

নীরজ যাদবের অকাল প্রয়াণে শোকস্তব্ধ ক্রীড়া জগৎ। ছবি - Google
২০২৬ সালের এশিয়ান প্যারা গেমসে সোনাজয়ী ভারতীয় অ্যাথলিট সুবর্ণা রাজের কাছে নীরজ ছিলেন শুধু একজন সহক্রীড়াবিদ নন, দীর্ঘ দিনের বন্ধু। একসঙ্গে অনুশীলন করেছেন, প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে গিয়েছেন, ভাগ করে নিয়েছেন অসংখ্য স্মৃতি। সুবর্ণার কথায়, নীরজ ছিলেন ‘জিন্দাদিল ইনসান’...
‘অ্যায় পেহেলওয়ান, ক্যায়সি হ্যায়?’ অর্থাৎ, ‘কী রে কুস্তিগির, কেমন আছিস?’ পরিচিতদের দেখলেই এই ভাবে ডাক দিতেন নীরজ যাদব। তাঁর গলায় থাকত প্রাণখোলা উচ্ছ্বাস, মুখে হাসি। সতীর্থদের উৎসাহ দেওয়া, তাঁদের সঙ্গে মজা করা এবং কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়ানো -এইসবের জন্যই পরিচিত ছিলেন ভারতের তিন বারের এশিয়ান প্যারা গেমসের সোনাজয়ী অ্যাথলিট। কিন্তু সেই প্রাণবন্ত মানুষটিই আর নেই। নীরজের আকস্মিক মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ ভারতীয় প্যারা অ্যাথলেটিক্সের জগৎ। সতীর্থদের স্মৃতিতে এখন শুধুই তাঁর হাসি, বন্ধুত্ব আর অন্যদের এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা জোগানোর গল্প।
২০২৬ সালের এশিয়ান প্যারা গেমসে সোনাজয়ী ভারতীয় অ্যাথলিট সুবর্ণা রাজের কাছে নীরজ ছিলেন শুধু একজন সহক্রীড়াবিদ নন, দীর্ঘ দিনের বন্ধু। একসঙ্গে অনুশীলন করেছেন, প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে গিয়েছেন, ভাগ করে নিয়েছেন অসংখ্য স্মৃতি। সুবর্ণার কথায়, নীরজ ছিলেন ‘জিন্দাদিল ইনসান’, যাঁর মধ্যে বেঁচে থাকার আনন্দ ছিল ভরপুর। অন্যদের উৎসাহ দেওয়ার একটা নিজস্ব ভঙ্গি ছিল তাঁর। সেই পরিচিত ডাক, ‘পেহেলওয়ান’, বন্ধুত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছিল।
নীরজের মৃত্যুর খবর এখনও মেনে নিতে পারছেন না সুবর্ণা। কয়েক দিন আগেও তাঁর সঙ্গে কথা হয়েছিল। এশিয়ান প্যারা গেমসে অংশ নিতে যাওয়ার আগে একটি ডিসকাসের প্রয়োজন হয়েছিল সুবর্ণার। নীরজ তাঁকে সেটি জোগাড় করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। সুবর্ণা বলেন, ‘আমি চলে যাওয়ার দু’দিন আগে ওঁর সঙ্গে কথা হয়েছিল। আমার একটা ডিসকাস দরকার ছিল। ও বলেছিল, জোগাড় করে দেওয়ার চেষ্টা করবে। তার দু’দিন পরে আমি চলে যাই। তারপর আর কথা হয়নি।’
সেই কথোপকথন যে তাঁদের শেষ দিকের আলাপগুলির একটি হয়ে থাকবে, তা ভাবতেও পারেননি সুবর্ণা। তাঁর কথায়, ‘ওঁকে সব সময় খুব শক্ত মনের মানুষ বলেই মনে হয়েছে। কী হয়েছিল, কেন এমন হল, বুঝতে পারছি না। ওর মতো একজন মানুষ এ ভাবে চলে যাবে, সেটা বিশ্বাস করা কঠিন।’
একই ভাবে ভেঙে পড়েছেন ভারতের প্যারা জ্যাভলিন থ্রোয়ার নভদীপ সিং। প্যারালিম্পিক্সের সোনাজয়ী নভদীপের কাছে নীরজ ছিলেন দাদার মতো। ২০২৩ সালে বেঙ্গালুরুতে অনুশীলনের সময় দীর্ঘ দিন একই ঘরে থেকেছেন তাঁরা। একসঙ্গে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় গিয়েছেন। ২০২২ সালে পর্তুগালে বিশ্ব প্রতিযোগিতাতেও একসঙ্গে ছিলেন। নভদীপ বলেন, ‘আমরা অনেক দিন একই ঘরে থেকেছি। ২০২৩ সালে বেঙ্গালুরুতে অনুশীলনের সময় একসঙ্গে ছিলাম। বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় গেলেও একসঙ্গে থাকতাম। ২০২১ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত আমরা একই অনুশীলন দলের অংশ ছিলাম।’
নীরজের রসবোধের কথাও মনে পড়ছে নভদীপের। বয়সে অনেক বড় হলেও কখনও দূরত্ব তৈরি হতে দেননি নীরজ। নভদীপের কথায়, ‘ও খুব সরল মনের মানুষ ছিল। ওঁর রসবোধও দারুণ ছিল। বয়সে আমার থেকে অনেক বড় হলেও আমরা কখনও সেই তফাত অনুভব করিনি। মজা করে আমাকে “ভাই সাহেব” বলে ডাকত। আমরা একসঙ্গে অনেক হাসিঠাট্টা করতাম।’
