

মুছে যেতে পারে সুন্দরবন! ছবি - AI
সমুদ্রপৃষ্ঠে জ্বলন্তর বৃদ্ধির ধাক্কায় সম্পূর্ণ মুছে যেতে পারে সুন্দরবন। ২০৫০ সালের আশেপাশে প্রায় অর্ধ কোটি জলবায়ু উদ্বাস্তু স্রোত আছড়ে পড়তে পারে কলকাতায়। কিন্তু কলকাতার নিজের আয়ুই তো আর বেশিদিন নয়!
সবে ভোরের আলো সবে ফুটতে শুরু করেছে। পাথরপ্রতিমার জি প্লটের যমুনা সর্দার ততক্ষণে কোমর সমান নোনা জলে নেমে পড়েছেন। হাতে একটা ছোট জাল। বাগদা চিংড়ির মীন ধরার। এই মীন বেচেই কোনরকমে জুটবে তিন সন্তানের দুবেলার খাবার। নদীর এই জলেই তিন বছর আগে একই রকম ভাবে মীন ও মাছ ধরতে এসে বাঘের পেটে যেতে হয়েছিল যমুনার স্বামীকে। তবুও ভয় পেয়ে ঘরে বসে থাকার যো নেই।পাপী পেট যে কথা শোনে না। তাই রোজ সেই জলেই নামতে হয় যমুনাকে।
যমুনাদের এই লড়াই কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সুন্দরবন থেকে শুরু করে সাগরের বিস্তীর্ণ উপকূলীয় অঞ্চলের লক্ষ লক্ষ মানুষের এটাই এখন রোজনামচা। প্রতি বছর সমুদ্রের জলস্তর বাড়ছে। আর সেই জলোচ্ছ্বাসের সঙ্গে প্রতিদিন একটু একটু করে তলিয়ে যাচ্ছে তাঁদের ভিটেমাটি, জমি আর বেঁচে থাকার শেষ সম্বল। বাংলার উপকূলীয় অঞ্চলের পরিস্থিতি এখনই এতটাই ভয়াবহ। আগামী দিনে কোনও স্থায়ী সমাধান না হলে এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলের ভবিষ্যৎ যে নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে ঢেকে যাবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম বড় অভিশাপ হল সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি। কিন্তু বাকি দুনিয়ার সঙ্গে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের একটা বড় তফাৎ রয়েছে। জলবায়ু সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক প্যানেল আইপিসিসি-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে সমুদ্রের জলস্তর গড়ে বছরে প্রায় ৩.৩ মিলিমিটার হারে বাড়ছে। কিন্তু বঙ্গোপসাগরের বুকে এই জলস্তর বৃদ্ধির হার বছরে ৫ মিলিমিটারেরও বেশি!
সুন্দরবন সহ বাংলার উপকূলীয় অঞ্চল এক ধরনের ফাঁদে পড়ে গিয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে নোনা জল বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে এখানকার ভূগর্ভস্থ মিষ্টি জলে টান পড়ছে। তার ফলে এখানকার মানুষ স্বাভাবিক মাত্রার চেয়েও বেশি গভীরতা থেকে ভূগর্ভস্থ মিষ্টি জল তুলছে বা তুলতে বাধ্য হচ্ছে। এবার ভূগর্ভস্থ জল অতিরিক্ত মাত্রায় তুলে নেওয়ায় এবং এটি সক্রিয় ব-দ্বীপ অঞ্চল হওয়ায় মাটির স্বাভাবিক সঙ্কোচনের ফলে, অর্থাৎ ভূতাত্ত্বিক কারণে গঙ্গার এই ব-দ্বীপ অঞ্চলে প্রতি বছর প্রায় ২ থেকে ৪ মিলিমিটার করে মাটি নিচের দিকে বসে যাচ্ছে।
একদিকে সমুদ্র ফুলেফেঁপে উঠছে আর অন্যদিকে ব-দ্বীপের মাটি ক্রমশ বসে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে বাংলার উপকূলে প্রকৃত জলস্তর বৃদ্ধির হার বছরে প্রায় ৮ মিলিমিটার! পৃথিবীর মধ্যে এটা অন্যতম সর্বোচ্চ। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে ঘোড়ামারা বা মৌসুনী দ্বীপের মতো এলাকাগুলোর উপর। এই দ্বীপগুলোর একটা বিরাট অংশ ইতিমধ্যেই মানচিত্র থেকে মুছে গেছে। অর্থাৎ সমুদ্রের জলের তলায় চলে গিয়েছে।
