

কলকাতার পার্সি অগ্নি মন্দির। ছবি - Google
২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬
টাটা, গোদরেজ, ইরানি, পাদিওয়াল, মিস্ত্রি, ডাব্বাওয়ালা ইত্যাদি পদবীধারী পার্সি শিল্পপতিদের রমরমা দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে সমগ্র বিশ্বে সমাদৃত। জনসেবার প্রশ্নে পার্সিদের ভূমিকা অতুলনীয়। কিন্তু আলোর নিচে এখানেই আছে এক নিকষ কালো অন্ধকার। পার্সি সমাজ যেমন রক্ষণশীল, তেমনই ভয়ঙ্কর পুরুষতান্ত্রিক। তাই পুরুষরা বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক রাখলে, নিষিদ্ধ পল্লিতে গেলে সেটাকে অন্যায় বা পাপ বলে মনে করা হয় না। এমনকি নিজেদের প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে যুগ যুগ ধরে পার্সি পুরুষেরা নিজেদের এই ব্যভিচার-কে আইনি রক্ষাকবচ পর্যন্ত দিয়ে এসেছেন। কিন্তু এর বিরুদ্ধে এই খাস কলকাতাতে দাঁড়িয়েই রচিত হয়েছে বিদ্রোহ।
কলকাতার এক অভিজাত পার্সি পরিবারের অন্দরমহল থেকে শুরু হওয়া একটি আইনি লড়াই কীভাবে কয়েক শতাব্দীর পুরনো ধর্মীয় দ্বিচারিতার মুখোশ টেনে ছিঁড়ে দিতে পারে, তার সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক প্রমাণ মেহতা পরিবারের ঘটনা। ঘটনাটি ২০১৭ সালের। প্রাক্তন আন্তর্জাতিক ক্রীড়াবিদ এবং কলকাতার পার্সি সমাজের পরিচিত মুখ প্রোচি এন. মেহতা কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এর নেপথ্য কারণ জানলে কেউ ভিড়মি খাবেন, কেউ চমকে উঠবেন, আবার কারোর গা রাগে ঘেন্নায় রি রি করে উঠবে!
প্রোচি এন. মেহতার কন্যা সানায়া মেহতা ভালোবেসে এক হিন্দু যুবককে বিয়ে করেছিলেন। সেই 'অপরাধে' সানায়ার দুই সন্তানকে মধ্য কলকাতার 'লেট ই. বি. মেহতা জরাথুস্ট্রিয়ান আঞ্জুমান আদারান' বা পার্সি অগ্নিমন্দিরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি।
কারণ হিসেবে পার্সি ধর্মের কট্টরপন্থী পুরোহিতরা ফতোয়া দেন, ওই দুই শিশু অ-পার্সির সন্তান। তাই তারা অপবিত্র। তারা অপবিত্র, কারণ তাদের মা পার্সি হলেও বাবা ছিল হিন্দু। অথচ কোনও পার্সি পুরুষ যদি হিন্দু বা অন্য ধর্মের কোনও নারীকে বিয়ে করতেন, তবে তাঁদের সন্তানদের পার্সি হিসেবে দিব্যি মাথায় তুলে রাখা হত। এই চরম লিঙ্গবৈষম্য এবং অপমানের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠেন প্রোচি এন. মেহতা। কলকাতা হাইকোর্ট থেকে শুরু করে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ায় এই ঐতিহাসিক আইনি লড়াই। ২০২২ সালে প্রকাশিত হয় প্রোচি মেহতার আলোড়ন ফেলা বই 'Who is a Parsi?'।
সেই বই এবং ওই বইকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন আলোচনার সূত্র ধরে পার্সি সমাজের বিবাহ, বিচ্ছেদ এবং উত্তরাধিকার নিয়ে কার্যত কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে বেরিয়ে আসে কেউটে। উন্মোচিত হয় পার্সি সমাজের এমন এক অন্ধকার দিক, যা শতাব্দী প্রাচীন এক গভীর পুরুষতান্ত্রিক ষড়যন্ত্রের দলিল। বিপুল বৈভব আর আভিজাত্যের মোড়কে ঢাকা পার্সি সমাজে পুরুষদের ব্যভিচারকে কীভাবে দিনের পর দিন আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়ে এসেছে, সেই ঘৃণ্য ইতিহাসই এই মামলার সূত্র ধরে আবার নতুন করে সামনে আসে।
