

আজকের ছাতুবাবুর বাজার। ছবি - Google
২১শে আগস্ট, ২০২৬
তখন কলকাতায় বাবুদের রমরমা। টাকা ওড়ানোর প্রতিযোগিতায় কে কাকে টেক্কা দেবে তা নিয়ে চলত নিত্য রেষারেষি। এর ফলে তৎকালীন কলকাতায় এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে যা আজকের দিনে শুনলে চট করে বিশ্বাস হবে না। মনে হবে রূপকথার কোনও গল্প। এমনই এক জেদ আর অহঙ্কারের ফসল হল উত্তর কলকাতার বিডন স্ট্রিটের বিখ্যাত ‘ছাতুবাবুর বাজার’ (যা পরে ছাতুবাবু-লাটুবাবুর বাজার নামে পরিচিত হয়)।
একটি সাধারণ মাছ কেনাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া অপমানের জ্বালা কীভাবে আস্ত এক বাজার প্রতিষ্ঠার কারণ হয়ে দাঁড়াল, তার নেপথ্যে লুকিয়ে আছে উনিশ শতকের কলকাতার এক বিচিত্র ইতিহাস।
ঘটনাটা এক শীতের সকালের। ছাতুবাবু, অর্থাৎ কলকাতার প্রথম কোটিপতি ব্যবসায়ী রামদুলাল দেবের বড় ছেলে তথা ব্যবসায়ী আশুতোষ দেবের এক পরিচারক (অনেকের মতে বাজার সরকার) বাজারের সেরা মাছটি কেনার জন্য স্থানীয় এক সুপরিচিত বাজারে গিয়েছিলেন। সেটি সম্ভবত শোভাবাজার রাজবাড়ির নিয়ন্ত্রণাধীন কোনও বাজার ছিল।
সেখানে উপস্থিত ছিল অন্য এক বনেদি বাড়ির পরিচারকও। বাজারের সবচেয়ে বড় মাছটা কে নেবে, তা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে তুমুল দরকষাকষি চলে। তর্কাতর্কির এক পর্যায়ে বিপক্ষ দলের লোক বা খোদ বাজার কর্তৃপক্ষের কেউ, ছাতুবাবুর পরিচারককে চরম অপমান করে বলে কথিত আছে। ব্যঙ্গের সুরে বলে, "ছাতুবাবুর যতই টাকা থাক, এই বাজারটা তো আর তোমাদের নয়! অন্যের বাজারে এসে এত দাপট দেখানো সাজে না।"
বাবু'র অপমানের জ্বালায় মাছ না কিনেই মাথা নিচু করে রামদুলাল নিবাসে (অর্থাৎ ছাতুবাবুদের পৈতৃক বাড়িতে) ফিরে আসেন সেই পরিচারক। কর্তার কানে পৌঁছায় সমস্ত ঘটনা।
যে পরিবারের কর্তারা টাকার গরমে মাটিতে পা ফেলেন না, যারা তৎকালীন ১০০ টাকার নোট জ্বালিয়ে চুরুট ধরাত, তাদের বাড়ির লোককে অন্যের বাজারে অপমানিত হতে হবে? অপমানে রীতিমতো ফুঁসে ওঠেন ছাতুবাবু। তৎক্ষণাৎ জেদ ধরে বসলেন, তাঁর বাড়ির লোককে আর কখনও অন্যের বাজারে গিয়ে মাথা নিচু করতে হবে না।
যেমন ভাবনা তেমন কাজ। রাতারাতি বিডন স্ট্রিটে তাঁদের নিজেদের লাল রঙের রাজবাড়ির (রামদুলাল নিবাস) ঠিক উল্টোদিকের বিশাল জমিটি পরিষ্কার করা হয়। সেখানেই গড়ে ওঠে ছাতুবাবুদের নিজস্ব বাজার। সেই বাজারই হল আজকের বিখ্যাত ‘ছাতুবাবুর বাজার’। অপমানের বদলা নিতে আস্ত একটা বাজার তৈরি করে ফেলার এই স্পর্ধা সেকালের কলকাতাকে রীতিমতো চমকে দিয়েছিল।
ছাতুবাবুর এই অহঙ্কারের পেছনে ছিল বিপুল বৈভবের উত্তরাধিকার। তাঁর বাবা রামদুলাল সরকার (দেব) ছিলেন এক রূপকথার নায়ক। তাঁর উত্থান কাহিনী আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যে কোনও তরুণ-তরুণীর মানুষের কাছে অনুপ্রেরণার হতে পারে।
