

মহাকাশে নতুন প্রতিযোগিতা। ছবি - AI
চাঁদ ও মঙ্গল কোনো দেশের ব্যক্তিগত মালিকানাধীন না হলেও, সেখানে স্থায়ী উপস্থিতি ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর (যেমন স্পেসএক্স) মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে। চাঁদের দক্ষিণ মেরুর বরফ ব্যবহার করে রকেটের জ্বালানি তৈরি এবং একে মহাকাশের রসদ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলে পরবর্তী ধাপে মঙ্গলে মানব বসতি স্থাপনের লক্ষ্যেই এগোচ্ছে উভয় পক্ষ। যে পক্ষ প্রথম এই পরিকাঠামো ও পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলবে, ভবিষ্যতের আন্তঃগ্রহ অভিযানের আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন মূলত তারাই নির্ধারণ করবে।
একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে মহাকাশ বিজ্ঞান আর শুধু গ্রহ-নক্ষত্র দেখার কৌতূহলে আটকে নেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এখন চলছে এক অভূতপূর্ব প্রতিযোগিতা। এই দৌড় চাঁদের মাটিতে স্থায়ী আস্তানা গড়া এবং সেখান থেকে লাল গ্রহ মঙ্গলে পৌঁছানোর।
১৯৬৭ সালের আন্তর্জাতিক ‘আউটার স্পেস ট্রিটি’ অনুযায়ী মহাকাশের কোনো গ্রহ বা উপগ্রহে কোনো দেশ নিজের সার্বভৌমত্ব বা মালিকানা দাবি করতে পারে না। মহাকাশ সবার, সমগ্র মানবজাতির। কিন্তু আইন দিয়ে তো আর প্রভাব খাটানো আটকানো যায় না! তাই বর্তমান প্রতিযোগিতার আসল লক্ষ্য কোনো ভূখণ্ড জয় নয়; বরং কৌশলগত প্রাকৃতিক সম্পদের নিয়ন্ত্রণ, মহাকাশ পরিকাঠামো তৈরি এবং ভবিষ্যতের গভীর মহাকাশ অভিযানের নিয়মকানুন নিজেদের মতো করে লেখা।
এই অভিযানের প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হল চাঁদ, বিশেষ করে চাঁদের রহস্যময় দক্ষিণ মেরু। এখানে অভিযান চালানোর মূল কারণ শুধু বিজ্ঞানের আবিষ্কার নয়, বরং টিকে থাকার রসদ খোঁজা। দক্ষিণ মেরুর গভীর খাদের অন্ধকারে লুকিয়ে আছে জমাট বরফের বিপুল ভাণ্ডার।
এই বরফ গলিয়ে মহাকাশচারীদের পানীয় জলের ব্যবস্থা যেমন করা যাবে, তেমনই সেই জলকে ভেঙে তৈরি করা সম্ভব তরল হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন। এই হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনই হল রকেটের আসল চালিকাশক্তি। ফলে চাঁদের কম মাধ্যাকর্ষণকে কাজে লাগিয়ে সেখান থেকেই জ্বালানি তৈরি করে রকেট পাঠানো যাবে মহাকাশের আরও গভীরে, যা পৃথিবী থেকে উৎক্ষেপণের খরচের তুলনায় বহু গুণ সাশ্রয়ী।
যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রজোটের পরিকল্পনা: আর্টেমিস–২ মিশনের সফল চন্দ্র পরিক্রমার পর নাসা এখন ২০২৮ সালের ‘আর্টেমিস–৪’ মিশনের মাধ্যমে আবারও চাঁদের মাটিতে মানুষ নামানোর রূপরেখা তৈরি করছে। এর পাশাপাশি মহাকাশে নিজেদের প্রভাব বজায় রাখতে ও অভিযানের আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি তৈরি করতে আমেরিকা নেতৃত্ব দিচ্ছে ‘আর্টেমিস অ্যাকর্ডস’-এর, যেখানে ইতোমধ্যেই বহু দেশ যুক্ত হয়েছে।
