

প্রতীকী ছবি - AI
১২ই আগস্ট, ২০২৬
কলকাতার বুক চিরে বয়ে চলা গঙ্গা কেবলই এক জলপথ নয়; এটি সহস্রাব্দ বছরেরও বেশি পুরোনো এক শহরের জন্ম, উত্থান এবং বিবর্তনের নীরব সাক্ষী। আমাদের কল্লোলিনী কলকাতা। সেই গঙ্গার পার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা ঘাটগুলো যেন এক একটি টাইম মেশিন। প্রতিদিনের ব্যস্ততায় হাজার হাজার মানুষের যাতায়াত, স্নান বা আড্ডার আড়ালে এই ঘাটগুলোর প্রতিটি ইটে লুকিয়ে আছে কলকাতার শাসন, শোষণ, দেশীয় আভিজাত্য এবং ক্ষমতার অদ্ভুত সব সমীকরণ।
আজ আমরা ফিরে দেখব গঙ্গার এমন দুটি প্রাচীন ঘাটের ইতিহাস, যার পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে বিস্ময়। একটি ঘাট, যা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রবেশদ্বার হওয়া সত্ত্বেও পরিচিত এক সামান্য মুদি দোকানির নামে। স্বয়ং ব্রিটিশরা সেই নামে সরকারি শিলমোহর লাগিয়েছিল। আর অন্যটি, এক বিধবা বাঙালি নারীর অদম্য প্রেম ও প্রতাপের প্রতীক, যা মাথা নত করিয়েছিল স্বয়ং ব্রিটিশ শাসককে।
আপনি যদি অষ্টাদশ বা ঊনবিংশ শতাব্দীতে একজন ব্রিটিশ লর্ড, সেনাপতি বা উচ্চপদস্থ আমলা হিসেবে সাত সমুদ্র পেরিয়ে এসে পৌঁছতেন, তবে ভারতে আপনার প্রথম পদার্পণ ঘটত কলকাতার চাঁদপাল ঘাটে। কারণ ব্রিটিশ অভিজাত ও হর্তাকর্তারা সেই সময় এই ঘাট দিয়েই ভারতবর্ষের ভূখণ্ডে ঢুকত। মুম্বাইতে 'গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়া' তৈরি হওয়ার অনেক আগে, ব্রিটিশ ভারতের অঘোষিত 'প্রবেশদ্বার' ছিল কলকাতার এই ঘাটটি।
১৭৭০-এর দশকের শুরুর দিক। গঙ্গার ধারে, যেখানে আজ চাঁদপাল ঘাট দাঁড়িয়ে, সেখানে ছিল চন্দন পাল (মতান্তরে চাঁদ পাল) নামের এক সাধারণ মুদি দোকানির ছোট্ট একটি দোকান। সে যুগে গঙ্গার বুক দিয়ে বয়ে চলা জাহাজের নাবিক, ঘাটের মাঝি এবং স্থানীয় মানুষজন তাঁর দোকান থেকেই নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, খাবার ও পানীয় কিনতেন। মানুষজন জায়গাটিকে চিনত 'চাঁদপালের ঘাট' হিসেবেই। ১৭৭৪ সাল নাগাদ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এখানে একটি স্থায়ী ও পাকা ঘাট নির্মাণ করে। তখন তারা স্থানীয়দের মুখে মুখে ঘোরা চাঁদপাল ঘাট নামটাই সরকারিভাবে বেছে নেয়।
এই ঘাটের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কলকাতার ইতিহাসের বেশ কিছু যুগান্তকারী মুহূর্ত। ১৭৭৪ সালে সুপ্রিম কোর্টের প্রথম প্রধান বিচারপতি স্যার এলিজা ইম্পে তাঁর সহকর্মীদের নিয়ে এই ঘাটেই প্রথম জাহাজ থেকে নেমেছিলেন। কথিত আছে, ঘাটে নেমে খালি পায়ে থাকা অসংখ্য স্থানীয় মানুষকে দেখে ইম্পে তাঁর সঙ্গীদের বলেছিলেন, "দেখো, এরা সবাই খালি পায়ে আছে! এদেশে জুতো বিক্রি করলে আমরা রাতারাতি বড়লোক হয়ে যাব।"
