

প্রতীকী ছবি - AI
১১ই আগস্ট, ২০২৬
গোটা বিশ্ব আজ পরিবহন ব্যবস্থার এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সাক্ষী হচ্ছে। জীবাশ্ম জ্বালানি-চালিত গাড়ির জায়গা দ্রুত দখল করছে ইলেকট্রিক ভেহিকেল (EV), আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স-চালিত স্মার্ট মোবিলিটি এবং স্বয়ংক্রিয় যানবাহন। উন্নত বিশ্ব ব্যক্তিগত গাড়ির মালিকানার চেয়ে রাইড-শেয়ারিং এবং উন্নত গণপরিবহনের দিকে ঝুঁকছে। সেখানে কলকাতার মতো প্রাচীন এবং অপরিকল্পিতভাবে বেড়ে ওঠা শহরের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন ওঠা খুবই স্বাভাবিক।
কলকাতার মূল সমস্যা কাঠামোগত। বিশ্বের অন্যান্য মেট্রোপলিটন শহরে যেখানে গাড়ির তুলনায় রাস্তার অনুপাত ১৫ থেকে ২০ শতাংশের কাছাকাছি, সেখানে কলকাতায় এই অনুপাত মাত্র ৬ শতাংশের সামান্য বেশি। শহর জুড়ে এত উড়ালপুল তৈরি করেও এই অনুপাতে উন্নতি ঘটানো সম্ভব হয়নি। ফলে বোঝাই যাচ্ছে বিপুল পরিমাণ গাড়ির চাপের বিপরীতে রাস্তার এই নিদারুণ অভাব কলকাতার জন্য এক ভয়াবহ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে বিশ্বের পরিবহন ক্ষেত্রের চলমান বিপ্লব কলকাতার রাস্তায় কীভাবে প্রভাব ফেলবে এবং এর মোকাবিলায় আমাদের কী কী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি, তা নিয়ে একটু আলোকপাত করা যাক।
বিশ্বজুড়ে পরিবহনের যে প্রযুক্তিগত রূপান্তর চলছে তা দেরিতে হলেও সরাসরি কলকাতার রাস্তায় এসে পড়তে বাধ্য। আর সেক্ষেত্রে অবস্থাটা যদি এখনকার মতোই থেকে যায় তবে অত্যন্ত বিশৃঙ্খল এক পরিস্থিতির সাক্ষী থাকবে শহরবাসী।
ইভি-র আধিক্য বনাম যানজট: পেট্রল বা ডিজেল চালিত গাড়ির বদলে তখন রাস্তায় অনেক বেশি পরিমাণে দেখা যাবে নিঃশব্দে চলাচল করা ব্যাটারি চালিত গাড়ি। এর ফলে বায়ুদূষণ এবং শব্দদূষণ হয়তো কমবে, কিন্তু ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা যদি নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে যানজট সমস্যার কোনও সুরাহা হবে না। আমরা স্রেফ 'দূষণমুক্ত যানজট'-এর শিকার হব। উল্টে জীবাশ্ম জ্বালানি চালিত গাড়ি এবং গ্রিন এনার্জিতে চলা গাড়ি উভয়ই যদি একসঙ্গে রাস্তায় থাকে, তবে ভারসাম্যে ব্যাঘাত ঘটার সমূহ সম্ভাবনা থেকে যাবে।
চার্জিং পরিকাঠামোর অভাব: নতুন প্রযুক্তির যানবাহনে রাস্তা ছেয়ে যাওয়াটা কালের নিয়মেই হতে বাধ্য। আর ব্যাটারি চালিত গাড়ি ভালোভাবে চলার জন্য প্রয়োজন যত্রতত্র চার্জিং স্টেশন, ঠিক এখন যেমন বিভিন্ন স্থানে পেট্রল পাম্পগুলো আছে। কিন্তু কলকাতার ঘিঞ্জি রাস্তা এবং ফুটপাথের বর্তমান অবস্থায় এই ধরনের চার্জিং স্টেশনের পরিকাঠামো তৈরি করা অত্যন্ত কঠিন কাজ। কিন্তু এর বিকল্প বন্দোবস্ত না করলে আগামী দিনে বেকায়দায় পড়তে হবেই।