দমদমের এক অনাথ দরিদ্র বালক থেকে কলকাতার প্রথম কোটিপতি হয়ে ওঠার কাহিনীকার হলেন রামদুলাল দেব। সাধারণ মুৎসুদ্দিরা যখন ব্রিটিশদের সাথে ব্যবসায় মগ্ন, রামদুলাল তখন সদ্য স্বাধীন হওয়া আমেরিকার সাথে সরাসরি সামুদ্রিক বাণিজ্য শুরু করেছিলেন। তাবড় মার্কিন ব্যবসায়ীদের কলকাতার এজেন্ট হিসেবে কাজ করতেন তিনি। ব্যবসায় কখনও অসততা করেননি রামদুলাল। সততা আর বুদ্ধির জোরে তিনি এতটাই খ্যাতি লাভ করেছিলেন যে, আমেরিকান ব্যবসায়ীরা নিজেদের একটি বিরাট জাহাজের নাম রেখেছিলেন ‘রামদুলাল’। আমেরিকার প্রথম রাষ্ট্রপতি জর্জ ওয়াশিংটনের প্রমাণ সাইজের একটি তৈলচিত্র ২২ জন মার্কিন ব্যবসায়ী উপহার হিসেবে তাঁর হাতে তুলে দিয়েছিলেন।
পিতার মৃত্যুর পর সেই অগাধ সম্পত্তির মালিক হন দুই ছেলে আশুতোষ দেব (ছাতুবাবু) এবং প্রমথনাথ দেব (লাটুবাবু)। উপচে পড়া সম্পদের গরমে দুই ভাই যে জীবনযাপন করেন, তা কলকাতার ইতিহাসে প্রবাদে পরিণত হয়েছে।
টাকা যে কেবল ভোগ করার জন্য নয়, তা যে ক্ষমতা প্রদর্শনেরও হাতিয়ার, তা এই দুই ভাই বারবার প্রমাণ করেছিলেন। তাঁদের জীবনযাত্রার কিছু নমুনা দেখলে আজও অবাক হতে হয়:
চুরুটে টাকার আগুন: প্রবাদ আছে, টাকার গরমে লাটুবাবু একশো টাকার নোটে আগুন জ্বালিয়ে নিজের চুরুট ধরাতেন।
একবার সাহেবদের এক দোকানে ঝাড়বাতি কিনতে গিয়েছিলেন লাটুবাবু। দাম জিজ্ঞেস করলে এক ইংরেজ কর্মচারী তাঁকে তাচ্ছিল্য করে বলেছিল, এটা কেনা সাধারণ দেশীয়দের কর্ম নয়। জেদের বশে লাটুবাবু সেই দোকানের সমস্ত ঝাড়বাতি কিনে নেন এবং দোকানের সামনের রাস্তায় আছড়ে ভেঙে চুরমার করেন।
ছাতুবাবুর অদ্ভুত শখগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল বুলবুলির লড়াই। প্রচুর অর্থ খরচ করে সেরা জাতের বুলবুল পাখি পুষতেন। তবে সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হল, পাখির জন্মের সময় বিচার করে জ্যোতিষী ডেকে রীতিমতো তাদের ‘জন্মকুষ্ঠি’ তৈরি করাতেন ছাতুবাবু! যুদ্ধে কোন পাখি জিতবে, তা নিয়ে কুষ্ঠি বিচার করে বিস্তর গবেষণাও চলত।
১৮৩৭ সালে তাঁদের মায়ের শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে প্রায় ২ লক্ষ কাঙাল, ব্রাহ্মণ ও সাধারণ মানুষকে খাওয়ানো হয়েছিল। শহর কলকাতা এমন এলাহি আয়োজন এর আগে কখনও দেখেনি। ব্রাহ্মণদের রুপো ও সোনার মুদ্রায় ভরিয়ে দিয়েছিল দুই ভাই।
বিলাসিতা আর জেদের পাশাপাশি ছাতুবাবুর চরিত্রে এক অন্য দিকও ছিল, যা তাঁকে অন্যান্য বাবুদের থেকে আলাদা করে। তিনি নিজে ছিলেন একনিষ্ঠ সঙ্গীত সাধক এবং টপ্পাগান রচয়িতা। তিনি নিজে অসাধারণ সেতার বাদক ছিলেন বলে জানা যায়। তাঁর লেখা গানের শেষে ‘আশুতোষ’ ভণিতা থাকত। তাছাড়া, ১৮৫৭ সালে তাঁর নিজস্ব গৃহ-মঞ্চেই প্রথম বাংলা নাটক “শকুন্তলা” অভিনীত হয়।
কালের নিয়মে কলকাতার বাবু কালচারের সেই জৌলুস আজ আর নেই। রামদুলাল নিবাসের সেই জাঁকজমকও স্বাভাবিকভাবেই ফিকে হয়ে গেছে। কিন্তু উত্তর কলকাতার বুকে আজও দাঁড়িয়ে আছে ছাতুবাবু-লাটুবাবুর বাজার। এটি কেবল নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনাবেচার জায়গা নয়; এটি উনিশ শতকের কলকাতার সেই বিচিত্র অহঙ্কার, জেদ এবং বাবু সংস্কৃতির জলজ্যান্ত স্মৃতিচিহ্ন হয়ে আছে। অবশ্য আজকের ছাতুবাবুর বাজার দেখে সেই অতীতকে অনুমান করা কার্যত অসম্ভব।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
