৪ঠা অক্টোবর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
ভারতীয় পুরুষ যৌনকর্মীদের শরীর, মন ও বাণিজ্যের টানাপোড়েন

নারীর মানসিক শূন্যতা থেকেই চাহিদা বাড়ছে পুরুষ যৌনকর্মীদের। ছবি - Google

ভারতীয় পুরুষ যৌনকর্মীদের শরীর, মন ও বাণিজ্যের টানাপোড়েন

calender icon 2 ২৩শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬

tfa logo icon

সংক্ষিপ্তসার

পুরুষ যৌনকর্মীদের আর্থ-সামাজিক বিশ্লেষণ

ভারতীয় সমাজে দাম্পত্য ও সম্পর্কে নারীর শারীরিক ও মানসিক চাহিদার দীর্ঘদিনের অবহেলা জন্ম দিচ্ছে গভীর অতৃপ্তির। সেই শূন্যতা ও একাকীত্ব ঘোচাতে নারীরা অর্থের বিনিময়ে পুরুষ সঙ্গী বা যৌনকর্মীদের সান্নিধ্য বেছে নিচ্ছেন, যেখানে শরীরী সুখের চেয়েও বেশি গুরুত্ব পায় মনোযোগ ও সহানুভূতি। অন্যদিকে, গোপনীয়তার আড়ালে এই পেশায় যুক্ত পুরুষদেরও টানাপোড়েন কম নয়—সামাজিক কলঙ্ক, নিরাপত্তাহীনতা ও শোষণের ঝুঁকি নিয়েই চলতে হয় তাঁদের। মূলত, সম্পর্কের পারস্পরিক মর্যাদা ও অনুভূতির অভাবেই আজ স্বাভাবিক সান্নিধ্য বাণিজ্যিক লেনদেনের রূপ নিচ্ছে।

মূল বিষয়

ভারতীয় সমাজে যৌনতা নিয়ে কথা বলা আজও এক অলিখিত ট্যাবু। আর সেই যৌনতার কেন্দ্রে যদি থাকে নারীর নিজস্ব আনন্দ, অবদমিত ইচ্ছে কিংবা অতৃপ্তি—তবে সমাজ যেন আরও বেশি অস্বস্তিতে পড়ে। অথচ বাস্তব বলছে, চার দেওয়ালের সেই নিস্তব্ধতার ভেতরেই জন্ম নিচ্ছে এক অদৃশ্য কিন্তু দ্রুত বাড়তে থাকা সমান্তরাল জগৎ। সেখানে কেবল শারীরিক চাহিদা মেটানো নয়, বরং একটু মনোযোগ, সহানুভূতি আর সম্মানের খোঁজে নারীরা দ্বারস্থ হচ্ছেন পুরুষ যৌনকর্মী বা এসকর্টদের। এই প্রবণতা কেবল কিছু মানুষের গোপন লেনদেনের গল্প নয়; এটি আমাদের চিরাচরিত দাম্পত্য, সম্পর্কের ব্যর্থতা এবং পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতার কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তোলা এক গভীর সামাজিক প্রশ্ন।

শরীর? না কি একটু কথা শোনার মানুষ?

একটি পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে, ভারতের বিবাহিত বা সম্পর্কে থাকা নারীদের প্রায় ৮১ শতাংশই তাঁদের যৌনজীবনে অসন্তুষ্ট। এই অসন্তোষ কেবল শারীরিক অর্গ্যাজমের অভাব নয়; এর মূলে রয়েছে পুরুষতান্ত্রিক দাম্পত্যে নারীর আবেগ ও চাহিদাকে ক্রমাগত উপেক্ষা করা। বহু পুরুষ ভাবতেই পারেন না যে শয্যাসঙ্গিনী হিসেবে নারীরও নিজস্ব প্রত্যাশা বা ছন্দ থাকতে পারে।

