৪ঠা অক্টোবর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
কলকাতার পানপাত্রের বদলে যাওয়া ইতিহাস

কলকাতার পানাহারের বদলে যাওয়া ইতিহাস। ছবি - Google

কলকাতার পানপাত্রের বদলে যাওয়া ইতিহাস

calender icon 2 ১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬

tfa logo icon

সংক্ষিপ্তসার

পাত্র বদলেছে, বদলায়নি আড্ডা: কলকাতার পান সংস্কৃতির বিবর্তন

কলকাতা শুধু সংস্কৃতির শহর নয়, বরং এর মদ্যপানের ইতিহাসও সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের এক অনন্য প্রতিচ্ছবি। ইউরোপীয় বণিকদের আগমন, বাবু কালচারের উত্থান এবং আধুনিক কর্পোরেট যুগের সাথে সাথে কলকাতার পানপাত্রের ধারা বারবার বদলেছে।

মূল বিষয়

কলকাতার পরতে পরতে লুকিয়ে আছে ইতিহাস। এই শহর শুধু সিটি অফ কালচার নয়। বরং আহার ও পানের প্রভূত সমৃদ্ধশালী বিবর্তনেরও সাক্ষী। ইউরোপীয় বণিকদের আসা থেকে শুরু করে ব্রিটিশদের শাসন, আবার বাবুদের উত্থান থেকে আজকের কর্পোরেট যুগ, প্রতিটা পর্যায়ে শহর কলকাতার আর্থসামাজিক কাঠামো বদলেছে। আর সেই বদলের প্রভাব অত্যন্ত গভীরভাবে পড়েছে এখানকার পানপাত্রে।

আদিম ভাট্টি থেকে আজকের অত্যাধুনিক ব্রুয়ারি পর্যন্ত এই যাত্রাপথ আসলে এক বদলাতে থাকা সমাজেরই প্রতিচ্ছবি।

প্রাচীন দেশীয় ভাট্টি

ইউরোপীয়রা আসার বহু শতক আগে থেকেই পানাভ্যাসে অভ্যস্ত কলকাতা। তখন গাঁজন বা ফারমেন্টেশন পদ্ধতিতে মদ তৈরির চল ছিল। ভাত পচিয়ে হাঁড়িয়া তৈরি হত। খেজুর বা তালের রস মজিয়ে বানানো হত তাড়ি। এগুলো তৈরির জন্য কোনও বিশাল কারখানার দরকার পড়ত না। গ্রামের ছোট ছোট ভাট্টি বা মাটির হাঁড়িতে সম্পূর্ণ দেশীয় পদ্ধতিতে এই পানীয়গুলো চোলাই করা হতো। মূলত কৃষকদের মধ্যেই এই পানীয়ের চল ছিল বেশি। কিন্তু আঠারো শতকের গোড়ার দিকে যখন দলে দলে ইউরোপীয় নাবিক ও কোম্পানির সাধারণ সৈনিকরা বাংলায় আসতে শুরু করল, তখন এই প্রাচীন অর্থনীতিতে প্রথম বড় ধাক্কা লাগে।

সস্তার আরক এবং পাঞ্চ হাউসের জন্ম

জাহাজে করে ইংল্যান্ড সহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা দামি ওয়াইন বা বিয়ার কিনে খাওয়ার সামর্থ্য বিভিন্ন দেশের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিগুলোর নিচুতলার কর্মীদের ছিল না। কিন্তু বাংলার প্যাচপ্যাচে গরমে তাদের সস্তা অথচ কড়া নেশার প্রয়োজন ছিল। ঠিক এই প্রেক্ষাপটেই জন্ম নেয় পাঞ্চ।

