

সুখের সময়ে বন্ধু শচীনের সঙ্গে কাম্বলি। ছবি - Google
২৮শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬
শচীন ও কাম্বলিকে ভারতীয় ক্রিকেটের উদীয়মান তারকা বলেছিলেন খোদ দ্রোনাচার্য কোচ আচরেকারও। কিন্তু শচীন যেভাবে এগিয়ে গিয়েছেন, কাম্বলি ততটাই দ্রুত নেমেছেন। তিনি দু’বছর মাত্র টেস্ট দলে থাকতে পেরেছেন, আর ওয়ান ডে কেরিয়ার দশ বছরের।
তাঁর সেই কথাটি একটা সময় মিথ হয়ে গিয়েছিল, আমি উপরে উঠেছি সিঁড়ি বেয়ে, আর শচীন উপরে উঠেছে এলিভেটরে চড়ে! বিনোদ কাম্বলির সেইসময়ের এই উক্তি ঘিরে বিতর্কেরও জন্ম নিয়েছিল। তিনি মনে করেন, ছোটবেলা থেকে প্রচন্ড অভাবের মধ্যে বড় হয়েছেন, তাই মাঝেমধ্যে হতাশ হয়ে যেতেন। যেতে যেতে পরিশ্রান্ত হয়ে পড়তেন, কিন্তু তার মানে এই নয় যে, কঠিন লড়াইয়ের পরে কারওর জীবন শৃঙ্খলাহীন হয়ে যেতে পারে। তিনি বেলাগাম হয়ে যেতে পারেন।
ঠিক সেটাই ঘটেছিল কাম্বলির জীবনে। বেশ মনে আছে, ১৯৯৫ সালে কলকাতার ইডেন গার্ডেন্সে ভারতীয় এ দল বনাম কেনিয়ার একটি চারদিনের প্রস্তুতি ম্যাচ হয়েছিল। তখনও সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের স্বপ্নের অভিষেক হয়নি লর্ডসে। ওই ম্যাচে ভারতীয় এ দলের অধিনায়ক ছিলেন কাম্বলি, আর সৌরভ ছিলেন সাধারণ সদস্য।
ওই ম্যাচের তিনদিন আগে থাকতে কাম্বলির সঙ্গে একটু কথা বলার জন্য কলকাতা মিডিয়া প্রতিনিধিদের লম্বা লাইন দেখা গিয়েছিল। কাম্বলির ম্যানেজার নিজের নোটবুকে মিডিয়া প্রতিনিধিদের নাম লিখে রাখছিলেন। তিনিই শেষ কথা বলছিলেন, কার সঙ্গে কাম্বলি কথা বলবেন! সৌরভকে সেইসময় পাত্তাই দিতে চায়নি শহরের বাঘা বাঘা সাংবাদিকরা। সৌরভ একাই নেটে ব্যাটিং ও বোলিং করে নিজের গাড়িতে বাড়ির পথ ধরতেন। সব আকর্ষণের কেন্দ্রে ছিলেন শচীনের বাল্যকালের বন্ধুই।
কাম্বলিকে নিয়ে সেইসময় উন্মাদনার কারণও ছিল, কারণ তিনি সবেমাত্র শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে পরপর দুটি ডাবল সেঞ্চুরি করে শহরে এসেছেন, সেইজন্য তিনি তখন ভারতীয় ক্রিকেটের তারকার তারকা। ওই কেনিয়া ম্যাচে যদিও কাম্বলি রান পাননি, পেয়েছিলেন কলকাতার মহারাজ সৌরভই। অথচ তিনি অন্তরালেই ছিলেন। পরে কী হয়েছিল, সেটা তো সারা ভারত জানে।
শচীন ও কাম্বলির একই সময়ে পথচলা শুরু। অথচ দু’জনের ভিন্ন পরিণতি! শচীন তেন্ডুলকারের সঙ্গে ক্রিকেট জীবনের শুরুতে যে কাম্বলিকে ঘিরে ছিল আকাশছোঁয়া প্রত্যাশা। দু’জনই মুম্বইয়ের সারদাশ্রম বিদ্যামন্দিরের ছাত্র ছিলেন। ওই স্কুলের হয়ে তাঁদের জুটিতে ৫০০ রান আজও রেকর্ড হয়ে রয়েছে। দু’জনের কোচও ছিলেন রমাকান্ত আচরেকার। কিন্তু শচীন ক্রিকেটকে প্রাধান্য দিয়ে বাকি কিছুতে একদম মন দেননি। কাম্বলির আবার রাস্তা বিপরীত ছিল। তিনি ক্রিকেটে মন না দিয়ে বেহিসেবী জীবনে গা ভাসিয়েছিলেন। কাম্বলি সারা রাত পার্টি করতেন, লাস্যময়ীদের সঙ্গে সময় কাটাতেন। শচীন ছিলেন একেবারেই গৃহমুখী, তিনি মাঠ ও বাড়ি ছাড়া কিছু জানতেন না।
