

টি এম কৃষ্ণা। ছবি - Google
২৯শে আগস্ট, ২০২৬
চেন্নাইয়ের শীতকাল মানেই মার্গাজ়ি মাস (ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে জানুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত)। শহরের অভিজাত 'সভা'-গুলো তখন গমগম করে কর্ণাটকি ধ্রুপদী সঙ্গীতের মূর্ছনায়। দামি কাঞ্জিভরম শাড়ি আর সাবেকি গয়নার ভিড়ে ধ্রুপদী সঙ্গীতের এই জমকালো আসর যেন একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির একচেটিয়া সাংস্কৃতিক আধিপত্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঠিক এরকমই এক আবহে শহরের আরেক প্রান্তে, উরুর ওলকট কুপ্পাম নামের এক জীর্ণ জেলেবস্তিতে বা চলন্ত পাবলিক বাসের ভেতর হঠাৎ করেই যদি বেজে ওঠে কর্ণাটকি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের গভীর গম্ভীর সুর?
আপাত এই অসম্ভবকেই সম্ভব করেছেন একজন। থোদুর মাদাবুসি কৃষ্ণা, যাঁকে সঙ্গীতজগত চেনে টি এম কৃষ্ণা নামে। তিনি কেবল কর্ণাটকি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের এক অবিসংবাদিত দিকপাল নন, বরং সমকালীন ভারতের অন্যতম তীক্ষ্ণ এবং আপসহীন এক প্রতিবাদী স্বর। তাঁর ব্যারিটোন কণ্ঠের জাদুতে যেমন রাগ যমুনাকল্যাণী মূর্ত হয়ে ওঠে, ঠিক তেমনই সেই একই কণ্ঠে দেশের জাতপাত, শ্রেণিভেদ এবং পরিবেশ ধ্বংসের বিরুদ্ধে ধ্বনিত হয় প্রবল হুঙ্কার। শিল্প যে কেবল বিনোদন নয়, বরং ঘুণে ধরা সমাজের ভিত নাড়িয়ে দেওয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে, কৃষ্ণা তাঁর জীবন ও সঙ্গীত দিয়ে সেটাই বারে বারে প্রমাণ করে চলেছেন।
ঐতিহাসিকভাবে কর্ণাটকি সঙ্গীত দেবদাসীদের উত্তরাধিকার থেকে শুরু হয়ে তা পরবর্তীতে ধীরে ধীরে ব্রাহ্মণ এবং উচ্চবর্ণের কুক্ষিগত হয়ে পড়েছিল। গানের বিষয়বস্তুও হয়ে দাঁড়িয়েছিল মূলত হিন্দু দেব-দেবীর আরাধনা বা ভক্তি প্রদর্শন। কিন্তু কৃষ্ণা বিশ্বাস করেন, সঙ্গীত কোনও নির্দিষ্ট ধর্মের, জাতের পৈতৃক সম্পত্তি হতে পারে না।
কর্ণাটকি ধ্রুপদী সঙ্গীত ও নৃত্যের অতি রক্ষণশীল ঘরানা ভাঙতে তিনি এক দুঃসাহসী পদক্ষেপ নেন। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের যে চিরাচরিত কাঠামো বা 'কুতচেরি' গত এক শতাব্দী ধরে সবাই অন্ধের মতো সকলে মেনে এসেছেন, কৃষ্ণা সেই রক্ষণশীলতার নাগপাশ ভেঙে চুরমার করে দিয়েছেন। কনসার্টের শুরুতে গাওয়ার নিয়ম যে 'বর্ণম'-এর, তা তিনিই প্রথম মাঝখানে গাওয়া শুরু করেন। আবার কখনও শেষের দিকের হালকা চালের 'পদম' দিয়ে শুরু করেন অনুষ্ঠান। তিনি সঙ্গীতের নিজস্ব নান্দনিকতা বা 'Art for art's sake' এই মন্ত্রে বিশ্বাস রাখেন।
এই ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই তিনি কর্ণাটকি সঙ্গীতে যিশু খ্রিস্ট এবং আল্লাহকে নিয়ে গান গেয়েছেন। কট্টরপন্থীদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তামিল লেখক পেরুমল মুরুগানের কবিতা কিংবা শ্রী নারায়ণ গুরুর সামাজিক সাম্যের বাণীকে ধ্রুপদী সুরে বাঁধেন। এইসব ঘটনা কর্ণাটকি সঙ্গীতের ইতিহাসে ছিল আক্ষরিক অর্থেই এক ভূমিকম্প।