অ্যাপ-ক্যাব ও ডেলিভারি যানের ভিড়: ই-কমার্স এবং গিগ অর্থনীতির প্রসারের ফলে রাস্তায় দু-চাকা এবং ছোট মালবাহী গাড়ির সংখ্যা মারাত্মকভাবে বাড়ছে, যা সরু রাস্তাগুলিতে চলাচলের গতি আরও কমিয়ে দিচ্ছে। এই নিয়ে শুধু সুসংগত নীতি আনলেই হবে না, এই সমস্ত মানুষের জীবিকার ক্ষতি না করেই বিকল্প কী পথ খুঁজে বার করা যায় সেটাও বার করতে হবে।
যানবাহন ও রাস্তার এই অত্যন্ত খারাপ অনুপাতের কথা মাথায় রেখে কলকাতাকে যদি ভবিষ্যতের স্মার্ট মোবিলিটির সঙ্গে তাল মেলাতে হয়, তবে কিছু কঠোর এবং সুদূরপ্রসারী নীতি অবিলম্বে গ্রহণ করতে হবে:
গণপরিবহনের আধুনিকীকরণ ও একত্রীকরণ: শুধুমাত্র রাস্তা চওড়া করে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। কলকাতার সবচেয়ে বড় সুবিধা হল এর বৈচিত্র্যময় গণপরিবহন (মেট্রো, বাস, ট্রাম, লোকাল ট্রেন এবং ফেরি)। একটি মাত্র স্মার্ট কার্ড বা অ্যাপের মাধ্যমে এই সবকটি মাধ্যমকে সংযুক্ত করতে হবে। যাত্রীরা যেন সহজে এক মাধ্যম থেকে অন্য মাধ্যমে যাতায়াত করতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে হবে।
মাইক্রো-মোবিলিটি এবং লাস্ট-মাইল কানেক্টিভিটি: মেট্রো স্টেশন বা বাস স্টপ থেকে গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য ছোট ইলেকট্রিক যান, ই-সাইকেল বা উন্নত মানের টোটো-র জন্য রাস্তায় নির্দিষ্ট জোন তৈরি করতে হবে। বড় গাড়ির প্রবেশ মূল রাস্তাগুলিতে সীমাবদ্ধ রেখে পাড়ার ভিতরের রাস্তাগুলিতে এই মাইক্রো-মোবিলিটিকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। এই ব্যবস্থা চালু করতে না পারলে যানজটের সমস্যা আরও মারাত্মক আকার ধারণ করবে।
স্মার্ট ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট: আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) এবং ইন্টারনেট অফ থিংস (IoT) ব্যবহার করে শহরের ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ও ডায়নামিক করতে হবে। রাস্তার গাড়ির চাপের উপর ভিত্তি করে সিগন্যালগুলি যদি রিয়েল-টাইমে পরিচালিত হয়, তবে যানজট অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে।
কনজেশন চার্জ এবং পার্কিং নীতি: লন্ডন বা সিঙ্গাপুরের মতো কলকাতার ব্যস্ততম এলাকাগুলিতে ব্যক্তিগত গাড়ি প্রবেশের উপর 'কনজেশন ট্যাক্স' বা যানজট কর বসানোর মতো বিকল্প পন্থার কথা ভাবতে হবে। এর পাশাপাশি প্রয়োজনে রাস্তায় গাড়ি পার্কিংয়ের ফি বহুগুণ বাড়িয়ে মাল্টি-লেভেল পার্কিং প্লাজা তৈরি করতে হবে। এবং ইতিমধ্যেই যে মাল্টি-লেভেল পার্কিংগুলো আছে সেগুলোকে কাজে লাগাতে হবে, ফেলে রাখলে চলবে না।
পথচারী-বান্ধব ফুটপাথ: পরিবহন ব্যবস্থার একটি বড় অংশ হল হাঁটা। কলকাতার ফুটপাথগুলিকে জবরদখল মুক্ত করে পথচারীদের হাঁটার উপযুক্ত করে তুললে ছোট দূরত্বের জন্য মানুষের গাড়ির উপর নির্ভরতা কমবে। এতে গণপরিববনের উপর চাপও কমবে, রাস্তায় যানজটও কমবে।
আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে কলকাতা যদি নিজেকে মানিয়ে নিতে ব্যর্থ হয়, তবে শহরের অর্থনীতি ও জনজীবনের উপর তার মারাত্মক প্রভাব পড়বে:
স্থবির অর্থনীতি ও উৎপাদনশীলতা হ্রাস: যানজটে প্রতিদিন মানুষের হাজার হাজার কর্মঘণ্টা নষ্ট হবে। পণ্য পরিবহন ধীর হয়ে গেলে শহরের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধাক্কা খাবে। ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য কলকাতা ক্রমশ তার আকর্ষণ হারাবে।
যানজটের চূড়ান্ত রূপ: অপরিকল্পিতভাবে গাড়ির সংখ্যা বাড়তে থাকলে এবং বিকল্প ব্যবস্থা না থাকলে শহরের রাস্তাগুলি আক্ষরিক অর্থেই স্থবির হয়ে পড়বে। অ্যাম্বুলেন্স বা দমকলের মতো জরুরি পরিষেবার গাড়িগুলোর যাতায়াত কার্যত অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে, যা শহরের বাসিন্দাদের প্রাণহানির কারণ হতে পারে।
বৈষম্যমূলক পরিবহন ব্যবস্থা: প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ফায়দা তখন কেবল সমাজের একটি নির্দিষ্ট বিত্তবান শ্রেণির কাছেই পৌঁছাবে। এদিকে সাধারণ মানুষের গণপরিবহন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার মাধ্যমে সামাজিক বৈষম্য বৃদ্ধি পাবে।
অনিয়ন্ত্রিত ই-বর্জ্য: ইভি-র ব্যবহার বাড়ার পর বাতিল ব্যাটারি বা আনুষঙ্গিক বর্জ্য ফেলার সঠিক পরিকাঠামো না থাকলে এক নতুন ধরনের পরিবেশগত বিপর্যয়ের মুখে পড়বে শহর।
কলকাতার এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। শহরের সীমিত রাস্তার পরিসরে আধুনিক প্রযুক্তির গাড়ির বন্যা একাধারে যেমন চ্যালেঞ্জ, তেমনই নতুন করে নগর পরিকল্পনার এক সুযোগও বটে। এখন কল্লোলিনী কলকাতাকেই ঠিক করতে হবে, সে কোন পথটা বেছে নেবে।
হতাশ হওয়ার কিছু নেই। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কঠোর নীতি নির্ধারণ এবং বিশেষজ্ঞদের বিজ্ঞানসম্মত পরিকল্পনার মাধ্যমে কলকাতাকে আগামীর পরিবহন বিপ্লবের জন্য দিব্যি প্রস্তুত করা সম্ভব। আর তা যদি না হয়, সেক্ষেত্রে ঐতিহাসিক শহরটি তার নিজের যানবাহনের ভারেই একসময় মুখ থুবড়ে ইতিহাসের অস্তাচলে নিজের নাম লিখিয়ে ফেলবে!
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অভিজ্ঞ, সংবেদনশীল, অনুসন্ধিৎসু এবং সমকালীন ও আগামী সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কর্মঠ কিছু তরুণ-তরুণী নিয়ে দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক। ভারতীয় বাঙালি সংস্কৃতির পথ ধরে গ্লোবাল লেন্স দিয়ে দুনিয়াকে দেখে সকলের সামনে পরিবেশন করাই তাঁদের লক্ষ্য। মিলেনিয়াল-জেনX-এর অভিজ্ঞতা ও জেনZ-র উৎসাহর যথাযথ রসায়নে গঠিত 'দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক'।
