

প্রতীকী ছবি - AI
২০শে আগস্ট, ২০২৬
বেশ কিছুটা পিছিয়ে যান। শীতের মরসুম। কুয়াশা ঘেরা হুগলি নদীর বুকে সারি সারি নোঙর করে আছে বিশালাকার সব সামুদ্রিক বাণিজ্যতরী। আরব, পারস্য থেকে আসা বণিকেরা নদীর তীরেই বাঁশ আর হোগলা পাতা দিয়ে রাতারাতি কোনরকমে গড়ে তুলছেন অস্থায়ী আস্তানা। চারদিকে নানা ভাষাভাষী মানুষের কোলাহল, মশলা আর রেশমের গন্ধ মিশে যাচ্ছে, আর চলছে দিনরাত এক করে বেচাকেনা। কয়েক মাস পর ঋতু পরিবর্তন হতেই নোঙর উঠল। ভিনদেশি জাহাজগুলো পাড়ি দিল সমুদ্রের দিকে। এদিকে নদীর তীরের সেই গমগমে বাজার, তার কী হল? সেও চোখের পলকে উধাও! পড়ে থাকল শুধু ছাই আর কিছু বাঁশের কাঠামো।
বিশ্বাস করতে কষ্ট হলেও, আধুনিক কলকাতার জন্মের বহু আগে, পঞ্চদশ শতকের হাওড়ার শিবপুর সংলগ্ন বেতড় অঞ্চলটি ঠিক এমনই জাদুকরি রূপ নিত। সেযুগের এই 'ভাসমান' বা 'পপ-আপ' আন্তর্জাতিক বাজারই ছিল আজকের এই বিশাল কলকাতা বন্দর এবং মহানগরী গড়ে ওঠার প্রথম সলতে পাকানো। অবশ্য গোটাটাই পরিস্থিতির বাধ্যবাধকতায় ঘটেছিল।
এখন খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসবে, কীভাবে জন্ম নিল এই বিস্ময়কর বন্দর? কেনই বা তা আবার হারিয়ে গেল?
পঞ্চদশ শতকে বাংলার বাণিজ্যের মূল ভরকেন্দ্র ছিল আজকের হুগলি জেলার সপ্তগ্রাম। সরস্বতী নদীর তীরে অবস্থিত এই জনপদ সেই সময়ে বিখ্যাত বন্দর হয়ে ওঠে। এখানে রোম, আরব, পারস্য থেকে শুরু করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্য চলত। কিন্তু পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি থেকে সরস্বতী নদীর নাব্যতা কমতে শুরু করে। এই নদীপথ বুজে আসায় গভীর জলের বড় বড় সামুদ্রিক জাহাজগুলো আর সপ্তগ্রাম পর্যন্ত ঢুকতে পারত না।
এতে মহাবিপদে পড়েন দেশি-বিদেশি সওদাগরেরা। ঠিক সেই সময়ই বিকল্প হিসেবে উঠে আসে সরস্বতী ও ভাগীরথীর সঙ্গমস্থলের ঠিক দক্ষিণে অবস্থিত প্রাচীন জনপদ বেতড়। যা আজ হাওড়ার শিবপুর। গভীর জলের সুবিধাযুক্ত এই বেতড় হয়ে উঠল সপ্তগ্রামের ‘স্যাটেলাইট পোর্ট’ বা বিকল্প নোঙরখানা।
বেতড়ের সবচেয়ে অনন্য দিকটি ছিল এর অস্থায়ী চরিত্র। আজকের দিনে যাকে আমরা 'পপ-আপ মার্কেট' বলি, পঞ্চদশ শতকে বেতড় ছিল ঠিক তাই!
