

১৮৬৪ সালের গ্রেট ক্যালকাটা সাইক্লোনের স্কেচ - Google
২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬
৫ অক্টোবর, ১৮৬৪ সালে কলকাতার বুকে সকাল পেরোতেই হাওয়ার দাপট বাড়তে শুরু করে। একসময় কলকাতা ও তার সংলগ্ন তৎকালীন মেদিনীপুর এবং ২৪ পরগনার একাংশে বাতাসের গতিবেগ পৌঁছে যায় ঘণ্টায় প্রায় ২০০ কিলোমিটারে! তবে সেদিন আসল ভয়াবহতা কিন্তু এই হাওয়ার দাপট ছিল না। কালান্তক যমদূতের মতো আসল ঘাতক হয়ে উঠেছিল হুগলি নদীর জল। প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের ধাক্কায় হুগলি নদীর জলস্তর অস্বাভাবিকভাবে ফুলে ওঠে। ফানেল আকৃতির মোহনা দিয়ে চোখের পলকে কলকাতার মধ্যে ঢুকে পড়ে প্রায় ৪০ ফুট উঁচু এক বিশাল জলের দেওয়াল! এই ভয়াবহ জলোচ্ছ্বাস তার চলার পথে থাকা সবকিছুকে খড়কুটোর মতো ভাসিয়ে নিয়ে যায়। এরফলে কলকাতায় ৬০,০০০-এর বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।
দিনটা ছিল ৫ অক্টোবর, ১৮৬৪। আর পাঁচটা সাধারণ দিনের মতোই সকাল হয়েছিল কলকাতায়। তখন ঘুণাক্ষরেও টের পাওয়া যায়নি, আর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শহরের মানচিত্রটা চিরতরে বদলে যাবে।
সেদিন আচমকা আকাশ কালো হয়ে যায়। যেন সকালেই গভীর অন্ধকার নেমে এসেছে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় ব্যাপক দমকা হাওয়া। আর তারপর যা ঘটেছিল তা শুধু কলকাতা নয়, গোটা অবিভক্ত বাংলার ইতিহাসের অন্যতম ভয়ঙ্কর এক অধ্যায়। কলকাতা ও তার সংলগ্ন অঞ্চলের বুকে আছড়ে পড়েছিল প্রলয়ঙ্করী 'গ্রেট ক্যালকাটা সাইক্লোন'। যা আক্ষরিক অর্থেই তিলোত্তমাকে এক মৃত্যুপুরীতে পরিণত করেছিল।
১৮৬৪ সালের অক্টোবর মাসের শুরু থেকেই বঙ্গোপসাগরে আবহাওয়া খুব একটা ভালো যাচ্ছিল না। ২ অক্টোবর আন্দামানের কাছে সমুদ্রে থাকা 'মোনেকা' আর 'কনফ্লিক্ট' নামের দুটো ব্রিটিশ জাহাজ প্রথম বিপদের গন্ধ পায়। ওই জাহাজ দুটির নাবিকরা দেখেন, ব্যারোমিটারের পারদ অস্বাভাবিকভাবে নামছে। আকাশের রং হয়ে উঠেছে অদ্ভুত রকমের রক্তবর্ণ। রাতের তারাদের আলোও কেমন যেন ফ্যাকাশে। কিন্তু তখনকার দিনে আধুনিক রাডার বা স্যাটেলাইট তো দূরের কথা, সাধারণ রেডিও সতর্কতা ব্যবস্থাও ছিল না। ফলে কলকাতার মানুষের কাছে বা ব্রিটিশ কর্তাব্যক্তিদের কাছে আবহাওয়ার এই অস্বাভাবিকতার খবর কোনভাবেই আগাম পৌঁছে দেওয়া যায়নি। ফলে আজকের মতো আগাম প্রস্তুতির কোনও প্রশ্নই ছিল না।
সেদিন সকাল পেরোতেই হাওয়ার দাপট বাড়তে শুরু করে। একসময় কলকাতা ও তার সংলগ্ন তৎকালীন মেদিনীপুর এবং ২৪ পরগনার একাংশে বাতাসের গতিবেগ পৌঁছে যায় ঘণ্টায় প্রায় ২০০ কিলোমিটারে! তবে সেদিন আসল ভয়াবহতা কিন্তু এই হাওয়ার দাপট ছিল না। কালান্তক যমদূতের মতো আসল ঘাতক হয়ে উঠেছিল হুগলি নদীর জল। প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের ধাক্কায় হুগলি নদীর জলস্তর অস্বাভাবিকভাবে ফুলে ওঠে। ফানেল আকৃতির মোহনা দিয়ে চোখের পলকে কলকাতার মধ্যে ঢুকে পড়ে প্রায় ৪০ ফুট উঁচু এক বিশাল জলের দেওয়াল! এই ভয়াবহ জলোচ্ছ্বাস তার চলার পথে থাকা সবকিছুকে খড়কুটোর মতো ভাসিয়ে নিয়ে যায়। কলকাতা ও তার সংলগ্ন অঞ্চলে সেদিন ১৫ থেকে ৪০ ফুট উচ্চতা পর্যন্ত এই জলের দেওয়াল সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল।
