

বিংশ শতকের বিশের দশকের টেরিটি বাজারের অন্ধকার জগতের প্রতীকী ছবি - AI
২১শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬
১৯২০ বা তিরিশের দশকের কলকাতার সন্ধে। ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছে টেরিটি বাজার চত্বরে। ব্ল্যাকবার্ন লেনের বিখ্যাত 'নানকিং' রেস্তোরাঁয় তখন আলোর রোশনাই। শহরের নামজাদা বাঙালি বাবু থেকে শুরু করে খোদ ব্রিটিশ সাহেবরা মগ্ন রোস্ট পর্ক আর পানীয়ের গ্লাসে।
শোনা যায় এই রেস্তোরাঁতেই একসময় পা পড়েছিল রাজ কাপুর, দিলীপ কুমারের মতো বলিউড তারকাদের। ভিতরে যখন আভিজাত্যের ফোয়ারা, ঠিক সেই সময় রেস্তোরাঁর পিছনের ছাতাওয়াল গলিতে অন্য এক খেলা চলছে। কোনও আগ্নেয়াস্ত্রের আওয়াজ নেই। শুধু বৃষ্টির একটানা শব্দের মধ্যে শোনা গেল একটা চাপা গোঙানি। হাক্কা আর ক্যান্টোনিজ গোষ্ঠীর রেষারেষিতে ধারালো ক্লিভারের এক কোপে লুটিয়ে পড়ল একটা নিরীহ শরীর। লালবাজারের গোয়েন্দারা সাইরেন বাজিয়ে পৌঁছানোর অনেক আগেই লাশ গায়েব। গলির রাস্তার জমা জলে শুধু মিশে রইল কয়েক ফোঁটা রক্ত।
কেমন যেন গোয়েন্দা গল্পের আবহ। কিন্তু এটা কল্পনা নয়। গত শতাব্দীর বিষ ও ত্রিশের দশকের কলকাতার এ ছিল আরেক দিক। অন্ধকারাচ্ছন্ন রহস্যময় দিক।
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, আঠারো শতকের শেষভাগে টং অছু-এর হাত ধরে আজকের দক্ষিণ শহরতলির আছিপুরে প্রথম চিনা সম্প্রদায়ের পা পড়েছিল। পরে তারা ওখান থেকে মধ্য কলকাতায় চলে আসে। কাজের খোঁজে এর পরবর্তীতে অসংখ্য হাক্কা এবং ক্যান্টোনিজ মানুষ মধ্য কলকাতার এই অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ছাতাওয়াল গলি, টেরিটি বাজার এবং ব্ল্যাকবার্ন লেন হয়ে ওঠে ভারতের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ চায়না টাউন।
চিনা ভাষায় 'টং' শব্দের অর্থ হল হলঘর বা মহাসভা। বিদেশে আসা পরিযায়ী শ্রমিকদের পারস্পরিক সাহায্য ও সামাজিক সুরক্ষার জন্যই এই টং-এর শুরু হয়েছিল। কিন্তু এখানে ব্রিটিশ আইনের চোখে তারা ছিল ব্রাত্য। ফলে খুব দ্রুত বেঁচে থাকার তাগিদে এই সামাজিক সংগঠনগুলোই ভয়ঙ্কর সব মাফিয়া সিন্ডিকেটে পরিণত হয়। হাক্কারা মূলত চামড়ার কাজ ও জুতো তৈরির সঙ্গে যুক্ত ছিল। অন্যদিকে ক্যান্টোনিজরা ছিল কাঠমিস্ত্রি। এলাকা দখল আর ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এদের মধ্যে চরম রেষারেষি শুরু হয়। সেখান থেকেই জন্ম নেয় রক্তক্ষয়ী 'টং ওয়ার'।
এই টংদের সবচেয়ে বড় ভরসা ছিল টেরিটি বাজারের জটিল স্থাপত্য। দোতলা বা তিনতলা বাড়িগুলোর বাইরের দিকটা দেখতে অতি সাধারণ। কিন্তু ভিতরের কাঠামো ছিল আক্ষরিক অর্থেই গোলকধাঁধা। এক বাড়ির ছাদের সঙ্গে অন্য বাড়ির ছাদ কাঠের পাটাতন বা দড়ির মই দিয়ে জোড়া থাকত। মাটির নিচে তৈরি হয়েছিল একের পর এক গুপ্ত বেসমেন্ট। সংকীর্ণ সুড়ঙ্গ দিয়ে সেগুলো পাশের বাড়ি, দোকানের সঙ্গে যুক্ত ছিল। পুলিশ বা বিরোধী গ্যাং হানা দিলে অপরাধীরা মুহূর্তের মধ্যে এক বাড়ির গুপ্ত দরজা দিয়ে ঢুকে অন্য রাস্তার কোনও দোকানের পিছন দিয়ে বেরিয়ে যেত। এই অচেনা সুরঙ্গ পথে কারও পক্ষে পথ চিনে বেরোনো প্রায় অসম্ভব ব্যাপার ছিল। এইসব বেসমেন্টের ভিতরেই চলত আফিমের নেশা এবং 'পাই গাও' বা 'মাহজং' খেলার অবৈধ জুয়ার ঠেক।