শচীন ও কাম্বলিকে ভারতীয় ক্রিকেটের উদীয়মান তারকা বলেছিলেন খোদ দ্রোনাচার্য কোচ আচরেকারও। কিন্তু শচীন যত এগিয়েছেন, কাম্বলি যেন তত দ্রুত নেমেছেন। তিনি মাত্র দু’বছর টেস্ট দলে থাকতে পেরেছেন, আর ওয়ান ডে কেরিয়ার দশ বছরের। নেশা করা থেকে শুরু করে উৎশৃঙ্খল জীবনে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া কাম্বলি বারবার বিতর্কে জড়িয়েছেন। তাঁর দু’বার বিবাহ-বিচ্ছেদ ঘটেছে।
একই সময়ের প্রতিভা শচীন তেন্ডুলকার নিজেকে ক্রমশ অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছেন। কঠোর অনুশাসন, দীর্ঘদিনের পরিশ্রম এবং ক্রিকেটের প্রতি অসীম নিষ্ঠায় শচীন হয়ে ওঠেন বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম সর্বকালের সেরা ব্যাটার। রেকর্ডের পর রেকর্ড গড়ে তিনি লিখেছেন এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়।
কাম্বলির জীবন গভীর খাদে পড়ে গিয়েছে। তিনি চাকরি ছেড়ে দেন, পরবর্তী জীবনে নিজের উপার্জিত অর্থ নষ্ট করে অসহায় হয়ে যান। তাঁর জন্য বোর্ড অর্থও দিয়েছিল, সেই টাকাও তিনি রাখতে পারেননি। তারপর ক্রমে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন একাধিকবার। এমনকী বাড়িতে চলার শক্তিও হারিয়েছেন। বর্তমানে তাঁকে রাখা হয়েছে মুম্বইয়ের একটি নামী বৃদ্ধাশ্রমে। এখনও তাঁকে সহায়তা করে চলেছেন বন্ধু শচীনসহ ১৯৮৩ সালের বিশ্বকাপ জয়ী দলের সদস্যরা। তারপরেও বাকি জীবন কীভাবে কাটবে কেউ জানে না।
ক্রিকেটের বাইশ গজে কাম্বলির প্রতিভার কোনও অভাব ছিল না তাঁর। কিন্তু শুধু প্রতিভা নয়, দীর্ঘ কেরিয়ার গড়তে প্রয়োজন শৃঙ্খলা, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং কঠিন সময়ের সঙ্গে লড়াই করার মানসিক শক্তিও। কাম্বলির জীবন সেই কঠিন সত্যেরই বড় দৃষ্টান্ত। একদিকে শচীনের অমর ক্রিকেটগাথা, অন্যদিকে কাম্বলির ক্রমে হারিয়ে যাওয়ার গল্প – এমন বৈপরিত্য জীবন ভারতীয় ক্রিকেট কেন, বিশ্ব ক্রিকেটেও দূর্লভ।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার সিনিয়র ক্রীড়া সাংবাদিক। দুটি ফুটবল বিশ্বকাপ এবং দুটি ক্রিকেট বিশ্বকাপ কভার করা এই সাংবাদিকের একাধিক আরও আন্তর্জাতিক ইভেন্ট করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে। শুভ্র দুটি বইও লিখেছেন, একটা বিশ্বকাপের গল্প যুদ্ধ এবং শেষটি স্বপ্নের নায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো।