ঠিক এই জায়গাতেই পুরুষ এসকর্টদের ভূমিকা বদলে যাচ্ছে। পেশাদার পুরুষ এসকর্টদের প্রোফাইল ঘাঁটলে দেখা যায়, সেখানে পেশীবহুল চেহারা বা বাহ্যিক সৌন্দর্যের চেয়ে প্রাধান্য পায় তাদের শোনার ক্ষমতা, ধৈর্য এবং সঙ্গিনীকে শ্রদ্ধা জানানোর প্রতিশ্রুতি। নেটফ্লিক্সের ‘ত্রিভুবন মিশ্র সিএ টপার’ সিরিজের মতো বাস্তবেও অনেক পুরুষ সঙ্গী স্বীকার করেন, বহু নারী কেবল যৌন তৃপ্তি নয়, একটু মানসিক স্বস্তি ও ভাল আচরণের জন্যই তাঁদের ডেকে নেন। এমনও অভিজ্ঞতা রয়েছে যেখানে গার্হস্থ্য হিংসার শিকার মহিলা কেবল একজন সংবেদনশীল শ্রোতার কাঁধে মাথা রেখে কাঁদতে চেয়েছেন। অর্থাৎ, নারীর এই তথাকথিত ‘বিলাসিতা’ আসলে চরম একাকীত্ব ও অবহেলার এক করুণ বহিঃপ্রকাশ।

আধুনিক জীবন এবং ‘রেন্ট-এ-বয়ফ্রেন্ড’ সংস্কৃতি

মহানগরের যান্ত্রিক জীবনে সম্পর্কের সংজ্ঞাও আজ বদলাচ্ছে। কেবল নিভৃত ঘরের যৌনমিলন নয়, সামাজিক পরিসরে একাকিত্ব ঢাকতেও তৈরি হচ্ছে অভিনব পেশা—যেমন ‘রেন্ট-এ-বয়ফ্রেন্ড’ বা ভাড়ায় সঙ্গী নেওয়া। পরিবার ও সমাজের বিয়ের চাপ, কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানে একা যাওয়ার অস্বস্তি কাটাতে অনেক আত্মনির্ভরশীল মহিলা আজকাল চুক্তিভিত্তিক সঙ্গী নিচ্ছেন।

এখানে কোনো শারীরিক সংস্পর্শ থাকে না; থাকে নির্দিষ্ট কিছু আচরণবিধি—মন দিয়ে কথা শোনা, শালীনভাবে পাশে থাকা এবং ভদ্রতা বজায় রাখা। নারীদের এই চাহিদাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, তথাকথিত ডেটিং অ্যাপ বা বাস্তব জীবনে একজন সহানুভূতিশীল, নিরাপদ পুরুষ সঙ্গী খুঁজে পাওয়া কতটা বিরল হয়ে দাঁড়িয়েছে। টাকার বিনিময়ে এক সন্ধ্যার জন্য ‘নিখুঁত সঙ্গ’ কেনা হয়তো সাময়িক স্বস্তি দেয়, কিন্তু তা আধুনিক নগরজীবনের বিচ্ছিন্নতাবোধকেই আরও প্রকট করে তোলে।

আরও পড়ুন
লিঙ্গ সমতায় বিশ্বমঞ্চে ভারতের অবস্থান শেষ ১৫-তে!
দার্শনিক বনাম কট্টরপন্থীর যে যুদ্ধ ভারতের ভাগ্য নির্ধারণ করেছিল
ভেঙে যেতে পারে টাটা সন্স? নজিরবিহীন সংঘাতের নেপথ্যে
দেরিতে বিয়ে ও কম সন্তান, বৃদ্ধদের দেশে পরিণত হওয়ার মুখে ভারত?

গোপনীয়তার মোড়কে পেশা এবং পুরুষ এসকর্টদের নিজস্ব দ্বন্দ্ব

এই পেশায় আসা পুরুষদের জীবনও কোনো রূপকথার মতো নয়। সমাজ যেখানে নারীকে ক্রেতা হিসেবে ভাবতেই অভ্যস্ত নয়, সেখানে এই কাজ চলে চূড়ান্ত গোপনে। পরিবারের ভয়ে গোপনে  কথা বলা, প্রেমিকার কাছে নিজের আসল কাজ লুকোনো, কিংবা সমাজের চোখে অপরাধী হওয়ার ভয় এদের নিত্যসঙ্গী।

