১২ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
সৈন্যদের ফেলে যাওয়া এই আবাসন‌ই আজ কলকাতার সিগনেচার

বো ব্যারাক। ছবি - AI

সৈন্যদের ফেলে যাওয়া এই আবাসন‌ই আজ কলকাতার সিগনেচার

calender icon 2 ১৪ই আগস্ট, ২০২৬

মূল বিষয়

বউবাজারের ব্যস্ত রাস্তা, যানবাহনের হর্ন আর ঘিঞ্জি লোকালয়ের ভিড় ঠেলে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ের পেছনের গলিটায় ঢুকলেই দৃশ্যপট হঠাৎই বদলে যায়। কংক্রিটের জঙ্গল আর আধুনিকতার কোলাহল হঠাৎ‌ই যেন থমকে দাঁড়ায় লাল ইটের সারিবদ্ধ তিনতলা বাড়িগুলোর সামনে। সবুজ খড়খড়ি দেওয়া জানালা, সরু ব্যালকনি, আর ইটের গায়ে জমে থাকা শ্যাওলা- সব মিলিয়ে এ যেন এক জীবন্ত মিউজিয়াম। কলকাতার বো ব্যারাক (Bow Barracks)।

এ শুধু কয়েকটি ইটের গাঁথনি নয়, এটা কলকাতার বুকে টিকে থাকা এক সাংস্কৃতিক তীর্থক্ষেত্র, যেখানে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সম্প্রদায়ের উত্থান, পতন, নস্টালজিয়া এবং টিকে থাকার নিরন্তর লড়াই প্রতিটা ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে মিশে আছে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং একটি গ্যারিসনের জন্ম কাহিনী

কলকাতার বো ব্যারাকের গল্পটা শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৯১৮) ডামাডোলের মধ্যে। ভারতে অবস্থানরত ব্রিটিশ এবং মিত্রবাহিনীর সৈন্যদের থাকার জন্য তড়িঘড়ি করে তৈরি করা হয়েছিল এই লাল ইটের বাড়িগুলো। অবশ্য এগুলোকে বাড়ি বললে একটু বাড়াবাড়ি হবে। বরং এর ধাঁচার সঙ্গে অনেক বেশি ফ্ল্যাট বাড়ির সাদৃশ্য আছে। উপর থেকে দেখলে এই বাড়িগুলোর বিন্যাস অনেকটা ধনুকের (Bow) মতো অর্ধবৃত্তাকার বা 'U' আকৃতির। এই স্থাপত্যগত বৈশিষ্ট্যের কারণেই লোকমুখে এর নাম হয়ে যায় 'বো ব্যারাক'।

তবে এর আসল গল্প শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে। সৈন্যরা যখন দেশে ফিরে যায়, তখন ১৩২টি ছোট ফ্ল্যাট নিয়ে তৈরি এই আবাসন ফাঁকা হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে ব্রিটিশদের তৈরি ক্যালকাটা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (CIT) এই ফ্ল্যাটগুলো মূলত অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সম্প্রদায়ের মানুষদের মাসিক ভাড়ায় বা লিজে বরাদ্দ করে। তখন থেকেই একটি অস্থায়ী সামরিক গ্যারিসন রূপান্তরিত হয় এক স্পন্দিত জনপদে।

চরিত্র ও যাপনচিত্র

বো ব্যারাকের বাসিন্দাদের সামাজিক কাঠামোটি ছিল বেশ চিত্তাকর্ষক। স্বাধীনতার আগে ও পরে এখানকার বাসিন্দাদের পেশা ও জীবনধারা কলকাতার অন্যান্য এলাকার চেয়ে ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।

পেশাগত বৈচিত্র্য: এখানকার পুরুষদের একটি বড় অংশ কাজ করতেন ভারতীয় রেলে বা কাস্টমসে। অন্যদিকে, নারী ও তরুণ প্রজন্মের অনেকেই যুক্ত ছিলেন বিনোদন জগতের সাথে। পার্ক স্ট্রিটের জ্যাজ ক্লাব, ট্রিঙ্কাস বা ব্লু ফক্সের সেই সোনালি যুগে বো ব্যারাকের ক্যাবারে ড্যান্সার এবং জ্যাজ মিউজিশিয়ানদের তুমুল চাহিদা ছিল।

