

বাউল-ছৌ এর অস্তিত্ব থাকবে তো? ছবি - AI
ডিজিটাল প্লাটফর্মের হাত ধরে আর্থিক স্থিতিশীলতার মুখ দেখছেন বাউল-ছৌ এর মতো বাংলার প্রান্তিক আর্ট ফর্মগুলোর সঙ্গে জড়িত শিল্পীরা। কিন্তু টাকা যে আরও টাকার দিকে টেনে নিয়ে যায়। ফলে অনেকেই সোশ্যাল মিডিয়ার ভিউ-লাইকের নেশায় মজেছেন। এর ফলে বাউল পরিণত হচ্ছে চটুল গানে, ছৌ-এর সঙ্গে অ্যাক্রোবেটিক্সের বা সার্কাসের ট্রাপিজের খেলার বিশেষ একটা পার্থক্য থাকছে না!
লাল মাটির পরিচিত ধুলোমাখা পথ আর আখড়ার সীমানা পার হয়ে বাংলার লোকশিল্পে আজ এক নতুন উড়ান শুরু হয়েছে। তা হল সকলের হাতের মুঠোয় থাকা স্মার্টফোন। ইন্টারনেট আর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের হাত ধরে বাউল গান এবং ছৌ নাচ এখন আর কেবল বাংলার নিজস্ব গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তা এখন সারা বিশ্বের চর্চার বিষয়। ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম বা স্পটিফাইয়ের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো এই প্রাচীন আর্ট ফর্মগুলিকে সরাসরি আন্তর্জাতিক দর্শকদের ড্রয়িংরুমে পৌঁছে দিচ্ছে।
ডিজিটালাইজেশনের এই জোয়ারের সুফলগুলো নিয়েই সাধারণত সবাই মেতে থাকেন। কিন্তু এর উল্টো পিঠে লুকিয়ে আছে এক গভীর অন্ধকার। প্রযুক্তির এই অভাবনীয় উন্নতি কি সত্যিই এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পগুলোকে বাঁচিয়ে রাখছে, নাকি ভিউ আর লাইকের ইঁদুর দৌড়ে এদের আত্মাটাই ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে?
বীরভূমের কোনও এক ছোট্ট গ্রামের কথা ধরা যাক। সেখানকার গৌরহরি বাউল আগে একতারা হাতে গান গাইতেন জয়দেবের মেলায় বা গ্রামের চায়ের দোকানে। এভাবেই তাঁর দিন কাটত। গান শুনিয়ে যেটুকু জুটত তাতেই তিনি খুশি থাকতেন। কিন্তু বছর দু'য়েক আগে গ্রামেরই এক ছেলে তাঁর গাওয়া লালন ফকিরের একটি গান মোবাইলে রেকর্ড করে ইউটিউবে আপলোড করে দেয়।
সেই ভিডিওতে অতিরিক্ত কোনও চকমকি ছিল না। তাতে একটা ভাঙা মাটির দাওয়ায় বসে চোখ বুজে অদ্ভুত দরদি সুরে গেয়েছিলেন গৌরহরি বাউল। কয়েক মাসের মধ্যেই ম্যাজিকের মতো সেই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। তার পরের ঘটনাক্রম যেন স্বপ্নের মতো। আজ স্পটিফাইয়ের গ্লোবাল ফোক প্লেলিস্টে গৌরহরি বাউলের গান বাজে। সুদূর ফ্রান্স বা আমেরিকার শ্রোতারা তাঁর গানের নিচে মন্তব্য করে জানান, ভাষা না বুঝলেও সুর তাঁদের আত্মাকে ছুঁয়ে গেছে। ইউটিউবের রোজগার তাঁকে আজ স্বাবলম্বী করেছে।
পুরুলিয়ার প্রত্যন্ত গ্রামের তরুণ ছৌ শিল্পী সুমন্ত মাহাতর কাহিনীও কতকটা এমনই। মেলা, উৎসব কমে যাওয়ায় এই ছৌ নাচ করে সংসার চালানো দায় হয়ে পড়েছিল। ঠিক সেই সময়ই সুমন্ত ইনস্টাগ্রাম রিলস বানাতে শুরু করেন। অযোধ্যা পাহাড়ের রুক্ষ প্রকৃতির পটভূমিতে মহিষাসুরের ছৌ মুখোশ আর রঙিন পোশাক পরা নাচের ভিডিওগুলো ইন্টারনেটে ঝড় তুলেছে। সুমন্ত মাহাতর শূন্যে ডিগবাজি খাওয়ার নিখুঁত ভঙ্গি দেখে চমৎকৃত হয় নেট দুনিয়া। চোখের নিমেষে ভাইরাল হয় সেই ভিডিওগুলো।