স্থানীয় বাজার থেকে সস্তায় কেনা আরক, চিনি, লেবুর রস, জল এবং মশলা মিশিয়ে এই নতুন পানীয় তৈরি হত। সংস্কৃত 'পঞ্চ' শব্দ থেকে এর উৎপত্তি বলে অনেক ঐতিহাসিকের মত। এই সস্তার পাঞ্চ বিক্রির জন্যই লালদিঘি এবং গঙ্গার ঘাট সংলগ্ন এলাকায় ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছিল পাঞ্চ হাউস। মদ্যপানের এটিই ছিল কলকাতার প্রথম বাণিজ্যিক রূপ।

বরফের আগমন ও অভিজাত ট্যাভার্নের যুগ

পলাশীর যুদ্ধের পর ব্রিটিশদের হাতে প্রচুর অর্থ ও ক্ষমতা চলে আসে। পকেটে টাকা আসতেই ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উচ্চপদস্থ আধিকারিকরা সস্তার পাঞ্চ হাউস ছেড়ে বিলাসবহুল পান্থশালার দিকে ঝুঁকতে শুরু করেন। এই প্রেক্ষাপটে তৈরি হয় লন্ডন ট্যাভার্ন বা হারমোনিক ট্যাভার্নের মতো আভিজাত্যে মোড়া সব জায়গা। ১৮৩০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এশিয়ার প্রথম আধুনিক হোটেল স্পেন্সার্স।

আরও পড়ুন
পান্থশালা থেকে আজকের রেস্তোরাঁ, বাংলার বিবর্তনের যাত্রাপথ
ওল্ড মঙ্ক কি আদৌ রাম নয়?
অওধের দরবার থেকে পাড়ার মোড়ের লাল শালু- বিরিয়ানির বিবর্তন

কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত বিপ্লবটি ঘটে ১৮৩৩ সালে। বোস্টন থেকে ফ্রেডরিক টিউডরের বরফবাহী জাহাজ তাসকানি এসে পৌঁছায় কলকাতার ঘাটে। এর আগে পর্যন্ত সাহেবদের গরম মদই খেতে হত। বরফ আসার পর কলকাতার মদ্যপানের পুরো সংজ্ঞাই বদলে যায়। হুইস্কি বা ফরাসি ব্র্যান্ডির গ্লাসে বরফের টুকরো হয়ে ওঠে নতুন আভিজাত্যের প্রতীক। সস্তা আরকের যুগ পেছনে ফেলে কলকাতা প্রবেশ করে এক নতুন বিলাসী অধ্যায়ে।

বাবুদের অনুকরণের পর্ব

ব্রিটিশদের এই নতুন আভিজাত্য খুব দ্রুত প্রভাব ফেলে কলকাতার সদ্য ধনী হয়ে ওঠা বাঙালি বাবুদের উপর। নিজেদের সাহেবদের সমকক্ষ প্রমাণ করতে শোভাবাজার রাজবাড়ি বা ছাতুবাবু-লাটুবাবুদের মতো বনেদি পরিবারের আসরে শ্যাম্পেন আর ক্ল্যারেটের বন্যা বইতে শুরু করে। দেশীয় ভাট্টির মদ রাতারাতি ব্রাত্য হয়ে যায়। অন্যদিকে ইয়ং বেঙ্গল গোষ্ঠী এই মদ্যপানকেই সামাজিক প্রতিবাদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিল। হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিওর ছাত্ররা গোলদিঘির মোড়ে প্রকাশ্যে চপ কাটলেট সহযোগে ব্র্যান্ডি পান করে হিন্দু রক্ষণশীলতার মূলে কুঠারাঘাত করেছিলেন। মদ এখানে নিছক নেশার বস্তু থেকে প্রতিবাদের প্রতীকে রূপান্তরিত হয়।