আজকের পূর্ব মেদিনীপুরের খেজুরি আর হিজলিতে সেই সময়ের বাংলার অত্যন্ত ব্যস্ত এবং গুরুত্বপূর্ণ দুটি আন্তর্জাতিক বন্দর ছিল। বিদেশ থেকে বড় বড় জাহাজ এসে ভিড়ত সেখানে। কিন্তু এই ঘূর্ণিঝড় ও তার ফলে উদ্ভূত বিশাল জলোচ্ছ্বাসের প্রথম ধাক্কাতেই বন্দর দুটি চিরতরে সমুদ্রের গর্ভে তলিয়ে যায়। আজ আর তাদের কোনও অস্তিত্বই নেই! ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে দুটো আস্ত অন্তর্জাতিক সমুদ্র বন্দর একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার ঘটনা ইতিহাসে বিরল।
তৎকালীন ব্রিটিশ তথ্য বলছে, কলকাতার বন্দরে তখন প্রায় ১৯৫টি বিশালাকার জাহাজ নোঙর করা ছিল। নদীর দানবীয় ঢেউয়ের তোড়ে তার মধ্যে ১৭২টি জাহাজই হয় ডুবে যায় নয়তো ছিটকে এসে পড়ে হাওড়ার চরে আর কলকাতার রাস্তায়! সত্যিই সেদিন খিদিরপুর সহ কলকাতার বিভিন্ন এলাকার রাস্তায় ভাঙা জাহাজের টুকরো পড়েছিল। বাকি জাহাজগুলোর অবস্থা তথৈবচ ছিল। সেগুলোও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ব্রিটিশ সরকারের করা ১৮৬৬ সালের সেন্সাস অনুযায়ী বৃহত্তর কলকাতায় তখন প্রায় আট লক্ষ মানুষের বাস। যাদের বেশিরভাগই গাদাগাদি করে বাস করতেন খড় আর টালির চালের বাড়িতে। ফলে বোঝাই যাচ্ছে তার দু'বছর আগে পরিস্থিতিটা প্রায় এমনই ছিল, বিশেষ একটা বদলায়নি। ১৮৬৪ সালের গ্রেট ক্যালকাটা সাইক্লোনের জল আর হাওয়ার জোড়া ফলায় এইসব সাধারণ মানুষের একটা বড় অংশ বাঁচার চেষ্টা করার সুযোগটাও সেদিন পায়নি।
সরকারি হিসাব বলছে, এই ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে যে বিপুল জলোচ্ছ্বাস কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকায় আছড়ে পড়েছিল, তাতে সরাসরি ডুবে প্রায় ৬০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। আজকের আলিপুর, ধর্মতলা থেকে শুরু করে দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিস্তীর্ণ এলাকা কার্যত শ্মশানে পরিণত হয়। তবে বিপর্যয় সেখানেই থামেনি। জল নেমে যাওয়ার পর শুরু হয় আরেক বিভীষিকা। চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মৃতদেহ পচে এবং পানীয় জলের ভয়াবহ অভাবে মহামারী দেখা দেয়।
আবহাওয়াবিদ জে. ই. গ্যাস্ট্রেল এবং হেনরি এফ. ব্ল্যানফোর্ডের যৌথ রিপোর্ট থেকে এক ভয়ঙ্কর পরিসংখ্যান পাওয়া যায়। পূর্ব মেদিনীপুরের মহিষাদলে সেদিন ঢেউয়ের ধাক্কায় ডুবে মারা গিয়েছিলেন ৩,৭৪০ জন। কিন্তু চাঞ্চল্যকর বিষয় হল, পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে কলেরায় ভুগে সেখানে আরও ৪,২৪৩ জনের মৃত্যু হয়! অর্থাৎ, কিছু কিছু জায়গায় মূল ঝড়ের চেয়েও বেশি প্রাণ কেড়েছিল মহামারী।