শুধু অনুশীলনের মাঠেই নয়, অবসরেও একসঙ্গে সময় কাটাতেন তাঁরা। কখনও বাজারে গিয়ে ফলের রস খাওয়া, কখনও সিনেমা দেখা - বন্ধুত্বের ছোট ছোট মুহূর্তগুলিই এখন নভদীপের কাছে অমূল্য স্মৃতি। তিনি বলেন, ‘আমাদের এত স্মৃতি রয়েছে যে, তার মধ্যে থেকে এক-দু’টি বেছে নেওয়া কঠিন। একসঙ্গে বাইরে যেতাম, কাজ থাকলে বাজারে যেতাম, সিনেমা দেখতাম। ও সিনেমা দেখতে খুব ভালবাসত। আমিও ভালবাসি।’
নীরজের জীবনে লড়াইয়ের অভাব ছিল না। সাত বছর বয়সে পোলিয়োর কারণে তাঁর শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়। পরবর্তী সময়ে হুইলচেয়ার টেনিস দিয়ে খেলাধুলার যাত্রা শুরু করলেও ২০১৫ সালে প্যারা অ্যাথলেটিক্সে যোগ দেন তিনি। ২০১৮ সালে জাকার্তা এশিয়ান প্যারা গেমসে পুরুষদের এফ৫৫ জ্যাভলিন থ্রোয়ে ২৯.৮৪ মিটার দূরত্বে বর্শা ছুড়ে এশীয় রেকর্ড-সহ সোনা জিতেছিলেন। ২০২৩ সালে হাংঝাউ এশিয়ান প্যারা গেমসে ডিসকাস ও জ্যাভলিন—দুই বিভাগেই সোনা জিতে নজর কেড়েছিলেন। তবে ডোপিং মামলায় শাস্তি পাওয়ার পরে তাঁর কেরিয়ারে বড় ধাক্কা আসে। ২০২৩ সালে নেওয়া নমুনায় নিষিদ্ধ পদার্থ স্ট্যানোজোলল পাওয়া যাওয়ার পরে চার বছরের নির্বাসনের মুখে পড়েন নীরজ। তার জেরে ২০২৬ সালের এশিয়ান প্যারা গেমসে অংশ নিতে পারেননি তিনি। হাংঝাউয়ে জেতা তাঁর জ্যাভলিন ও ডিসকাসের সোনার পদকও কেড়ে নেওয়া হয়। সেই সঙ্গে হারাতে হয় পদকের সঙ্গে যুক্ত আর্থিক পুরস্কার এবং সরকারি চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনাও। কিন্তু প্রতিকূলতার মধ্যেও অন্যদের লড়াই চালিয়ে যেতে উৎসাহ দিতেন নীরজ। সুবর্ণা জানিয়েছেন, মৃত্যুর মাত্র তিন-চার দিন আগেও আনমল নামে এক অ্যাথলিটকে ঘুরে দাঁড়ানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন তিনি। সুবর্ণার কথায়, ‘নীরজ সব সময় অন্যদের উৎসাহ দিত। আনমলকে বলেছিল, হাল ছাড়িস না, কঠোর পরিশ্রম কর এবং ফিরে আসার চেষ্টা কর। ও বলত, “ভাল কর, পরিশ্রম কর, আর এগিয়ে চল। আমার ৪৪ বছর বয়সে পদক জেতার কথাও নীরজ মনে করিয়ে দিয়েছিল আনমলকে।’
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয়, ২০২৮ সালে আবার প্রতিযোগিতায় ফেরার স্বপ্ন দেখছিলেন নীরজ। সুবর্ণা বলেন, ‘আমরা কখনও শুনিনি যে খেলার কারণে ও মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েছে। আনমল আমাকে জানিয়েছে, নীরজ কয়েক দিন আগেও ২০২৮ সালের কথা বলছিল। বলেছিল, “অপেক্ষা করো, ২০২৮ সালে আমি কী করি, কী ভাবে ফিরে আসি, সবাই দেখবে। আমার প্রত্যাবর্তনের কথা সবাই মনে রাখবে।” আর তার পরেই হঠাৎ এই আত্মহত্যার খবর পেলাম।’
নীরজের মৃত্যুর পরিস্থিতি নিয়ে তদন্ত চলছে। প্রাথমিক রিপোর্টে বিষাক্ত পদার্থ খাওয়ার সন্দেহের কথা উঠে এলেও ঘটনার সম্পূর্ণ কারণ এখনও স্পষ্ট নয়। তাঁর ঘনিষ্ঠদের কাছে তাই শোকের পাশাপাশি রয়ে গিয়েছে অনেক প্রশ্নও।
মাঠে নীরজের অর্জন, তাঁর লড়াই এবং অন্যদের অনুপ্রাণিত করার ক্ষমতা তাঁকে সতীর্থদের কাছে বিশেষ করে তুলেছিল। পদক হারানো, নির্বাসন কিংবা প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও অন্যদের এগিয়ে যাওয়ার কথা বলতেন তিনি। সেই মানুষটির স্মৃতিই এখন বারবার ফিরে আসছে পরিচিতদের কথায়। আর ফিরে আসছে সেই পরিচিত ডাক—‘অ্যায় পেহেলওয়ান, ক্যায়সি হ্যায়?’
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার সিনিয়র ক্রীড়া সাংবাদিক। দুটি ফুটবল বিশ্বকাপ এবং দুটি ক্রিকেট বিশ্বকাপ কভার করা এই সাংবাদিকের একাধিক আরও আন্তর্জাতিক ইভেন্ট করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে। শুভ্র দুটি বইও লিখেছেন, একটা বিশ্বকাপের গল্প যুদ্ধ এবং শেষটি স্বপ্নের নায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো।