খেলার মাঠের হিরো: খেলাধুলার সাথে বো ব্যারাকের ছিল নাড়ির টান। অলিম্পিকে ভারতের ফিল্ড হকি দলের একসময়ের মেরুদণ্ড ছিলেন এখানকার অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান খেলোয়াড়রাই। বিকেল হলেই গলির মধ্যে ফুটবল বা হকির আসর জমানো ছিল এখানকার তরুণদের দৈনন্দিন রুটিন।

ব্যালকনি কালচার: বো ব্যারাকের সবচেয়ে অনন্য বৈশিষ্ট্য হল এর 'ওপেন-এয়ার সোশ্যালাইজিং'। এখানকার সমাজজীবন চার দেওয়ালের মধ্যে আবদ্ধ নয়। রাস্তা এবং ব্যালকনিই হলো এদের ড্রয়িংরুম। বিকেলে ব্যালকনিতে বসে গিটার বাজিয়ে গান, প্রতিবেশীর সাথে আড্ডা, কিংবা রাস্তার মাঝে চেয়ার পেতে সান্ধ্যকালীন জমায়েত এবং সেই জমায়েতে বাড়িতে তৈরি ওয়াইন পান ছিল বো ব্যারাকের সিগনেচার স্টাইল।

রন্ধনশৈলী: ইউরোপীয় ঘরানায় ভারতীয় মশলার ফিউশন

আরও পড়ুন
কলকাতায় পালকি ধর্মঘট! তাতেই বদলে যায় ইতিহাস
বাঙালি মুদির নামে ব্রিটিশ ভারতের ‘প্রবেশদ্বার’!
৫০ বছরের মধ্যে কলকাতা শেষ! বাঁচতে হলে…

খাদ্যাভ্যাসের দিক থেকে বো ব্যারাকের রান্নাঘরগুলো ছিল কেন এক আশ্চর্য ল্যাবরেটরি। অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান খাবার আসলে কলোনিয়াল রেসিপি এবং দেশীয় মশলার এক নিখুঁত লোকালাইজেশন।

হলুদ ভাত ও বল কারি: শুরুতেই বলে নেওয়া ভালো, হলুদ ভাত মানে কেউ বাসন্তী পোলাওয়ের কথা ভাববেন না। এটি এখানকার সবচেয়ে আইকনিক খাবার। নারকেলের দুধ, হলুদ এবং ভারতীয় মশলা দিয়ে তৈরি ভাতের সাথে মাংসের কিমার বল বা কোফতার এই ফিউশন এক অপূর্ব সৃষ্টি। খেলে জিভে জল আসতে বাধ্য।

ভিন্দালু: পর্তুগিজ 'ভিনিগার ও রসুন' (Vinho de Alho) ভিত্তিক এই পদটিকে নিজেদের মতো করে ঝাল ও মশলাদার করে তুলেছিল এখানকার পরিবারগুলো।

হোমমেড ওয়াইন: বো ব্যারাকের নাম নিলেই আসে তাদের বিখ্যাত ঘরে তৈরি ওয়াইনের কথা। আঙুর, পাম, আদা বা কিশমিশ দিয়ে নিজেদের বিশেষ গোপন রেসিপিতে তৈরি এই ওয়াইন বড়দিনের সময় পুরো কলকাতায় ছড়িয়ে পড়ত। এর চাহিদা একসময় গগনচুম্বী ছিল।

