

বাংলায় রাজবাড়ি স্টে কেন্দ্রিক পর্যটন বাড়ছে। ছবি - AI
হেরিটেজ ট্যুরিজমের সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছে পুরনো বনেদি বাড়িগুলোর রূপান্তর ঘটিয়ে সেখানে গড়ে ওঠা লাক্সারি স্টে। এক্ষেত্রে ঐতিহ্যবাহী জমিদার বা রাজবাড়িগুলোর বহিরঙ্গের কাঠামো এবং আভিজাত্য যতটা সম্ভব ধরে রেখেই সেগুলোকে বিলাসবহুল থাকার জায়গায় পরিণত করা হচ্ছে। তারই হাতছানিতে ছুটে আসছে বাঙালি।
গোটা সপ্তাহের ব্যস্ততা ও মানসিক ক্লান্তি দূর করতে অনেকেই গিয়ে আজকাল শনি-রবিবারের প্রায় ছুটিতে বেরিয়ে পড়ছেন। কিন্তু ইচ্ছে থাকলেও তো এক্ষেত্রে যখন তখন পাহাড় বা সমুদ্রে গিয়ে হাজির হওয়া সম্ভব নয়। আর তাই কর্পোরেট বাঙালি পর্যটকদের সপ্তাহান্তের গন্তব্যে এখন প্রবলভাবে জায়গা করে নিচ্ছে বাংলার আনাচে কানাচে ছড়িয়ে থাকা পুরনো রাজবাড়ি আর জমিদার বাড়িগুলো।
একসময় কালের নিয়মে জরাজীর্ণ হয়ে পড়ছিল এইসব বনেদি বাড়িগুলোর বিশাল দালান থেকে শুরু করে গোটা কাঠামো। কিন্তু বর্তমানে সেই ভাঙাচোরা ইটের পলেস্তারা খসা প্রাসাদগুলোই সেজে উঠেছে নতুন রূপে। বিলাসবহুল হেরিটেজ স্টে হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে এগুলো বাংলার পর্যটন মানচিত্রে রীতিমতো বিপ্লব এনেছে। এই রাজবাড়িগুলো পর্যটকদের কাছে কেবল থাকার জায়গা নয়। একইসঙ্গে এগুলো ইতিহাসকে ছুঁয়ে দেখার রোমাঞ্চও বটে।
সমুদ্র বা পাহাড় কেন্দ্রিক গতানুগতিক পর্যটনের বাইরে বেরোচ্ছে বাঙালি। হেরিটেজ ট্যুরিজম এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। এর ফলে হুগলি, বর্ধমান, মুর্শিদাবাদ বা দক্ষিণ ২৪ পরগনার মতো জেলাগুলো বাংলার পর্যটনের মূল স্রোতে উঠে এসেছে। এক্ষেত্রে একটি শতবর্ষ প্রাচীন একটি বাড়িতে থাকার মধ্যে যে রহস্য এবং পুরনো গল্প জড়িয়ে থাকে, তা আধুনিক পাঁচতারা হোটেলে মেলে না। ঘুরতে গিয়ে মানুষ এখন অতীতকেও ছুঁতে চায়।
এই ধরনের পর্যটনে মূলত শহরের উচ্চ মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্ত শ্রেণির মানুষের আগ্রহ সবচেয়ে বেশি। কর্পোরেট পেশাজীবী, যারা শহরের যান্ত্রিক কোলাহল থেকে দূরে রুচিশীল পরিবেশে সময় কাটাতে চান, তারা এই রাজবাড়িগুলোতে ভিড় জমাচ্ছেন। এর পাশাপাশি প্রবাসী বাঙালিরা নিজেদের শিকড়ের স্বাদ পেতেও এখানে আসেন। ইতিহাস বা ফটোগ্রাফি নিয়ে উৎসাহী তরুণ প্রজন্মও এই ভ্রমণের প্রতি প্রবলভাবে আকৃষ্ট হচ্ছে। ডেস্টিনেশন ওয়েডিং বা প্রি ওয়েডিং শুটের জন্যও হেরিটেজ প্রপার্টিগুলো এখন চাহিদার শীর্ষে অবস্থান করছে। সোশ্যাল মিডিয়ার ভিজ্যুয়াল সংস্কৃতিও এখানে বড় ভূমিকা পালন করে। রাজবাড়ির বিশাল উঠোন বা সাবেক সাজপোশাকের ছবি ফ্রেমবন্দি করার সুযোগ পর্যটকদের টেনে আনে।
