২৭শে অক্টোবর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
গ্রিন কার্ড বন্ধ: ভারতীয় IT কর্মীদের ভবিষ্যৎ কোন পথে?

মার্কিন মুলুকের দরজা কি ভারতীয়দের জন্য স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাবে? প্রতীকী ছবি - AI

গ্রিন কার্ড বন্ধ: ভারতীয় IT কর্মীদের ভবিষ্যৎ কোন পথে?

tfa logo icon

সংক্ষিপ্তসার

গ্রিন কার্ডে ট্রাম্পের কোপ এবং গ্লোবাল ভিসা নীতিতে বদল: ভারতীয় অর্থনীতি এর ধাক্কা সামলাতে পারবে তো?

নিজের দেশের নাগরিকদের কাজের সুযোগ বৃদ্ধি করতে লোভনীয় গ্রিন কার্ড পলিসিতে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে ট্রাম্প প্রশাসন। মার্কিন মুলকের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় আছে ভারতের একেবারে প্রথম সারির পাঁচটি আইটি কোম্পানি। ফলে কিছুদিনের মধ্যেই ভারতীয় দক্ষ কর্মীদের একটা বড় অংশের মার্কিন মুলক থেকে দেশে ফিরে আসা প্রায় অনিবার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এত বিপুল সংখ্যক দক্ষ কর্মীর চাপ আদৌ সামলাতে পারবে তো ভারতীয় অর্থনীতি?

মূল বিষয়

বিদেশে, বিশেষত পশ্চিমা দুনিয়ার দেশগুলোতে গিয়ে পড়াশোনা করা বা চাকরি পাওয়ার স্বপ্ন বহু ভারতীয়ের থাকে। কিন্তু সেই সযত্ন লালিত স্বপ্ন জুড়ে এখন কালো মেঘের ঘনঘটা। এই অক্টোবরেই ট্রাম্প প্রশাসন নতুন ভীষণ নীতি (পড়ুন গ্রিন কার্ড পলিসি) ঘোষণা করেছে, যা ভারতীয় আইটি পেশাদারদের জন্য এক বিশাল ধাক্কা হয়ে দেখা দিয়েছে।

তবে শুধু আমেরিকাই নয়। কানাডা, ব্রিটেন বা অস্ট্রেলিয়ার মতো প্রথম বিশ্বের দেশগুলোও তাদের ভিসা এবং অভিবাসন নীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনছে বা এনেছে। এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা আরও কড়াকড়ি ও রক্ষণশীল করে তোলা হয়েছে। সব মিলিয়ে এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতির মুখোমুখি ভারতীয় মেধা। এর প্রভাব শুধু ব্যক্তি জীবনেই সীমাবদ্ধ নেই। গোটা ভারতীয় অর্থনীতি এবং কাজের বাজারের সমীকরণও এর দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে।

গ্রিন কার্ডের স্বপ্নে ট্রাম্পের 'চপেটাঘাত'

আমেরিকার গ্রিন কার্ড পাওয়া এমনিতেই অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এবার সেই প্রক্রিয়ায় কার্যত তালা ঝুলিয়ে দিল মার্কিন শ্রম দফতর। আটটি বড় প্রযুক্তি সংস্থার পার্মানেন্ট লেবার সার্টিফিকেশন প্রোগ্রাম বা PERM স্থগিত করা হয়েছে। এই সংস্থাগুলোর মধ্যে রয়েছে ভারতের- টিসিএস, ইনফোসিস, উইপ্রো, এইচসিএল এবং কগনিজেন্ট। এছাড়াও তালিকায় আছে মাইক্রোসফট, অ্যাডোবি এবং অ্যাকসেঞ্চারের মতো মার্কিন সংস্থা। এই প্রসঙ্গে মার্কিন প্রশাসনের দাবি, এই সংস্থাগুলো বছরের পর বছর ধরে সস্তায় বিদেশি কর্মী দিয়ে কাজ করিয়ে নিচ্ছে। এর ফলে ন্যায্য চাকরির অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে মার্কিনিরা।