পূর্ব মেদিনীপুর এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিস্তীর্ণ উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ৪৫ লক্ষ মানুষের বাস। এই সকল মানুষের জীবন আর জীবিকার প্রায় ৮৫ শতাংশই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নদী এবং সমুদ্রের ওপর নির্ভরশীল।
এখানকার মানুষ মূলত গভীর সমুদ্রে ট্রলারে মাছ ধরে অথবা নদীর খাঁড়িতে ছোট নৌকায় করে মাছ ও কাঁকড়া ধরে। অনেকে আবার জঙ্গলে মধু সংগ্রহ করতে যায়। এর পাশাপাশি রয়েছে আমন ধানের এক ফসলি কৃষিকাজ। এদের দৈনন্দিন আয় পুরোপুরি জোয়ার-ভাঁটার সময়ের উপর নির্ভরশীল। অমাবস্যা বা পূর্ণিমার কোটাল নির্ধারণ করে এখানকার মৎস্যজীবীরা বা মৌলিরা কখন মাছ ধরতে বা জঙ্গলে যাবেন। এদের সংস্কৃতিও অরণ্য ও নদীভিত্তিক। বিপদের হাত থেকে বাঁচতে তারা হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে বনবিবি ও দক্ষিণরায়ের পুজো করেন। সমুদ্রের এই ইকোসিস্টেম বা বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস হলে শুধু যে এখানকার অর্থনীতি ধুলিস্যাৎ হয়ে যাবে তাই নয়।, হাজার বছরের একটা মিশ্র সহিষ্ণু সংস্কৃতিও চিরতরে হারিয়ে যাবে।
সমুদ্রের জলস্তর বাড়ার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে এখানকার কৃষিকাজ এবং পানীয় জলের ওপর। আয়লা, আমফান বা ইয়াসের মতো ঘূর্ণিঝড়ের সময় মাটির নদীবাঁধগুলো তাসের ঘরের মতো ভেঙে যায়। ফলে সমুদ্রের নোনা জল ঢুকে বিস্তীর্ণ কৃষিজমি ভাসিয়ে দেয়। নোনা জল একবার জমিতে ঢুকলে তিন থেকে পাঁচ বছরের জন্য সেই জমির উর্বরতা শূন্য হয়ে যায়। শুধু তাই নয়, ঢুকে পড়া নোনা জল মিশে মিষ্টি জলের পুকুরগুলোও নোনা হয়ে যায়। ফলে এক কলসি পানীয় জলের জন্য এখানকার গ্রামের মহিলাদের প্রতিদিন কয়েক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা নোনা জলে দাঁড়িয়ে চিংড়ির মীন ধরার কারণে যমুনার মতো অসংখ্য উপকূলীয় মহিলার হাত ও পায়ে দগদগে ঘা হয়ে গেছে। সুন্দরবন অঞ্চলের মহিলাদের মধ্যে প্রজননতন্ত্রের মারাত্মক সংক্রমণ এখন প্রায় মহামারীর আকার নিয়েছে। এদিকে এরা এতটাই আর্থিকভাবে দুর্বল যে চিকিৎসার সামর্থ্যই প্রায় থাকে না। তবুও তাঁদের বাধ্য হয়ে প্রতিদিন ওই নোনা জলেই নামতে হয়।
যারা প্রকৃতির এই আগ্রাসনের সঙ্গে লড়াইয়ে পেরে ওঠেন না তাদের জীবন আরও মর্মান্তিক। এই যেমন, ৫২ বছরের নিতাই দাসের আদি বাড়ি ছিল ঘোড়ামারা দ্বীপে। একটা সময় নিজের ছোট ডিঙি নৌকা আর জাল নিয়ে বঙ্গোপসাগরের মোহনায় মাছ ধরতেন। নদীর চরে পৈতৃক জমিও ছিল।
কিন্তু আজ নিতাই দাস একজন জলবায়ু উদ্বাস্তু। ইয়াসের রাতে প্রবল জলোচ্ছ্বাসে চোখের সামনে তাঁর শেষ সম্বল নৌকাটি টুকরো টুকরো হয়ে ভেসে যায়। নদীর ভাঙনের ফলে ঢুকে আসা জলোচ্ছ্বাস তাঁর ভিটেমাটিও গিলে খায়। আজ তিনি বাধ্য হয়ে কাকদ্বীপ স্টেশনের বাইরে প্লাস্টিক মোড়া একটা ঝুপড়িতে থাকেন এবং ভ্যানরিকশা চালান। নিতাই আক্ষেপ করে বলছিলেন, "নদী আমাদের মা ছিল। আমাদের অন্ন জোগাত। এখন সেই নদীই রাক্ষুসী হয়ে সব গিলে খাচ্ছে। যে হাতে আমি জাল বুনতাম সেই হাতে আজ বাধ্য হয়ে শহরের মানুষের মাল টানি। নিজস্ব বলতে আর কিছু রইল না। আমরা তো জলের মানুষ। জলই যদি বেইমানি করে তবে কোথায় যাব!"