যেকোনও ধর্মের একেবারে গোড়ার কথাগুলোর সঙ্গে পরবর্তীকালের পুরোহিত, মৌলবি বা অন্যান্য সমাজপতিদের তৈরি করা নিয়মের বিস্তর ফারাক থাকে। এটা প্রমাণিত সত্য। পার্সি বা জরাথুস্ট্রীয় ধর্মের ক্ষেত্রেও ঠিক সেটাই ঘটেছিল। জরাথুস্ট্রের মূল মতবাদ বা পার্সি ধর্মের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ আবেস্তায় কিন্তু এমন কোনও পুরুষতান্ত্রিক বৈষম্যের কথা বলা নেই। সেখানে বরং পতিতাবৃত্তি বা ব্যভিচারের তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। আবেস্তায় পতিতাবৃত্তিকে 'জাহি' নামক এক অশুভ দানবীয় শক্তির রূপক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। জরাথুস্ট্র স্পষ্ট বলেছিলেন, নারী বা পুরুষ উভয়ের জন্যই ব্যভিচার এক চরম পাপ।
কিন্তু বাস্তব চিত্রটা ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। ধর্মের এই পবিত্র বাণীকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পার্সি সমাজের দণ্ডমুণ্ডের কর্তারা আর প্রভাবশালী পুরোহিতরা মিলে নিজেদের সুবিধামতো নিয়ম বানিয়ে যুগ যুগ ধরে তা চালিয়ে এসেছে। এই নিয়মের মাধ্যমে পুরুষদের জন্য যা ছিল নিছকই একটি সামাজিক প্রথা বা ক্ষমাযোগ্য প্রবৃত্তি, নারীদের ক্ষেত্রে তাকেই ধর্মের দোহাই দিয়ে অপরাধ বা অশুদ্ধতা হিসেবে দেগে দেওয়া হয়।
পার্সি সমাজের এই প্রাতিষ্ঠানিক দ্বিচারিতা শুধু ব্রিটিশ ভারতের কলকাতা বা বোম্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এর শিকড় লুকিয়ে আছে খোদ পার্সি ধর্মের জন্মস্থান, অর্থাৎ প্রাচীন পারস্যে। ২২৪ থেকে ৬৫১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করা সাসানীয় সাম্রাজ্যের যুগে রাজতন্ত্র এবং অভিজাতদের মধ্যে উপপত্নী প্রথা প্রবলভাবে প্রচলিত ছিল এবং পুরোহিতদের মাধ্যমে তাকে আইনি বৈধতা দেওয়া হয়।
সেই সময়কার প্রাচীন আইনি গ্রন্থ 'মাতিকান ই হাজার দাস্তান' ঘাঁটলে দেখা যায়, পার্সি ধনী পুরুষদের একাধিক স্ত্রী এবং অসংখ্য উপপত্নী রাখার পূর্ণ অধিকার ছিল। প্রধান স্ত্রীকে বলা হত 'পাদিক্ষায়'। তাঁর সন্তানেরাই সম্পত্তির আসল উত্তরাধিকারী হত। অন্যদিকে পার্সি পুরুষরা অবাধে ইচ্ছেমত 'চাগার' বা উপপত্নী রাখতে পারতেন। যেহেতু এই প্রথা আইনিভাবে বৈধ ছিল, তাই রাজপরিবার বা অভিজাতদের এই আচরণকে ধর্মীয় কর্তারা কখনও ব্যভিচার হিসেবে ধরতেন না। খোদ রাজা দ্বিতীয় খসরুর বিশাল হেরেমে হাজার হাজার নারী ছিল বলে ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। রাজার বা সমাজের মাথাদের এই অবাধ নারীসঙ্গ তখন সমাজের চোখে ছিল চূড়ান্ত পৌরুষের প্রতীক।
আরবদের আক্রমণের পর পারস্য থেকে পালিয়ে ভারতে এসে পার্সিরা বিশাল সাম্রাজ্য ও ব্যবসা গড়ে তুলেছিল। যা আজও বহমান। ব্রিটিশ আমলে তারা বিপুল বৈভবের অধিকারী হয় এবং সমাজের মাথা হয়ে বসে। কিন্তু তাদের ভেতরে লুকিয়ে থাকা পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা একটুও বদলায়নি। বরং তা আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। এর সবচেয়ে বড় ও ভয়ঙ্কর প্রমাণ হল ১৮৬৫ সালের পার্সি ম্যারেজ অ্যান্ড ডিভোর্স অ্যাক্ট।
এই আইনে এমন কিছু ধারা ঢোকানো হয়েছিল, যা আজকের দিনে দাঁড়িয়ে কল্পনাও করা যাবে না। তৎকালীন ধনী ও প্রভাবশালী পার্সি পুরুষরা নিজেদের অবাধ যৌনতাকে আইনি মান্যতা দিতে এই আইনে পতিতালয়ে যাওয়ার এক অদ্ভুত সুরক্ষা নিশ্চিত করেছিলেন। এই আইন অনুযায়ী, কোনও পার্সি স্বামী যদি যৌনকর্মীর কাছে যেতেন, তবে তাকে বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে কারণ বা 'ব্যভিচার' হিসেবে গণ্য করা হত না। অর্থাৎ স্ত্রীর কোনও আইনি অধিকার ছিল না স্বামীর এই আচরণের জন্য ডিভোর্স চাওয়ার। অথচ কোনও পার্সি নারী এমন কিছু করলে তাকে সমাজচ্যুত করার সব রকম ব্যবস্থা আইনে রাখা হয়েছিল। এই বিষয়টাই বুঝিয়ে দেয়, পুরুষতন্ত্র ঠিক কতটা গভীরে শিকড় গাড়লে এমন একটা আইনকে সমাজের বুকে দিনের পর দিন টিকিয়ে রাখা যায়!
