার বায়ুর গুণমান সূচক বা এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (AQI) প্রতি বছর শীতকাল এলেই বিপজ্জনক মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণকাজ এবং যানবাহনের ধোঁয়া কলকাতাকে যেন আস্ত একটা গ্যাস চেম্বারে পরিণত করছে। আগামী কয়েক দশকে এই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। বাতাসে ভাসমান ধূলিকণা (PM 2.5 এবং PM 10) এতটাই বেড়ে যেতে পারে যে, এখানকার বাসিন্দাদের পক্ষে শ্বাস নেওয়াও কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসের ক্যানসার এবং হাঁপানির মতো রোগ ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ে মহামারির আকার ধারণ করার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।
শহরের বেশ কিছু এলাকা ও শহরতলিতে ইতিমধ্যেই গ্রীষ্মকালে তীব্র জলকষ্ট দেখা যায়। আগামী ৫০ বছরে এই সঙ্কট চরমে পৌঁছাবে। পূর্ব কলকাতার জলাভূমি, যা শহরের স্বাভাবিক জল শোধনাগার বা ‘কিডনি’ হিসেবে কাজ করে, সেটা প্রশাসনের গা ছাড়া মনোভাব এবং এক শ্রেণির জমি হাঙরদের দাপটে ক্রমশ ভরাট হয়ে যাচ্ছে। ফলে ভূগর্ভস্থ জলস্তর পুনরায় ভর্তি হওয়ার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ভূগর্ভস্থ জলের স্তর আরও দ্রুত নিচে নেমে গেলে একদিকে যেমন পানীয় জলের চূড়ান্ত অভাব দেখা দেবে, অন্যদিকে জলের সঙ্গে আর্সেনিক ও অন্যান্য খনিজ পদার্থের মিশ্রণ জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে গঙ্গার জলে লবণাক্ততা বাড়লে পরিশোধিত পানীয় জলের সরবরাহও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।
বঙ্গোপসাগরের কাছাকাছি হওয়ায় এবং সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অরণ্যের সুরক্ষা বলয় ক্রমশ হ্রাস পেতে থাকায় কলকাতার ওপর ঘূর্ণিঝড়ের প্রকোপ অতীতের যে কোনও সময়ের তুলনায় বহুগুণ বেড়েছে। আমফানের মতো ঘুর্নিঝড় আগামী দিনে আরও প্রলয়ঙ্করী রূপ নিয়ে শহরের উপর যখন তখন আছড়ে পড়তে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা। পাশাপাশি, শহুরে উষ্ণায়ন প্রভাবের কারণে শহরের ভেতরের তাপমাত্রা পার্শ্ববর্তী এলাকার তুলনায় অনেকটাই বেশি থাকছে। গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের জেরে এই চরম তাপপ্রবাহ বা ‘হিটওয়েভ’ শহরের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ও অর্থনীতিকে কার্যত স্তব্ধ করে দিতে পারে।
শিয়রে সমন, তাই নিজেকে রক্ষা করার প্রস্তুতি কলকাতাকে শুরু করতে হবে আজ থেকেই। নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিক, সবাইকে এই ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে হবে:
কংক্রিটের জঙ্গলে পরিণত হওয়া এই শহরে নতুন করে প্রচুর গাছ লাগাতে হবে। যে কোনও মূল্যে শহরে যেটুকু জলাশয় এখনও টিকে আছে, সেগুলো ভরাট হওয়া থেকে আটকাতে হবে।
শহরের প্রতিটি বহুতল ও বাড়িতে বৃষ্টির জল সংরক্ষণের ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা দরকার। ভূগর্ভস্থ জলের যথেচ্ছ উত্তোলন এখনই বন্ধ করতে হবে।
ব্যক্তিগত গাড়ির বদলে গণপরিবহন, বিশেষত ইলেকট্রিক যানবাহনের ব্যবহার বাড়াতে হবে। নির্মাণকাজ ও শিল্পকারখানার দূষণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে।
শহরের নিকাশি ব্যবস্থা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে আরও আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত করতে হবে, যাতে প্লাস্টিক বা অন্যান্য বর্জ্য পরিবেশের ক্ষতি না করে এবং জল জমার সমস্যা দূর হয়।
সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। আগামী প্রজন্মকে বাসযোগ্য কলকাতা উপহার দিতে হলে আজ থেকেই সচেতন হওয়া প্রয়োজন। সক্রিয় তবে প্রশাসনকে, সদিচ্ছা দেখাতে হবে নাগরিকদের। মনে রাখতে হবে, প্রকৃতিকে তার প্রাপ্য সম্মান না দিলে আগামী ৫০ বছরে কলকাতার অস্তিত্ব কেবল একটি দূষিত, জলকষ্টে ভোগা শহরের রূপ নেবে। কল্লোলিনী কলকাতা হয়ে উঠবে মৃত্যু নগরী!
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অভিজ্ঞ, সংবেদনশীল, অনুসন্ধিৎসু এবং সমকালীন ও আগামী সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কর্মঠ কিছু তরুণ-তরুণী নিয়ে দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক। ভারতীয় বাঙালি সংস্কৃতির পথ ধরে গ্লোবাল লেন্স দিয়ে দুনিয়াকে দেখে সকলের সামনে পরিবেশন করাই তাঁদের লক্ষ্য। মিলেনিয়াল-জেনX-এর অভিজ্ঞতা ও জেনZ-র উৎসাহর যথাযথ রসায়নে গঠিত 'দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক'।