আমেরিকার গ্রিন কার্ড অর্থাৎ H-1B ভিসার মেয়াদ সাধারণত ছয় বছর হয়। এরপর মেয়াদ বাড়াতে গেলে PERM অনুমোদন থাকাটা সবার আগে দরকার হয়। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের শ্রম দফতর নির্দিষ্ট আটটি সংস্থার ক্ষেত্রে আপাতত এই প্রক্রিয়া বন্ধ ঘোষণা করায়, বহু ভারতীয় কর্মীকে কিছুদিনের মধ্যেই দেশে ফিরে আসতে হতে পারে। বিশেষ করে যাদের ছয় বছরের মেয়াদ শেষের দিকে তারা আর নতুন করে এই মুহূর্তে H-1B ভিসার জন্য আবেদনই করতে পারবেন না। ফলে দেশে ফিরে আসা ছাড়া আর কোনও পথ নেই। এছাড়া এই পরিস্থিতিতে নতুন করে কেউ মার্কিন মুলুকে স্থায়ী বসবাসের স্বপ্ন দেখতেও ভয় পাচ্ছেন। যার পরিণতিতে হাজার হাজার আইটি কর্মীর কেরিয়ার কার্যত মাঝপথে আটকে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।

কানাডা থেকে অস্ট্রেলিয়া: বিশ্বজুড়ে ভিসা নীতির কড়াকড়ি

আমেরিকা তো বটেই, ভিসা নীতি নিয়ে অন্যান্য দেশের ছবিটাও বেশ চিন্তায় ফেলার মতো। কানাডার স্টুডেন্ট ডিরেক্ট স্ট্রিম বা দ্রুত ভিসা পাওয়ার সুবিধা এখন অতীত। ফান্ড বা আর্থিক সক্ষমতা দেখানোর পরিমাণ অনেকটাই বাড়িয়ে ২২ হাজার ৮৯৫ কানাডিয়ান ডলার করা হয়েছে। সাধারণ কোর্সের ক্ষেত্রে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ওয়ার্ক পারমিট পাওয়া রীতিমতো কঠিন হয়ে গেছে। স্বামী বা স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার সুযোগও অত্যন্ত সীমিত করা হয়েছে। কেবলমাত্র পিএইচডি বা রিসার্চ ওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত থাকলে তবেই স্বামী বা স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়া যাবে। আর নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে মাস্টার ডিগ্রি যারা করছেন, তাদের এই ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে।

ব্রিটেনের অবস্থাও প্রায় একই রকম। সেখানেও ফান্ড দেখানোর পরিমাণ বেড়েছে অনেকটাই। ভারতীয় মুদ্রায় এই বৃদ্ধির অঙ্ক বছরের প্রায় ১৫-২০ লক্ষ টাকা! এর পাশাপাশি পড়াশোনা শেষে ব্রিটেনে থেকে কাজের সুযোগ বা গ্র্যাজুয়েট রুটের মেয়াদ কমানোর পরিকল্পনাও চলছে পুরোদমে। এর ফলে এডুকেশন লোন নিয়ে পড়তে যাওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। কারণ পড়াশোনা শেষে পশ্চিমা দুনিয়ার সংশ্লিষ্ট দেশে কাজ করার সুযোগ না পেলে এই লোন শোধ করার ক্ষেত্রে এক রকমের অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে। ব্রিটেনেও একমাত্র পিএইচডি বা রিসার্চের ছাত্রছাত্রীরাই এখন থেকে পরিবার সাথে নেওয়ার সুযোগ পাবেন।

অস্ট্রেলিয়া স্টুডেন্ট ভিসায় কড়াকড়ি আনতে জেনুইন স্টুডেন্ট টেস্ট চালু করেছে। টেম্পোরারি গ্র্যাজুয়েট ভিসার জন্য সর্বোচ্চ বয়সসীমা এক ধাক্কায় কমিয়ে ৩৫ বছর করা হয়েছে। ফলে একটু বেশি বয়সে যারা নতুন করে কেরিয়ার গড়ার জন্য পড়তে যাচ্ছেন তারা মারাত্মক বিপাকে পড়ছেন।

অবশ্য জার্মানির মতো দেশ কিছুটা হলেও আশার আলো দেখাচ্ছে। তারা দক্ষ পেশাদারদের জন্য চান্সেনকার্টে বা অপরচুনিটি কার্ড চালু করেছে। এটি একটি পয়েন্ট ভিত্তিক সিস্টেম, যার সাহায্যে দক্ষ পেশাদাররা জার্মানিতে গিয়ে এক বছর পর্যন্ত চাকরি খোঁজার সুযোগ পাবেন।