পার্সি পুরুষদের এই অবাধ লালসা এবং সমাজের দ্বিচারিতার আরও এক চরম নিদর্শন দেখা যায় বোম্বে হাইকোর্টের ১৯০৮ সালের বিখ্যাত 'পেটিট বনাম জিজিভয়' মামলায়। এই মামলায় বিচারপতি দিনশ দাভার এবং ফ্র্যাঙ্ক বিমন তাঁদের রায়ে পরিষ্কারভাবে জানিয়েছিলেন, পার্সি পুরুষদের ঔরসে কোনও রক্ষিতা বা যৌনকর্মীর গর্ভে জন্ম নেওয়া শিশুরাও পার্সি হওয়ার যোগ্য। সমাজ তাদের রীতিমত 'নবজ্যোত' বা ধর্মান্তর করিয়ে গ্রহণ করেছে। এই নিয়ে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের যুক্তি ছিল, পুরুষের রক্তই হল বংশের ধারক। তাই বীজ যার, সন্তানও তার। সেই নারী যৌনকর্মী হলেও কোনও আপত্তি নেই।
কিন্তু ২০১৭ সালে দাঁড়িয়ে যখন বিধান দেওয়া হয়, একজন বিবাহিত পার্সি নারী অন্য ধর্মের কাউকে আইনিভাবে বিয়ে করে সন্তানের জন্ম দিয়েছেন, তাই সেই সন্তানকে অশুদ্ধ, তাকে অগ্নিমন্দিরে ঢুকতে দেওয়া যাবে না। তখন স্বাভাবিকভাবেই তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ধেয়ে আসে। একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে ধর্ম এবং রক্তের বিশুদ্ধতার এই অদ্ভুত সংজ্ঞা বিস্মিত করার মতো বিষয় বইকি। বিশেষ করে ভারতের মতো একটি রাষ্ট্রে, যেখানে নারী ও পুরুষের সমান অধিকার সংবিধান স্বীকৃত।
টাটা, ওয়াদিয়া বা গোদরেজদের মতো পরিবারগুলো পার্সি সমাজকে আধুনিকতা ও শিল্পায়নের শিখরে পৌঁছে দিয়েছে ঠিকই। তাদের শিক্ষা ও প্রগতিশীলতার প্রশ্নে উজ্জ্বল ভাবমূর্তিও তৈরি হয়েছে বিশ্বজুড়ে। কিন্তু এই বিপুল বৈভবের আড়ালে অত্যন্ত সন্তর্পণে লুকিয়ে থাকা লিঙ্গবৈষম্যের বীজ আজও পুরোপুরি উপড়ে ফেলা যায়নি।
প্রোচি এন. মেহতার এই লড়াই শুধু একটি মন্দিরে প্রবেশের অধিকারের লড়াই ছিল না। এটি শত শত বছর ধরে চলে আসা এক চরম সুবিধাবাদী ও পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর বিরুদ্ধে সরাসরি বিদ্রোহ ছিল। কারণ মনে রাখতে হবে, পার্সি সমাজে ধর্মীয় বিধানকে চ্যালেঞ্জ করার নিদর্শন খুব বিশেষ একটা নেই। সেখানে কলকাতার বুকের এই ঘটনা একদিক থেকে নবজাগরণ তো বটেই।
যদিও এই মামলার চূড়ান্ত রায় এখনও আসেনি। মামলাটি এখনও কলকাতা হাইকোর্টে বিচারাধীন।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