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞান ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘ দশক ধরে এই অঞ্চল নিয়ে কাজ করছেন। তাঁদের মতে, পরিস্থিতি ইতিমধ্যেই হাতের বাইরে চলে যেতে শুরু করেছে। দুর্বল মাটির বাঁধ দিয়ে এই জলোচ্ছ্বাস রোখা আর সম্ভব নয়। কাঠ পাচারকারীদের উৎপাত, মানুষের অসচেতনতা সহ নানান কারণে এখানকার ম্যানগ্রোভ অরণ্য ধ্বংস হওয়ার ফলে বাঁধ ভাঙার তীব্রতা আরও বেড়েছে। সমুদ্রের উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে আগামী দিনে ঘূর্ণিঝড়ের প্রবণতা ও ধ্বংস ক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে যাবে বলে তাঁরা সতর্ক করেছেন।
আজকের পরিস্থিতির যদি কোনও পরিবর্তন না হয়, তবে আগামী কয়েক দশকে বাংলার উপকূলীয় অঞ্চল এক অভাবনীয় ধ্বংসলীলার সাক্ষী হতে চলেছে। ২০৫০ সালের মধ্যে জলস্তর আরও বাড়লে জলোচ্ছ্বাস এবং ভূমিক্ষয়ের কারণে সাগর, ঘোড়ামারা বা মৌসুনীর মতো দ্বীপগুলো পুরোপুরি বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে। কৃষিকাজ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাবে। লাখ লাখ মানুষ রাতারাতি ভিটেমাটি হারিয়ে জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হবেন। কাজের খোঁজে কর্মক্ষম বাকি পুরুষরাও ভিনরাজ্যে পাড়ি দেবেন। আর বাকিরা কলকাতা বা হাওড়ার মতো শহরের বস্তিগুলোতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হবেন। নিজস্ব পেশা হারিয়ে এই স্বাধীন মানুষগুলো শহরের বুকে রিকশাচালক বা দিনমজুরের কাজ করতে বাধ্য হবেন।
২১০০ সালের চিত্রটা আরও বেশি শিউরে ওঠার মতো হতে চলেছে বলে বিশেষজ্ঞদের একাংশের দাবি। কার্বন নির্গমন কমানো না গেলে জলস্তর বর্তমানের চেয়ে প্রায় এক থেকে দেড় মিটার বৃদ্ধি পেতে পারে। ওই পরিস্থিতিতে কোনও সুপার সাইক্লোন আঘাত হানলে ৫ থেকে ৬ মিটার উঁচু জলোচ্ছ্বাস তৈরি হবে। তখন দক্ষিণ ২৪ পরগনার কোনও বাধা দেওয়ার মতো জায়গা বা বাফার জোন অবশিষ্ট থাকবে না। জলোচ্ছ্বাস সরাসরি কলকাতা ও তার সংলগ্ন অঞ্চলে আঘাত করবে।
কলকাতার নিকাশি ব্যবস্থা এমনিতেই জোয়ার ভাঁটার উপর নির্ভরশীল। ফলে সমুদ্রের জলস্তর বাড়লে নদীর জলস্তরও বাড়বে। এতে কলকাতার বিস্তীর্ণ অংশ স্থায়ীভাবে জলের তলায় চলে যাওয়ার তীব্র সম্ভাবনা তৈরি হবে।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