আরও পড়ুন
হলদেটে পোস্ট কার্ড বন্দি স্মৃতির নস্টালজিয়া
ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ও স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমে প্রবাসী ভারতীয়দের রমরমা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তির হাত ধরে পর্যটনের নতুন দিগন্ত

পেশাদার ও শিক্ষার্থীদের উপর প্রভাব

ভিসা নীতি ও ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে এই সার্বিক পরিবর্তনের ফলে ভারতীয় শিক্ষার্থীদের উপর ব্যাপক আর্থিক ও মানসিক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। অনেকেই ব্যাঙ্ক থেকে মোটা অঙ্কের ঋণ নিয়ে বিদেশে পড়তে যান। কিন্তু ওয়ার্ক পারমিটের কড়াকড়ির কারণে পড়াশোনা শেষে চাকরি জুটবে কি না তা নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। পরিবার নিয়ে বিদেশে যাওয়ার সুযোগ কমে যাওয়ায় অনেকেই এখন আর ব্রিটেন বা কানাডামুখী হতে চাইছেন না।

এই পরিস্থিতিতে ভারতীয় ছাত্রছাত্রীদের চিরাচরিত গন্তব্য বদলে বর্তমানে পছন্দের দেশ হয়ে উঠছে আয়ারল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি সহ ইউরোপের অন্যান্য দেশ। তবে যারা আইটি সেক্টরে কাজ করেন তাদের রাতের ঘুম ভালো হওয়ার মতো খবর কোনও দিক থেকেই নেই।

ভারতীয় অর্থনীতিতে নতুন সমীকরণ

এই ঘোরতর নেতিবাচক পরিস্থিতির মধ্যেও ভারতীয় অর্থনীতির জন্য বেশ কিছু ইতিবাচক দিক লুকিয়ে আছে বলে অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করছেন। তাঁরা এই পরিস্থিতিকে আক্ষরিক অর্থেই শাপে বর বলে অভিনীত করেছেন। তার কারণগুলো হল-

মার্কিন মুলুকে গ্রিন কার্ড নিয়ে নতুন নীতির ফলে ভারতে মেধা ফিরে আসা বা ব্রেন গেইন খুব দ্রুত শুরু হতে পারে। আমেরিকার ভিসা জটিলতায় বাধ্য হয়ে অনেক অত্যন্ত দক্ষ ও অভিজ্ঞ আইটি পেশাদার দেশে ফিরে আসবেন। এই মেধাগুলো ভারতের নিজস্ব স্টার্টআপ এবং আইটি ইকোসিস্টেমকে আরও শক্তিশালী করবে। সিলিকন ভ্যালির অভিজ্ঞতা দেশের মাটিতে কাজে লাগবে।

এছাড়া অফশোরিং বৃদ্ধি এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। আমেরিকায় সস্তায় ভারতীয় কর্মী নিয়ে যাওয়ার পথ বন্ধ হলে আইটি কোম্পানিগুলো বাধ্য হয়ে ভারত থেকেই প্রজেক্টের কাজ করাবে। বিদেশি সংস্থাগুলোর গ্লোবাল ক্যাপাবিলিটি সেন্টারগুলো আরও বড় হবে। ফলে দেশের মাটিতেই প্রচুর কর্মসংস্থান তৈরি হবে। তবে এর নেতিবাচক দিকও কম নয়-

তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতীয় আইটি কোম্পানিগুলোর আয়ে বড়সড় ধাক্কা লাগতে পারে। কারণ আমেরিকায় অন সাইট প্রজেক্টের জন্য তাদের চড়া বেতনে স্থানীয় মার্কিন কর্মী নিয়োগ করতে হবে। এর ফলে তাদের পরিচালন ব্যয় বাড়বে এবং মুনাফা কমবে।

এছাড়া প্রবাসী ভারতীয়রা প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠান। তাদের একটা বড় অংশ যদি দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হন তবে রেমিট্যান্সের পরিমাণ কমবে। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে ভারতের বিদেশি মুদ্রার ভাণ্ডারে।

তাছাড়া ভারতীয় অর্থনীতি এবং কাজের বাজারের বর্তমান যা অবস্থা, তাতে একসঙ্গে এতজন দক্ষ পেশাজীবী বিদেশ থেকে ফিরে এলে তাদের নতুন করে নিয়োগ করা এবং এই ধাক্কা সামলানো আদৌ কতটা সম্ভব হবে তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতিবিদদের একাংশ।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
কৌস্তভ ভৌমিক
কৌস্তভ ভৌমিক

কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য