হেরিটেজ ট্যুরিজম মানে শুধু রাজবাড়িতে রাত্রিযাপন নয়। বাংলার আনাচে কানাচে ছড়িয়ে থাকা আরও নানা উপাদান এর অন্তর্ভুক্ত। কলকাতার ডালহৌসি চত্বর, উত্তর কলকাতার সাবেক গলি, চিৎপুর এবং বটতলার পুরনো ছাপাখানা কিংবা গঙ্গার ঘাটের পুরনো গুদামঘরগুলো নিয়ে আয়োজিত হেরিটেজ ওয়াক এখন অত্যন্ত জনপ্রিয়। ফরাসি উপনিবেশ চন্দননগর, শ্রীরামপুরের ড্যানিশ স্থাপত্য বা ব্যান্ডেলের পর্তুগিজ ইতিহাসও এই পর্যটনের বড় অংশ।
বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুর বা পূর্ব বর্ধমানের কালনার টেরাকোটা মন্দিরগুলো বাংলার নিজস্ব স্থাপত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। শুধু মন্দির দর্শন করতেই এখানে পর্যটকরা ছুটে আসেন, এমনটা ভাবা ভুল হয়ে যাবে। এর পেছনের ইতিহাস এবং নির্মাণশৈলী জানার আগ্রহেও বহু মানুষ এখানে আসেন। এর পাশাপাশি শতবর্ষ প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির দোকানগুলো কিংবা হারিয়ে যাওয়া পুরনো দিনের খাঁটি বাঙালি রান্নার স্বাদ নেওয়াও হেরিটেজ ট্যুরিজমের একটি বড় দিক।
শিল্পগ্রাম পর্যটনও এখন বেশ সাড়া ফেলেছে। পশ্চিম মেদিনীপুরের পিংলায় পটচিত্র, পুরুলিয়ার চড়িদা গ্রামে ছৌ মুখোশ তৈরির প্রাচীন ধারা বা বর্ধমানের ডোকরা শিল্পীদের গ্রামে গিয়ে তাদের কাজ দেখাটাও হেরিটেজ পর্যটনেরই অংশ।
পুরনো জমিদার বা রাজবাড়িকে হোম স্টে বানিয়ে ইতিহাসের সম্পূর্ণ পুনরুজ্জীবন কি আদৌ সম্ভব? সত্যি বলতে এটি মূলত একটি নান্দনিক এবং স্থাপত্যগত পুনরুজ্জীবনের বেশি কিছু নয়। কালের নিয়মে ধূলিস্যাৎ হতে বসা বিশাল দালান বা পুরনো আসবাবপত্রগুলো এই উদ্যোগের ফলে সংস্কার করে বাঁচিয়ে রাখা যাচ্ছে। তৎকালীন আর্থসামাজিক কাঠামো বা জমিদার প্রথার নেতিবাচক দিকগুলোকে এখানে স্বভাবতই বাদ দিয়ে কেবল তার জাঁকজমকটুকু সংরক্ষণ করা হয়। তবে তার সাংস্কৃতিক দিক এই প্রক্রিয়া সংরক্ষণ করা স্বাভাবিকভাবেই সম্ভবপর নয়।
সাধারণ মানুষের কাছে এর গুরুত্ব মূলত নস্টালজিয়া এবং রোমান্টিসিজমের। পর্যটকরা এখানে এসে সাবেক আমলের বাবুদের মতো কয়েকটা দিন কাটানোর সুযোগ পান। পুরনো আমলের পালঙ্কে ঘুমানো বা কাঁসার থালায় খাওয়ার মধ্যে দিয়ে তারা ফেলে আসা এক রাজকীয় সময়ের সাথে একাত্ম বোধ করেন।
অন্যদিকে ইতিহাসবিদ বা গবেষকদের কাছে এর গুরুত্ব সম্পূর্ণ ভিন্ন। তারা এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখেন। কারণ এর ফলে ঐতিহাসিক ইমারতগুলো অন্তত প্রোমোটারদের হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে। পুরনো স্থাপত্যশৈলী বা তৎকালীন রুচি নিয়ে গবেষণার জন্য এই সংরক্ষিত বাড়িগুলো জীবন্ত আর্কাইভ হিসেবে কাজ করে। গবেষকরা জানেন, এই পরিবেশ অনেকটাই পরিমার্জিত। তবুও ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ার চেয়ে এই রূপান্তর ইতিহাসের আকর সংরক্ষণের ক্ষেত্রে অনেক বেশি সহায়ক।