চিনা প্রভাব: ভৌগোলিকভাবে টেরিটি বাজার ও চায়নাটাউনের কাছাকাছি হওয়ায়, এখানকার রোজকার খাবারে ডাম্পলিং, সয়া সস বা বার্মিজ 'নগাপি'-র মতো চিনা খাদ্য সংস্কৃতির উপাদানেরও অনায়াস প্রবেশ ঘটেছিল। এর একটা বড় কারণ চিনা সম্প্রদায়ের সঙ্গে এখানকার মানুষের তালমিল বেশ ভালো জমে উঠেছিল।

বিবর্তন এবং টিকে থাকার লড়াই

স্বাধীনতার পর ১৯৪৭ সাল থেকে বো ব্যারাকের সামাজিক কাঠামোয় একটি বড়সড় পরিবর্তন আসতে শুরু করে। ব্রিটিশরা ভারত ছাড়ার পর এখানকার অ্যাংলো ইন্ডিয়ানরা এক গভীর পরিচয় সঙ্কটে ভুগতে শুরু করেন। অনেকেই নিজেদের ভবিষ্যৎ সুনিশ্চিত করতে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা বা ব্রিটেনে পাড়ি জমান। ফলে ধীরে ধীরে ফাঁকা হতে শুরু করে এখানকার ১৩২ টি আবাসন।

এরপরও যে অ্যাংলো ইন্ডিয়ান পরিবারগুলো এখানে থেকে গিয়েছিল তাঁরা সম্মুখীন হন এক নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতার। স্বাধীনতা পরবর্তী কলকাতায় ক্যাবারে বা জ্যাজ ক্লাবের যুগ শেষ হয়ে আসছিল। পরিবর্তিত সমাজব্যবস্থায় তাঁদের অনেকেই ধীরে ধীরে মূলস্রোতের পেশায়, অর্থাৎ- শিক্ষকতা বা কর্পোরেট চাকরিতে যুক্ত হতে বাধ্য হন। ফলে অতীতের সেই প্রাণোচ্ছলতায় ধীরে ধীরে ভাটা পড়তে শুরু করে।

এই ফাঁকা হয়ে যাওয়া ফ্ল্যাটগুলোতে পরবর্তীতে গুজরাতি, চাইনিজ, তিব্বতি এবং বাঙালি পরিবার বসবাস শুরু করে। আশ্চর্যের বিষয় হল, এই নতুন বাসিন্দারাও ধীরে ধীরে বো ব্যারাকের মূল সংস্কৃতির সাথে নিজেদের আত্মীকরণ করে নিয়েছেন। আজ বড়দিনের সময় যখন বো ব্যারাকের রাস্তায় উৎসব হয়, তখন অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদের পাশাপাশি বাঙালি, গুজরাতি বা চিনারাও সমান উৎসাহে মেতে ওঠেন।

আজকের বো ব্যারাক

বর্তমানে বো ব্যারাকের বাড়িগুলোর জরাজীর্ণ অবস্থা। শহরের রিয়েল এস্টেট প্রোমোটারদের শ্যেন দৃষ্টি বহু বছর ধরেই এই প্রাইম লোকেশনের উপর। কলকাতা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট বেশ কয়েকবার এই আবাসন ভেঙে ফেলার উদ্যোগ নিলেও, বাসিন্দাদের তীব্র প্রতিরোধ এবং হেরিটেজ সংরক্ষণের দাবির মুখে তা থমকে গেছে।

বো ব্যারাক শুধু কয়েকটি পরিবারের বাসস্থান নয়; এটি কলকাতার বহুত্ববাদ এবং কসমোপলিটান ইতিহাসের এক প্রামাণ্য দলিল। এটি এমন এক পাড়া, যা আধুনিকতার আগ্রাসনের মুখে দাঁড়িয়েও সযত্নে আগলে রেখেছে তার শতবর্ষী গিটার, পাম কেকের রেসিপি এবং এক হারানো যুগের আভিজাত্য। এই জায়গা আমাদের মনে পড়িয়ে দেয়- শহর বদলায়, কিন্তু কিছু কিছু ঠিকানার আত্মায় কখনও মরচে ধরে না।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
কৌস্তভ ভৌমিক
কৌস্তভ ভৌমিক

কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য