১৭৮৬ সালে লর্ড কর্নওয়ালিসও এই ঘাটে নেমেই ভারতের মাটিতে পা রেখেছিলেন। ব্রিটিশ ভাইসরয়দের জমকালো অভ্যর্থনা, তোপধ্বনি এবং রাজকীয় আড়ম্বরের মূল কেন্দ্র ছিল এই চাঁদপাল ঘাট। ইতিহাসের কী অদ্ভুত পরিহাস! যে ব্রিটিশরা গোটা ভারত শাসন করেছে, তাদের সর্বোচ্চ শাসকদের পদার্পণের প্রধান ঠিকানাটি চিরকালের জন্য রয়ে গেল এক অতি সাধারণ বাঙালি মুদি দোকানির নামে।
স্ট্র্যান্ড রোড ধরে হাঁটলে আজও যে ঘাটটি তার সুবিশাল গ্রিক 'ডোরিক' স্থাপত্যশৈলীর থামগুলো নিয়ে সগর্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, সেটি হল বাবু ঘাট। বাবু ঘাটের নাম শুধু কলকাতার মানুষ নয়, গোটা বাংলার নাগরিকরাই জানেন। যদিও এর আসল নাম 'বাবু রাজচন্দ্র ঘাট'।
চাঁদপাল ঘাট যদি হয় সাধারণের মাঝে অসাধারণ হয়ে ওঠার গল্প, তবে বাবু ঘাট হল দেশীয় আভিজাত্য এবং এক নারীর অদম্য ভালোবাসার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
১৮৩০ সাল। কলকাতার তৎকালীন অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব বাবু রাজচন্দ্র দাসের আকস্মিক প্রয়াণে শোকস্তব্ধ হয়ে পড়েন তাঁর স্ত্রী, রানি রাসমণি। স্বামীর স্মৃতিকে চিরস্থায়ী করতে তিনি গঙ্গার তীরে একটি সুদৃশ্য ঘাট নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন। সে যুগে গঙ্গার ধারে এমন গ্রিক স্থাপত্যের ছোঁয়া থাকা ঘাট খুব কমই ছিল। বিশাল থাম, প্রশস্ত সিঁড়ি এবং স্নানার্থীদের জন্য সুসজ্জিত আচ্ছাদনের ব্যবস্থা- সব মিলিয়ে এটি ছিল এক রাজকীয় নির্মাণ।
বাবু ঘাটের সবচেয়ে অনন্য ইতিহাসটি এর নির্মাণের চেয়েও এর উদ্বোধনের সঙ্গে বেশি জড়িয়ে আছে। উনিশ শতকের গোড়ার দিকে, এক পরাধীন দেশে, একজন বাঙালি বিধবা নারীর পক্ষে নিজের স্বামীর নামে এত বড় একটি জনকল্যাণমূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন করাই ছিল বিশাল চ্যালেঞ্জের। কিন্তু রানি রাসমণির প্রভাব ও প্রতিপত্তি এতোটাই ছিল যে, তিনি শুধু এই ঘাট নির্মাণই করলেন না, এর উদ্বোধনের জন্য রাজি করালেন স্বয়ং ব্রিটিশ ভারতের তৎকালীন গভর্নর-জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ককে।
তৎকালীন বর্ণবাদী ও পুরুষতান্ত্রিক ঔপনিবেশিক কাঠামোর মধ্যে দাঁড়িয়ে, একজন দেশীয় নারীর আমন্ত্রণে ব্রিটিশ ভারতের সর্বোচ্চ শাসকের এই ঘাট উদ্বোধন করতে আসা কোনও সাধারণ ঘটনা ছিল না। এটি ছিল রানি রাসমণির অসামান্য কূটনৈতিক দক্ষতা এবং ব্রিটিশদের ওপর তাঁর অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবের এক উজ্জ্বল নিদর্শন।
কলকাতার গঙ্গার ঘাটগুলো কেবল ইট-পাথরের কাঠামো নয়, এগুলো শহরের জীবন্ত আর্কাইভ। ডিজিটাল যুগে দাঁড়িয়ে, গঙ্গার পাড়ের এই প্রাচীন হাওয়া আজও যেন সেই বিস্মৃত আখ্যানগুলোই ফিসফিস করে বলে যায়।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