শিল্পীর কাছে মঞ্চই সব। কিন্তু কৃষ্ণা বুঝলেন, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত প্রেক্ষাগৃহের বদ্ধ দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল সংখ্যক প্রান্তিক মানুষের কাছে এই ধ্রুপদী শিল্পের কোনও আবেদন নেই।
সঙ্গীতকে সমাজের নিচুতলায় নামিয়ে আনতে ২০১৫ সালে পরিবেশকর্মী ও বন্ধুদের সাথে মিলে তিনি শুরু করলেন 'উরুর ওলকট কুপ্পাম উৎসব' (বর্তমানে চেন্নাই কালাই তেরু ভিজা)। চেন্নাইয়ের জেলেদের গ্রাম থেকে শুরু করে বস্তি এলাকায় অনুষ্ঠিত হতে লাগল ধ্রুপদী সঙ্গীতের আসর। যে মানুষগুলো জীবনে কোনোদিন 'সভা'-র চৌকাঠ মাড়াননি, তাঁরা বিনামূল্যে নিজেদের বাড়ির উঠোনে বসে শুনলেন উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত।
রূপান্তরকামী (জোগাপ্পা) শিল্পীদের সাথেও তিনি অনায়াসে মঞ্চ ভাগ করে নিলেন। শিল্পের এই গণতন্ত্রীকরণ ভারতের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত।
একজন সত্যিকারের অ্যাক্টিভিস্টের মতোই কৃষ্ণার প্রতিবাদ কেবল সমাজ-সংস্কারেই থেমে থাকেনি। পরিবেশ রক্ষায় তাঁর সাঙ্গীতিক উদ্যোগ গোটা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল।
২০১৭ সালে পরিবেশকর্মী নিত্যানন্দ জয়রামনের সাথে মিলে তিনি প্রকাশ করলেন 'চেন্নাই পোড়ম্বক পাডাল' নামের একটি মিউজিক ভিডিও। এন্নোর তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কারণে হওয়া ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়কে তিনি তুলে ধরলেন আনন্দভৈরবী, সিন্ধুভৈরবী বা কল্যাণীর মতো ধ্রুপদী রাগে। গানের ভাষায় মিশে থাকল তামিল স্ল্যাং বা লোকজ শব্দ। ইউটিউবে রীতিমতো ট্রেন্ড করল সেই গান। পরবর্তীতে কোদাইকানালে বহুজাতিক কোম্পানি ইউনিলিভারের পারদ দূষণের প্রতিবাদেও তিনি র্যাপ ও গানা শিল্পীদের সাথে যুক্ত হয়ে 'কোদাইকানাল স্টিল ওন্ট' নামে আরও একটি প্রতিবাদী প্রজেক্ট করেন।
এমন ছকভাঙা মানুষকে নিয়ে বিতর্ক হবে না, তা কি হয়! ২০১৬ সালে যখন তাঁকে মর্যাদাপূর্ণ 'র্যামন ম্যাগসেসাই পুরস্কার' প্রদান করা হল, তখন কট্টরপন্থীদের একাংশ গেল-গেল রব তুলেছিল। সংস্কৃতিতে সামাজিক অন্তর্ভুক্তি আনার এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অনেকেই মেনে নিতে পারেননি।
তবে কৃষ্ণা এসবে পরোয়া করেন না। তিনি কর্ণাটকি সঙ্গীতের ভেতরের জাতপাতের রাজনীতির প্রতিবাদে শহরের সবচেয়ে বড় 'মিউজিক সিজন' বয়কট করে বসেছেন অবলীলায়। আবার সাম্প্রতিককালে, ২০২৪ সালে যখন মাদ্রাজ মিউজিক অ্যাকাডেমি তাঁকে সর্বোচ্চ সম্মান 'সঙ্গীত কলানিধি' দেওয়ার কথা ঘোষণা করে, তখন শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বিশুদ্ধতাবাদী মহলে রীতিমতো বিদ্রোহ দেখা দেয়। একাধিক প্রথম সারির শিল্পী কৃষ্ণার ব্রাহ্মণ-বিরোধী ও প্রথাবিরোধী অবস্থানকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে অনুষ্ঠান বয়কট করেন। দক্ষিণপন্থী হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর কাছ থেকে তিনি নিয়মিত খুনের হুমকিও পেয়েছেন।
তবুও তিনি থামেননি। এখানেই টি এম কৃষ্ণা বাকিদের থেকে অনন্য হয়ে ওঠেন।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