এমনকি সেই ভিডিও দেখে স্পেনের ডকুমেন্টারি নির্মাতারা সুমন্ত মাহাতর খোঁজ নিতে পুরুলিয়ায় ছুটে এসেছেন। স্মার্টফোনের ছোট্ট স্ক্রিনটা পুরুলিয়ার ধুলোমাখা ছৌ নাচকে বিদেশের দরবারে এক নতুন পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের এই উত্থানের আগে লোকশিল্পীদের আয়ের প্রধান উৎস ছিল স্থানীয় উৎসব বা সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন অনুষ্ঠান। সেখানে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট এজেন্সি বা প্রোমোটাররা শিল্পীদের নামমাত্র টাকা দিয়ে সিংহভাগটাই নিজেদের পকেটে পুরতেন। এখন সেই সমীকরণটা অনেকটাই বদলে গেছে। ইউটিউব বা ফেসবুক একটি শক্তিশালী ক্রিয়েটর ইকোনমি তৈরি করেছে। এখানে শিল্পী এবং দর্শকের মাঝে কোনও তৃতীয় পক্ষ নেই। চ্যানেল মনিটাইজেশন, ডিজিটাল কনসার্টের টিকিটিং এবং সরাসরি স্পনসরশিপের মাধ্যমে শিল্পীরা আজ আর্থিকভাবে অনেক বেশি স্বাধীন।
সেইসঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজেদের পেজ থাকায় আয়োজকরা এখন সরাসরি শিল্পীর সাথে যোগাযোগ করতে পারেন। এর ফলে এজেন্সির কমিশনের ফাঁদ অনেকটাই আলগা হয়েছে।
তবে এখানেও একটা বিপদের দিক তৈরি হয়েছে। প্রবীণ বা প্রত্যন্ত গ্রামের যে শিল্পীরা স্মার্টফোন ব্যবহার করতে পারেন না, তাঁরা অনেক সময় নতুন প্রজন্মের কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের শোষণের শিকার হচ্ছেন। অনেকেই গ্রামের বয়স্ক শিল্পীদের ভিডিও রেকর্ড করে নিজেদের চ্যানেলে ভিউ বাড়াচ্ছেন, অথচ লাভের কড়ি সেই শিল্পীর হাতে সেভাবে পৌঁছাচ্ছে না।
সোশ্যাল মিডিয়া চলে মানুষের মনোযোগের উপর ভিত্তি করে। অ্যালগরিদম ঠিক সেই কনটেন্টকেই বেশি মানুষের কাছে পৌঁছায় যা দ্রুত ও উত্তেজক হয়। এই শর্ত অনুসরণ করতে গিয়ে লোকশিল্পীরা নিজেদের পরিবেশনায় ব্যাপক পরিবর্তন আনতে বাধ্য হচ্ছেন। এর ফলে যে বাউল গানটি ধীর লয়ে শুরু হয়ে পনেরো মিনিট ধরে একটি আধ্যাত্মিক ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছাত, সেটিই এখন তিন মিনিটের চটুল গানে পরিণত হয়েছে।
গ্লোবাল অডিয়েন্সের মনোযোগ ধরে রাখতে ছৌ নাচের শুরুর ধীর লয়ের কাহিনী নির্মাণ পর্ব বাদ দিয়ে এখন সরাসরি পনেরো সেকেন্ডের যুদ্ধ ও ডিগবাজির রিলস বানানো হচ্ছে। বিশ্বায়নের ফলে একটি নির্দিষ্ট গ্লোবাল পপ কালচারের ছাঁচে লোকশিল্পকে ফেলার চেষ্টা চলছে। এর ফলে পুরুলিয়ার ছৌ এবং অন্য কোনও দেশের অ্যাক্রোবেটিক নাচের মধ্যে পার্থক্য করা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। এর ফলে এই লোকশিল্পগুলো নিজস্বতা হারিয়ে গিয়ে তা একটা উপর থেকে চাপানো অন্তঃসারশূন্য বিষয়ে পরিণত হচ্ছে।
একটা পরিষ্কার কথা জেনে রাখা প্রয়োজন- বাউল এবং ছৌ মোটেও নিছক বিনোদনের জন্য তৈরি হয়নি। মূলে রয়েছে গভীর দর্শন। বাউলের ভিত্তি হল নিগূঢ় দেহতত্ত্ব ও আত্মানুসন্ধান। আর ছৌ নাচের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে রামায়ণ-মহাভারত ও পুরাণের আখ্যান। কিন্তু বাণিজ্যিকীকরণের চাপে এই মূল দর্শনই আজ সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত। ভাইরাল হওয়ার তাগিদে বাউল গানের গভীর দেহতত্ত্বের পদগুলো বাদ দিয়ে কেবল রোমান্টিক বা চটুল লাইনগুলোতে ফোকাস করা হচ্ছে। পাশ্চাত্যের শ্রোতাদের মনোরঞ্জনের জন্য একতারার বদলে ঢুকছে সিন্থেসাইজার ও ইডিএম বিট। এর ফলে গেরুয়া বসন পরে যেটা মানুষের কাছে তুলে ধরা হচ্ছে সেটা আর যাই হোক বাউল থাকছে না। বাউলের ভেক ধরে কিছু একটা পৌঁছাচ্ছে!