এই রাজবাড়িগুলো কেন্দ্র করে শুধুমাত্র যে পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটছে তা নয়। এর ফলে স্থানীয় অর্থনীতিও অনেকটাই চাঙ্গা হচ্ছে। একটি রাজবাড়িকে হেরিটেজ হোটেলে রূপান্তরিত করার কাজে বহু স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান হয়। অতিথি আপ্যায়ন, রক্ষণাবেক্ষণ, স্থানীয় খাবার রান্না করা এবং পর্যটকদের গাইডিং করার জন্য এলাকার মানুষরাই নিযুক্ত হন। স্থানীয় হস্তশিল্প এবং লোকসংস্কৃতিও নতুন করে প্রচারের আলোয় আসছে। সন্ধ্যেয় বাউল গান, ছৌ নাচ কিংবা স্থানীয় শিল্পীদের পরিবেশনা পর্যটকদের যেমন মুগ্ধ করে তেমনই এই শিল্পীরাও আয়ের একটি নতুন পথ খুঁজে পান।
ইতিহাসের এই পুনর্নির্মাণে বেশ কয়েকটি রাজবাড়ি বা জমিদার বাড়ি অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে। বাংলার বুকে বিলাসবহুল হেরিটেজ স্টে হিসেবে গড়ে ওঠা এমন ৯টি পুরনো প্রপার্টি এখন পর্যটকদের মূল আকর্ষণ।
বাংলার অন্যতম সুপরিচিত এই হেরিটেজ স্টে মণ্ডল জমিদার বংশের ৩৫০ বছরের পুরনো বাসভবন। মুঘল সম্রাট আকবরের সেনাপতি মানসিংহের কাছ থেকে এই পরিবার জমিদারি লাভ করেছিল। বিশাল উঠোন, প্রাচীন খিলান এবং রাজকীয় সিঁড়ি এখানকার মূল আকর্ষণ। সন্ধ্যেয় ঠাকুরদালানে অনুষ্ঠিত আরতি পর্যটকদের মুগ্ধ করে। প্রিমিয়াম লাক্সারি ট্যুরিস্ট, কর্পোরেট পেশাজীবী এবং ডেস্টিনেশন ওয়েডিংয়ের জন্য মানুষ এখানে সবচেয়ে বেশি আসেন। এখানকার খাবার-দাবারের বেশ সুখ্যাতি আছে।।
১৭৬৬ সালে মারাঠা বর্গী কুন্দন সিং এই সুবিশাল প্রাসাদ নির্মাণ করেন। পরে তারা বাংলার সংস্কৃতির সাথে মিশে যান এবং পদবি বদলে কুণ্ডু রাখেন। লুটেরা সিনেমার শ্যুটিং স্পট হিসাবে এটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। অন্দরমহল এবং বহিরমহলের বিশাল চত্বর ও খড়খড়ি দেওয়া জানলা এখানকার স্বতন্ত্র আকর্ষণ। ইতিহাস প্রেমী, ফটোগ্রাফার এবং উইকেন্ড ট্রাভেলারদের কাছে এটি অন্যতম পছন্দের।
১৭০০ শতকে রায় বংশের হাত ধরে এই রাজবাড়ির পত্তন হয়। ইউরোপীয় এবং ভারতীয় স্থাপত্যের এক অনন্য মেলবন্ধন দেখা যায় এই প্রাসাদে। রাজবাড়ির বিশাল বলরুম, রত্নবেদী এবং পুরনো আমলের পোশাক ও অস্ত্রের মিউজিয়াম পর্যটকদের নবাবি যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। ইতিহাস গবেষক, হেরিটেজ প্রেমী এবং সপরিবারে ঘুরতে আসা পর্যটকদের কাছে এটি অত্যন্ত আকর্ষণীয়।