বিয়ারের সমস্যা থেকে আধুনিক কারখানার শুরু

গরমের দেশে সাহেবদের তৃষ্ণা মেটানোর প্রধান পানীয় হল বিয়ার। কিন্তু ইংল্যান্ড থেকে জাহাজে করে বিয়ার আনতে প্রায় ছ'মাস সময় লাগত। বিষুবরেখার গরমে সেই বিয়ার অনেক সময়ই নষ্ট হয়ে যেত। এই সমস্যার সমাধান খুঁজতে ব্রিটিশ ব্রুয়াররা বিয়ারে প্রচুর পরিমাণে হপস এবং অ্যালকোহল মেশাতে শুরু করেন। এভাবেই জন্ম নেয় বিশ্ববিখ্যাত ইন্ডিয়া পেল এল বা আইপিএ। তবে কলকাতার বুকে আধুনিক বিয়ার কারখানা তৈরি হতে সময় লেগেছিল আরও বেশ কিছুটা।

কৃত্রিম রেফ্রিজারেশন প্রযুক্তি উন্নত হওয়ার পর ১৯০৮-০৯ সাল নাগাদ ব্রিটিশ ব্রুয়ারিজ সিন্ডিকেট কলকাতায় প্রথম আধুনিক বিয়ার তৈরি শুরু করে। ইউরোপ থেকে উন্নত ইস্ট এনে কলকাতার আবহাওয়াতেই সফলভাবে বিয়ার চোলাই করা সম্ভব হয়েছিল।

সাধারণের শুঁড়িখানা ও আধুনিক পার্ক স্ট্রিট

সাহেবদের বিলাসবহুল পান্থশালা বা ক্লাবগুলোতে ভারতীয়দের ঢোকার অধিকার ছিল না। আবার বাবুদের বাগানবাড়ির আসরও সাধারণ বাঙালির ধরা ছোঁয়ার বাইরে ছিল। এই সামাজিক বৈষম্য থেকেই জন্ম নেয় সাধারণের শুঁড়িখানা। ১৮৭২ সালে ধর্মতলায় তৈরি হয় শ ব্রাদার্স বা ছোট ব্রিস্টল। ১৯৩৭ সালে বউবাজারে চালু হয় ব্রডওয়ে বার। কেরানি, ছাত্র ও বুদ্ধিজীবীদের রাজনৈতিক তর্ক আর সাহিত্যের আড্ডার সঙ্গে সস্তায় হুইস্কি বা রামের যুগলবন্দি কলকাতার মদ্যপানকে এক গণতান্ত্রিক চেহারা দেয়।

এদিকে স্বাধীনতার পর পার্ক স্ট্রিটের রেস্তোরাঁগুলোর জ্যাজ মিউজিক আর ককটেলের হাত ধরে এক নতুন কসমোপলিটান সংস্কৃতির জন্ম নয়। যা গত শতাব্দীর দ্বিতীয় অর্ধে কলকাতার অন্যতম সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতা একেবারে মুছে গেছে এমনটা নয়। তবে সময়ের নিরিখে তাতে অনেকটাই পরিবর্তন এসেছে।

আধুনিক মাইক্রোব্রুয়ারি

আজকের একুশ শতকে বিশ্বায়নের হাত ধরে প্রযুক্তিগত বিবর্তনের চূড়ান্ত রূপে পৌঁছেছে কলকাতা। শহরের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা মাইক্রোব্রুয়ারি বা ক্রাফট বিয়ার পাবগুলোতে ক্রেতার চোখের সামনেই তাজা বিয়ার তৈরি হচ্ছে। বোতলজাত পানীয়ের বদলে মানুষ আবারও ফিরে যাচ্ছে সদ্য তৈরি টাটকা পানীয়ের দিকে। একটু ভেবে দেখলে অবাক হতে হয়, সেই হাজার বছর আগে বাংলার প্রাচীন ভাট্টির টাটকা চোলাই পদ্ধতিই যেন আজ অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মোড়কে ফিরে এসেছে। পাত্র বদলেছে। পাল্টেছে পরিবেশনের ধরনও। কিন্তু নেশার সেই আদিম টান আজও কল্লোলিনী কলকাতার রক্তে একইরকমভাবে বয়ে চলেছে।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
কৌস্তভ ভৌমিক
কৌস্তভ ভৌমিক

কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য