এই প্রসঙ্গে প্রখ্যাত লোকসংস্কৃতি গবেষক প্রয়াত ড. সুধীর চক্রবর্তীর কথা উল্লেখ করা অত্যন্ত জরুরি। তিনি তাঁর বিভিন্ন লেখায় আক্ষেপ করে বলেছিলেন, আখড়ার বাউল যখন মঞ্চের বাউলে পরিণত হয় তখন তার আধ্যাত্মিক সাধনার মৃত্যু ঘটে। বাউল যখন ক্যামেরার সামনে কেবল পারফর্ম করার জন্য দাঁড়ায়, তখন তার ভেতরের সুরটাই হারিয়ে যায়।
ছৌ নাচের ক্ষেত্রেও পদ্মশ্রী প্রাপ্ত প্রবীণ গুরুরা প্রায়শই এই একই আক্ষেপ করেন। তাঁদের মতে, আজকালকার ছৌ নাচে বীররসের চেয়ে সার্কাসের প্রভাব অনেক বেশি! গল্পের গভীরতার চেয়ে শারীরিক কসরত দেখানোটাই যেন মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সবাই যে কেবল ভিউ আর লাইকের পেছনে ছুটছেন তা কিন্তু নয়। বাণিজ্যিক জোয়ারের ঝাপটা যেমন আছে, তেমনই এর পাশাপাশি ডিজিটাল মাধ্যমেই লোকশিল্পের বিশুদ্ধ রূপ সংরক্ষণের এক নীরব বিপ্লব ঘটে চলেছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই শিল্পগুলোর আদি রূপ বাঁচিয়ে রাখতে ডিজিটাল আর্কাইভগুলো এখন সবচেয়ে বড় ভরসা। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও লোকশিল্প গবেষকরা প্রত্যন্ত গ্রামে গিয়ে প্রবীণ শিল্পীদের সাক্ষাৎকার এবং পারফরম্যান্স অত্যন্ত যত্নের সাথে রেকর্ড করে রাখছেন। এগুলোর উদ্দেশ্য ভাইরাল হওয়া নয়। এগুলোর লক্ষ্য হল সংশ্লিষ্ট আর্ট ফর্মের খাঁটি প্রামাণ্য দলিল তৈরি করা।
বর্তমানে স্পটিফাই বা ইউটিউবে একাধিক শিক্ষামূলক পডকাস্ট তৈরি হচ্ছে। সেখানে বাউল দর্শনের দেহতত্ত্ব বা লালন সাঁইয়ের গানের আসল অর্থ নিয়ে গভীর আলোচনা হচ্ছে। এতে আধুনিক শিক্ষিত সমাজ বাউলের প্রকৃত দর্শনের সাথে পরিচিত হতে পারছে। স্বাধীন তথ্যচিত্র নির্মাতারা পুরুলিয়ার চড়িদা গ্রামে ছৌ মুখোশ তৈরির আদি পদ্ধতি নিয়ে দীর্ঘ তথ্যচিত্র বানাচ্ছেন। এই কাজগুলোও আন্তর্জাতিক স্তরে প্রদর্শিত হচ্ছে। যা বিশ্বের দরবারে বাংলার লোকশিল্পের অবিকৃত এবং সঠিক ইতিহাস তুলে ধরছে।
ডিজিটাল দুনিয়া বাংলার লোকশিল্পের সামনে যেমন এক বিশাল সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে, তেমনই ছুঁড়ে দিয়েছে এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। আন্তর্জাতিক পরিচিতি আর আর্থিক সচ্ছলতা শিল্পীদের মুখে হাসি ফুটিয়েছে ঠিকই, কিন্তু একইসঙ্গে শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ভয়টাও জাঁকিয়ে বসেছে। এই পরিস্থিতিতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে বিশ্বের দরবারে পৌঁছাতে হবে ঠিকই। তবে খেয়াল রাখতে হবে সেই গতির নেশায় যেন বাউল গানের আধ্যাত্মিকতা আর ছৌ নাচের আদি অকৃত্রিম আত্মা চিরতরে হারিয়ে না যায়।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