২৫০ বছরের পুরনো এই প্রাসাদ শেহেরওয়ালি জৈন জমিদার দুদোরিয়া পরিবারের বাসভবন। গ্রিক, রোমান এবং ফরাসি স্থাপত্যের নিখুঁত সংমিশ্রণ রয়েছে এই বাড়ির নকশায়। এই হেরিটেজ স্টে সম্পূর্ণভাবে নিরামিষ এবং এখানকার শেহেরওয়ালি কুইজিন সারা বিশ্বে বিখ্যাত। বুটিক লাক্সারি লাভার এবং আন্তর্জাতিক স্তরের কালচারাল ট্যুরিস্টরা এখানে আসেন।
১৫৯২ সালে মল্লদেব রাজবংশ এই রাজবাড়ি প্রতিষ্ঠা করে। গথিক এবং মুসলিম স্থাপত্যের মিশ্রণে তৈরি বর্তমান প্রাসাদটি ১৯২০-এর দশকে মহারাজা নরসিংহ মল্লদেব নতুন করে নির্মাণ করান। লাল মাটির পরিবেশ এবং শাল পিয়ালের জঙ্গলের মাঝে এই রাজকীয় অবস্থান এর মূল আকর্ষণ। প্রকৃতি এবং ইতিহাস প্রেমী মানুষ, যারা জঙ্গলের কাছাকাছি রাজকীয় পরিবেশে ছুটি কাটাতে চান তারা এখানে আসেন।
ষোড়শ শতকে উত্তর ভারত থেকে আসা গর্গ বংশের জনার্দন উপাধ্যায় এই জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে পর্যটকদের থাকার জন্য এদের ফুলবাগ প্যালেস খুলে দেওয়া হয়েছে, যা ১৯২৬ সালে এক ফরাসি স্থপতির নকশায় তৈরি হয়েছিল। রাজবাড়ির ভেতরের প্রাচীন মিউজিয়াম এবং বিশাল দিঘি এখানকার প্রধান আকর্ষণ। কলকাতা থেকে কাছে হওয়ার কারণে শর্ট উইকেন্ড ট্রাভেলারদের কাছে এটি খুব জনপ্রিয়।
চৌধুরী বংশের ৪০০ বছরের পুরনো জমিদারি এটি। বাংলার ঐতিহ্যবাহী আটচালা স্থাপত্য এবং টেরাকোটা শিল্পের এক অসাধারণ নিদর্শন এই রাজবাড়ি। বাড়ির সামনে থাকা বিশাল দীঘি এবং প্রাচীন টেরাকোটা মন্দিরগুলো এক অদ্ভুত শান্ত পরিবেশ রচনা করে। আধ্যাত্মিক পরিবেশ এবং নিরিবিলি পছন্দ করা উইকেন্ড ট্রাভেলাররা মূলত এখানে আসেন।
আঠারো শতকের শেষের দিকে ফরাসি নীলকর জন অ্যালবার্ট পালম্যে এটি তৈরি করেছিলেন। পরবর্তীতে ১৮৩০ সালে পালচৌধুরী জমিদাররা এটি কিনে নেন। ইতালীয় মার্বেলের মেঝে, বিশাল বারান্দা এবং বিলিয়ার্ড রুম এই বাড়িকে অন্যান্য বাঙালি জমিদার বাড়ির থেকে আলাদা করে। আর্ট এবং স্থাপত্য অনুরাগী, বইপ্রেমী এবং বিদেশী পর্যটকরা নিরিবিলি ছুটি কাটাতে এখানে বেশি আসেন।
ইছামতী নদীর তীরে ভারত বাংলাদেশ সীমান্তে অবস্থিত টাকি একসময় বহু প্রভাবশালী জমিদারের বাসভূমি ছিল। এখানকার পুরনো জমিদার বাড়িগুলোর অংশবিশেষ সংস্কার করে এখন অতিথি আবাসে রূপান্তরিত করা হয়েছে। ইছামতী নদীতে নৌকাবিহার করে সীমান্ত দর্শন এখানকার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। বর্ডার ট্যুরিজম এবং রিভার সাইড ভিউ পছন্দ করা মানুষেরা এখানে ভিড় করেন। দুর্গাপুজোর প্রতিমা বিসর্জন এখানকার পর্যটনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক। এছাড়াও শীতকালে বহু মানুষ এখানে পিকনিক করতে আসেন।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