চীন ও রাশিয়ার যৌথ উদ্যোগ: চীনও পিছিয়ে নেই। চায়না ম্যানড স্পেস এজেন্সি ২০৩০ সালের মধ্যেই চাঁদের মাটিতে নিজস্ব মহাকাশচারী নামানোর চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর সঙ্গে রাশিয়া ও অন্যান্য অংশীদার দেশগুলোকে সঙ্গে নিয়ে তারা গড়ে তুলছে ‘ইন্টারন্যাশনাল লুনার রিসার্চ স্টেশন’ (ILRS), যা রোবোটিক ও মানবচালিত এক দীর্ঘমেয়াদী চন্দ্র গবেষণা কেন্দ্র।
চাঁদ যদি হয় মহাকাশযাত্রার রিহার্সাল মঞ্চ, তবে লাল গ্রহ মঙ্গল হল মূল লড়াইয়ের মঞ্চ। দীর্ঘমেয়াদী আন্তঃগ্রহ অভিযানের ক্ষেত্রে মঙ্গলের মাটি ছুঁয়ে দেখাই এখন শক্তিধর দেশগুলোর আসল স্বপ্ন।
মঙ্গলের মাটির নমুনা সংগ্রহের দৌড়: চীনের ‘তিয়ানওয়েন–৩’ মিশনটি ২০২৮ সালের দিকে উৎক্ষেপণের লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে, যাতে ২০৩১ সালের মধ্যে মঙ্গলের মাটির নমুনা সংগ্রহ করে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা যায়। এটি সফল হলে চীনই হবে বিশ্বের প্রথম দেশ, যারা মঙ্গলের মাটির আসল নমুনা সরাসরি পৃথিবীতে এনে পরীক্ষা করবে।
নাসার মানবচালিত প্রযুক্তি: নাসা এখন দীর্ঘমেয়াদী মানব অভিযানের উপযোগী প্রযুক্তি তৈরিতে জোর দিচ্ছে। চাঁদের পরিবেশকে ল্যাবরেটরি হিসেবে ব্যবহার করে তারা এমন লাইফ-সাপোর্ট সিস্টেম এবং মহাকাশযান তৈরি করছে, যা ২০৩০-এর দশকের শেষের দিকে নভোচারীদের মঙ্গলে নিয়ে যাওয়ার পথ সুগম করবে।
বেসরকারি মহাকাশ সংস্থার স্বপ্ন: এই দৌড়ে রাষ্ট্রগুলোর পাশাপাশি সবচেয়ে বড় আলোড়ন তুলেছে স্পেসএক্সের মতো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো। তাদের তৈরি ‘স্টারশিপ’-এর মতো বিশালাকার যানগুলো ভবিষ্যতে বিপুল পরিমাণ মালপত্র ও যাত্রী নিয়ে মঙ্গলে যাওয়ার উপযোগী করে নকশা করা হচ্ছে, যার চূড়ান্ত লক্ষ্য অন্য গ্রহে মানুষের স্বয়ংসম্পূর্ণ কলোনি তৈরি করা।
আইন অনুযায়ী চাঁদ বা মঙ্গল কোনো দেশের ব্যক্তিগত সম্পত্তি হতে পারবে না ঠিকই, তবে বাস্তবতা হল—যাঁরা প্রথম চাঁদের মাটিতে জ্বালানি কেন্দ্র, নির্ভরযোগ্য পরিবহন ব্যবস্থা এবং বসবাসের উপযোগী পরিবেশ গড়ে তুলবে, ভবিষ্যতের মহাকাশযাত্রার নীতি ও পরিচালন ব্যবস্থা তাদের হাতেই নিয়ন্ত্রিত হবে।
পৃথিবীর বুক ছাড়িয়ে অন্য গ্রহে পা রাখার এই রোমাঞ্চকর যুগে মানুষ কীভাবে বাস করবে, কোন প্রযুক্তি ব্যবহার করবে আর কোন নিয়মে জীবন চলবে—সেই মানদণ্ড নির্ধারিত হচ্ছে আজকের এই প্রতিযোগিতা থেকেই।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অভিজ্ঞ, সংবেদনশীল, অনুসন্ধিৎসু এবং সমকালীন ও আগামী সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কর্মঠ কিছু তরুণ-তরুণী নিয়ে দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক। ভারতীয় বাঙালি সংস্কৃতির পথ ধরে গ্লোবাল লেন্স দিয়ে দুনিয়াকে দেখে সকলের সামনে পরিবেশন করাই তাঁদের লক্ষ্য। মিলেনিয়াল-জেনX-এর অভিজ্ঞতা ও জেনZ-র উৎসাহর যথাযথ রসায়নে গঠিত 'দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক'।