ঝড়ের তাণ্ডবে রাজভবন, অর্থাৎ তৎকালীন ব্রিটিশ বড়লাটের বাসভবন ও মূল কার্যালয়ের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল। কার্নিশ, দরজা, জানলা থেকে শুরু করে বাগানের বহু প্রাচীন গাছ উপড়ে যায়। কিন্তু তৎকালীন বড়লাট স্যার জন লরেন্স সে যাত্রায় দিব্যি বেঁচে যান। কারণ ওই বছরই তিনি সিমলাকে ব্রিটিশ ভারতের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন। প্রবল গরমের হাত থেকে বাঁচতে এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত তিনি সিমলাতেই থাকতেন। ফলে কলকাতার বুকে যখন ধ্বংসলীলা চলছে, বড়লাট তখন সিমলার নিরাপদ আশ্রয়ে ছিলেন।
এই কয়েক বছর আগে, ২০২০ সালে কলকাতা আরও এক ভয়াবহ সুপার সাইক্লোন 'আমফান'-এর সাক্ষী হয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই ১৮৬৪ সালের এই ঝড়ের সঙ্গে তার একটা তুলনামূলক আলোচনা চলে আসে। আমফানের সর্বোচ্চ গতিবেগ সমুদ্রে ২৬০ কিলোমিটার থাকলেও স্থলভাগে তা ১৫৫ থেকে ১৬৫ কিলোমিটারে নেমে এসেছিল। অন্যদিকে ১৮৬৪ সালের গ্রেট ক্যালকাটা সাইক্লোনের গতিবেগ স্থলভাগেই ছিল আনুমানিক ১৯০ থেকে ২০০ কিলোমিটারের কাছাকাছি।
তবে ধ্বংসলীলা আর ক্ষয়ক্ষতির ধরনে বিস্তর ফারাক রয়েছে। আমফানের ক্ষেত্রে জলোচ্ছ্বাস ছিল ১৩ থেকে ১৬ ফুটের মতো। এই সময় আমাদের কাছে আধুনিক উপগ্রহের নিখুঁত পূর্বাভাস আছে। ফলে আমফান আছড়ে পড়ার আগেই প্রচুর মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছিল। ফলে মৃতের সংখ্যা রাজ্যে একশোর নিচেই আটকে রাখা যায়। কিন্তু আধুনিক পরিকাঠামো অর্থাৎ বিদ্যুতের খুঁটি, টেলিকম টাওয়ার আর বহুতল ভবনের কাঁচ ভেঙে ব্যাপক আর্থিক ক্ষতি হয়েছিল। কলকাতা দিনের পর দিন অন্ধকারে ডুবে ছিল।
অন্যদিকে ১৮৬৪ সালে ৪০ ফুট উঁচু ঢেউ মানুষকে পালানোর এক সেকেন্ডও সময় দেয়নি। সেযুগে মজবুত পাকা বাড়ি প্রায় ছিলই না। তাই মানবিক বিপর্যয় বা মৃত্যু সংখ্যার নিরিখে ১৮৬৪ সালের ঘূর্ণিঝড় আমফানের চেয়ে হাজার গুণ বেশি ভয়াবহ ছিল। তবে আধুনিক কলকাতাবাসীর ক্ষেত্রে আমফানের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব সাংঘাতিক। কংক্রিটের জঙ্গলে তৈরি হওয়া উইন্ড টানেল এফেক্টের জেরে হাওয়ার সেই হাড় হিম করা গর্জন এর আগে শহরবাসী শোনেনি। হাতের মুঠোয় ইন্টারনেট থাকা মানুষ চোখের সামনে বহির্বিশ্ব থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার যে তীব্র অসহায়তা অনুভব করেছিলেন, তা সত্যিই অভাবনীয়। প্রকৃতির রুদ্ররূপের সামনে মানুষ আজও যে কতটা ক্ষুদ্র আমফান আমাদের সেটাই নতুন করে শিখিয়ে দিয়ে গেছে।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