তৎকালীন বাবু কালচার আর ব্রিটিশ শৌখিনতার আড়ালে এই মাফিয়া জগতের পরতে পরতে লুকিয়ে ছিল বেশ কিছু অদ্ভুত চরিত্র। সবার উপরে থাকত গডফাদার বা 'ক্ল্যান হেড'। দিনের আলোয় এরা ছিল অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত ব্যবসায়ী। টুং অন চার্চ বা সি আইপ চার্চের মতো উপাসনালয়গুলোতে এঁরা মোটা অঙ্কের চাঁদা দিতেন। কলকাতা পুলিশের কর্তাদের সঙ্গেও এদের বেশ ওঠাবসা ছিল। কিন্তু রাতের অন্ধকারে এরাই হয়ে উঠত মাফিয়া ডন।
আফিমের ব্যবসা আর বেআইনি জুয়ার ঠেকগুলো নিয়ন্ত্রণ করত পেশাদার গুপ্তঘাতকেরা। এদের বলা হত 'বু হাও ডয়' বা হ্যাচেট ম্যান। এদের প্রধান অস্ত্র ছিল ভারী মাংস কাটার ছুরি বা ছোট কুঠার। ঢিলেঢালা পোশাকের হাতার মধ্যে সেগুলো লুকিয়ে রাখত। নির্দেশ পাওয়া মাত্র টার্গেটকে অনুসরণ করে গলির অন্ধকার বাঁকে কাজ হাসিল করত। তারপর নিমেষের মধ্যে আশেপাশের কোনও বাড়ির গুপ্ত দরজা বা সুরঙ্গ পথে উধাও হয়ে যেত এরা।
এছাড়া ছিল আফিম ঠেকের মালকিনরা। বাইরে থেকে দেখলে এঁদের সাধারণ গৃহবধূ বা চায়ের দোকানের মালকিন মনে হত। কিন্তু ভিতরে ভিতরে এঁরা ছিলেন আফিমের সাপ্লাই চেইনের আসল মাথা। ব্রিটিশ পুলিশ মহিলাদের তেমন সন্দেহ করত না। সেই সুযোগটাই ষোলোআনা কাজে লাগাতেন এঁরা।
ব্রিটিশ পুলিশ আবার কিছু দুর্বল চিনা যুবককে টাকার লোভ দেখিয়ে ইনফর্মার বানাত। কিন্তু টংদের নিজস্ব গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক এতই শক্তিশালী ছিল যে বিশ্বাসঘাতকতার খবর ঠিক তাদের কাছে পৌঁছে যেত। শাস্তি হিসেবে এই ইনফরমারদের টুকরো টুকরো করে কেটে রাতের অন্ধকারে গঙ্গার জলে ভাসিয়ে দেওয়া হত!
ব্রিটিশ প্রশাসন শত চেষ্টা করেও এই দুর্ভেদ্য অন্ধকার জগতে ফাটল ধরাতে পারেনি। এর অন্যতম কারণ, চিনা সমাজের অলিখিত আইন। যাকে বলে 'ওমের্তা' বা নীরবতা। কেউ খুন হতে দেখলেও পুলিশের কাছে মুখ খুলত না। লালবাজারের ডায়েরিতে তাই অপরাধীদের নাম লেখা থাকত নিছক "Ah-Sing" বা "Ah-Wong"বা অজ্ঞাতপরিচয় চিনা হিসাবে। এদিকে সমসাময়িক সাহিত্যে বাবুদের কেচ্ছার কথা থাকলেও এই অন্ধকার মাফিয়া জগতের কথা সযত্নে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।
কিন্তু ১৯৬২ সালের ভারত-চিন যুদ্ধ সব সমীকরণ বদলে দেয়। রাতারাতি শহরের চিনা নাগরিকদের সন্দেহভাজন হিসেবে দেখা শুরু হয়। বহু মানুষকে রাজস্থানের দেউলির বন্দিশিবিরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। গ্যাংয়ের মাথারা কেউ পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। অনেকেই জাল পাসপোর্ট নিয়ে হংকং বা তাইওয়ানে পালিয়ে যায়। এরফলে ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে আফিমের ঠেক আর গুপ্ত সুড়ঙ্গগুলো।
আজকের টেরিটি বাজার অবশ্য সম্পূর্ণ অন্য এক জগৎ। রবিবার সকালে সেখানে বসে প্রাতঃরাশের বিখ্যাত আসর। মোমো, বাও আর স্যুপের গন্ধে ম ম করে চারপাশ। ব্ল্যাকবার্ন লেনের চার্চগুলো আজও দাঁড়িয়ে আছে পুরোনো দিনের নীরব সাক্ষী হয়ে। শহরের ইটকাঠের আড়ালে এভাবেই ঘুমিয়ে আছে এক হারিয়ে যাওয়া অন্ধকার ইতিহাস।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