সপ্তগ্রামে যাওয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বড় জাহাজগুলো বেতড়ের কাছে নদীর গভীর জলে নোঙর করত। আর সপ্তগ্রাম থেকে ছোট ছোট দেশি ছিপ নৌকো বা পানসিতে করে মালপত্র বেতড়ে আনা হতো। ভিনদেশি বণিকরা এই বেতড়ে এসে পৌঁছনোর পর নদীর তীর ঘেঁষে রাতারাতি গড়ে তুলত খড়ের চাল আর বাঁশের কঞ্চির অস্থায়ী ঘর, গুদাম, এমনকী পানশালাও! এভাবেই কয়েক মাস ধরে চলত অবাধ বাণিজ্য। মশলা, রেশম, সুতির কাপড়, সোনা-রুপোর আদানপ্রদানে সরগরম থাকত এলাকা। তারপর ঋতু বদলালে জাহাজ আবার সমুদ্রের দিকে পাড়ি দিত। যাওয়ার আগে ব্যবসায়ীরা নিজেদের হাতেই সেই অস্থায়ী ঘরগুলোতে আগুন লাগিয়ে দিত। এর কারণ, পরের বছর যখন তারা আবার আসবে, প্রকৃতির নিয়মে নদীর পাড় বদলে যেতে পারে। তাই স্থায়ী নির্মাণের কোনও প্রয়োজনই তাদের হত না।
তৎকালীন সুলতানি আমলে বাংলার রাজনৈতিক ক্ষমতা ছিল গৌড়-কেন্দ্রিক। কিন্তু এভাবেই অর্থনৈতিক ভরকেন্দ্র ধীরে ধীরে দক্ষিণবঙ্গের এই বেতড়-সুতানুটি অঞ্চলের দিকে সরে আসতে থাকে।
এই ভাসমান বাজার বা পপ-আপ মার্কেট কেবল অর্থনীতি নয়, সংস্কৃতিরও এক অদ্ভুত মিলনক্ষেত্র তৈরি করেছিল। বেতড়েই প্রথম বাংলার সাধারণ জেলে, মাঝি, এবং তাঁতিদের সাথে পরিচয় ঘটেছিল সুদূর আরব বা পারস্যের বণিকদের। ভাষাগত বাধা সত্ত্বেও গড়ে উঠেছিল এক অলিখিত বাণিজ্যিক বোঝাপড়া। ১৪৯৫ সালে রচিত বিপ্রদাস পিপলাইয়ের ‘মনসামঙ্গল’ কাব্যেও এর সুস্পষ্ট প্রমাণ আছে। চাঁদ সদাগর তাঁর বাণিজ্যতরী ‘মধুকর’ নিয়ে সপ্তগ্রাম থেকে বেরিয়ে এই বেতড়ে এসে নোঙর করেছিলেন এবং এখানকার মন্দিরে পুজো দিয়েছিলেন বলে মনসামঙ্গলে উল্লেখ আছে।
একসময় সরস্বতী নদী পুরোপুরি শুকিয়ে যায়। ষোড়শ শতকে পর্তুগিজরা যখন বাংলায় আসে, তারাও এই বেতড়েই তাদের প্রথম ঘাঁটি গেড়েছিল এবং এখান থেকেই সপ্তগ্রামের নিয়ন্ত্রণ রাখত। ভেনিসের পর্যটক সিজার ফ্রেডরিক ১৫৭৮ সালে বেতড়ে এসে এই অস্থায়ী বাজারের যে চমকপ্রদ বর্ণনা দিয়েছিলেন, তা পঞ্চদশ শতকের সেই ধারাবাহিকতারই চূড়ান্ত রূপ।
জব চার্নক যখন বাণিজ্য কুঠি তৈরির জায়গা খুঁজছিলেন, তখন বেতড়ের ঠিক উল্টোদিকের সুতানুটি-কলিকাতা অঞ্চলটিকে পছন্দ হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল এই গভীর জলপথ। এখানেই হুগলি নদীর এই অংশেই ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক বন্দর গড়ে তোলার সম্ভাবনা লুকিয়ে ছিল।
আজকের যে হাওড়া-কলকাতা এক বিশাল শিল্প ও বাণিজ্যিক হাব, খিদিরপুর ডকে আজও যেখানে দেশ-বিদেশের জাহাজ ভেড়ে, তার বীজ পোঁতা হয়েছিল আজ থেকে প্রায় ছ’শো বছর আগে বেতড়ের সেই খড়-বাঁশের অস্থায়ী জাদুকরি বাজারে। বেতড় আজ আর বন্দর নেই, কিন্তু তিলোত্তমার ধমনিতে আজও বয়ে চলেছে বেতড়ের সেই আদিম বাণিজ্যিক স্পন্দন।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