অনেকে আর্থিক অনটনে পড়ে বা শহরের বাড়তি খরচের জোগান দিতে পার্ট-টাইম হিসেবে এই পেশা বেছে নিচ্ছেন। তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও নির্মম। যৌনরোগের ঝুঁকি, টাকা না দিয়ে ব্ল্যাকমেলের ভয়, কিংবা সংবেদনহীন ক্লায়েন্টের হাতে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার ঘটনাও বিরল নয়। দরিদ্র্য পরিবার থেকে আসা অনেক তরুণ আবার পাচারের ফাঁদে পড়েও এই জগতে আটকে পড়েন। ফলে বাইরে থেকে এটিকে আপাত ‘স্বাধীন’ মনে হলেও, এর ভেতরে রয়েছে তীব্র মানসিক টানাপোড়েন আর নিরাপত্তার অভাব।

বাণিজ্যের সমীকরণ ও লিঙ্গ বৈষম্য

যৌনব্যবসার সামগ্রিক পরিকাঠামো ঐতিহাসিকভাবে পুরুষতান্ত্রিক চাহিদার ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে উঠেছে। রেড-লাইট এলাকা থেকে শুরু করে স্ট্রিপ বার—সবকিছুই পুরুষের মনোরঞ্জনের কথা মাথায় রেখে তৈরি। সেখানে নারীর শরীরকে পণ্য হিসেবে দেখার চল বহু পুরোনো। কিন্তু একজন নারী যখন অর্থের বিনিময়ে আনন্দ বা পরিষেবা কেনেন, সমাজ তখন একে গভীর অস্বস্তির চোখে দেখে।

নারীর এই পদক্ষেপকে কেউ কেউ অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বা যৌন অধিকারের প্রকাশ হিসেবে দেখতে চাইলেও, তলিয়ে দেখলে বোঝা যায় এটি কোনো সুস্থ সামাজিক উত্তরণ নয়। টাকা দিয়ে একটু স্পর্শ বা সম্মান কিনতে বাধ্য হওয়া আসলে সামগ্রিক সামাজিক ব্যর্থতারই প্রমাণ। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারী দিনের পর দিন ঘরে-বাইরে যে অবমূল্যায়নের শিকার হন, তারই প্রতিক্রিয়া হিসেবে তৈরি হচ্ছে এই বাণিজ্যিক সমাধান।

নারী যখন নিজের যৌনজীবন বা শারীরিক ইচ্ছা নিয়ে সক্রিয় হন, তা অবশ্যই একধরনের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের প্রকাশ। কিন্তু সেই ইচ্ছাপূরণের জন্য যখন সম্পর্কের স্বাভাবিক পরিসর ছেড়ে পেশাদার বাণিজ্যের আশ্রয় নিতে হয়, তখন তা আমাদের দাম্পত্য প্রতিষ্ঠান এবং পারস্পরিক সম্পর্কের পলকা রূপটিকেই বেয়াব্রু করে দেয়।

পুরুষ সঙ্গীদের এই ক্রমবর্ধমান চাহিদা আসলে কোনো বিপ্লব নয়; এটি একটি মৌন হাহাকার। যতক্ষণ না ভারতীয় পুরুষরা তাঁদের সঙ্গিনীর শরীর ও মনের ভাষাকে মর্যাদা দিতে শিখবেন, যতক্ষণ না সম্পর্কের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান ও সমানুভূতি স্বাভাবিক হয়ে উঠবে, ততক্ষণ এই অতৃপ্তির চোরাস্রোত বইতেই থাকবে—কখনও গোপন চার দেওয়ালে, কখনও বা চুক্তির পাতায়।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক
দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক

অভিজ্ঞ, সংবেদনশীল, অনুসন্ধিৎসু এবং সমকালীন ও আগামী সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কর্মঠ কিছু তরুণ-তরুণী নিয়ে দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক। ভারতীয় বাঙালি সংস্কৃতির পথ ধরে গ্লোবাল লেন্স দিয়ে দুনিয়াকে দেখে সকলের সামনে পরিবেশন করাই তাঁদের লক্ষ্য। মিলেনিয়াল-জেনX-এর অভিজ্ঞতা ও জেনZ-র উৎসাহর যথাযথ রসায়নে গঠিত 'দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক'।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য