১২ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
অটোমান সুলতানের প্রিয় পদ চেটেপুটে খাচ্ছে বাঙালি!

টলমা থেকে পটলের দোরমা। ছবি - AI

অটোমান সুলতানের প্রিয় পদ চেটেপুটে খাচ্ছে বাঙালি!

calender icon 2 ১৫ই আগস্ট, ২০২৬

মূল বিষয়

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তখন‌ও ভারতের মাটিতে শিকড় গেঁড়ে বসেনি। তখন‌ও কলকাতা মানে তৎকালীন বাংলার এক অতি সাধারণ গ্রাম। সময়টা সপ্তদশ শতক। তার শেষভাগে বাংলার বুকে তামাক, রেশম আর মশলার ব্যবসা করতে জাহাজে করে এসে হাজির হন একদল আর্মেনিয়ান। জলপথে পারস্য উপসাগর পেরিয়ে আসা এই বণিকরা সুদূর ইভান থেকে পা রেখেছিলেন বাংলায়।

ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি আর্মেনিয়ান বণিকরা এই শহরটাকে ধীরে ধীরে আপন করে নিয়েছিলেন। তাঁদের অনেকেই এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করেন।

কলকাতায় বসবাস শুরু করা আর্মেনিয়ানরা ধর্মস্থান হিসেবে তৈরি করেছিলেন সেন্ট গ্রেগরি চার্চ, যা আজও কলকাতার বুকে আর্মেনিয়ানদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তবে কলকাতার স্থাপত্যের ক্ষেত্রেই শুধু আর্মেনিয়ানদের অবদান আছে ভাবলে ভুল হবে। দীর্ঘদিন ধরে এখানে বসবাস করার সুবাদে কলকাতার রসনা তৃপ্তিতেও দীর্ঘস্থায়ী অবদান রেখে গিয়েছেন এঁরা।

আর্মেনিয়ান খাদ্য সংস্কৃতির হাত ধরে যে জিনিসটি আজ বাঙালির উৎসব-অনুষ্ঠানে এক আইকনিক পদ হয়ে উঠেছে তা হল পটলের দোরমা। কিন্তু এক্ষেত্রে একটা টুইস্ট আছে। পটলের দোরমার উৎপত্তি আর্মেনিয়ানদের হাত ধরে হলেও এর আদি উৎসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অটোমান সাম্রাজ্যের সুলতানদের রাজপ্রাসাদের অন্দরমহল!

অটোমান সাম্রাজ্য ও আর্মেনিয়ানদের খাদ্য সংস্কৃতি

আর্মেনিয়ার ভৌগোলিক মূলত এশিয়া ও ইউরোপের সংযোগস্থলে অবস্থিত। ফলে এদের খাদ্য সংস্কৃতিতে এই দুই মহাদেশেরই প্রভাব আছে। শতকের পর শতক ধরে অটোমান তুর্কি সাম্রাজ্যের প্রভাব সংযোজিত হয়েছে আর্মেনিয়ানদের বিভিন্ন পদে। ককেশীয় অঞ্চলের মানুষ আর্মেনিয়ানদের সংস্কৃতি ও খাদ্যাভ্যাসে অটোমান তুর্কিদের ঐতিহ্যের এক সুন্দর মিশ্রণ ঘটেছে।

সেই অটোমান সাম্রাজ্যের রান্নার একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল, মাংস বা চালের পুর দিয়ে সবজি বা পাতায় মুড়িয়ে এক ধরনের পদ তৈরি করা, যাকে তুর্কি ভাষায় বলা হত 'দোলমাক' (Dolmak) বা যার অর্থ 'ভর্তি করা'।

অটোমান সাম্রাজ্যের রন্ধনশৈলীতে এই পদটি ছিল আভিজাত্যের প্রতীক। অটোমান সুলতানদের রাজপ্রাসাদে এটি ছিল একটি আবশ্যকীয় পদ। সেখানে মূল উপাদান হিসেবে সাধারণত ব্যবহার করা হত আঙুর পাতা (Grape leaves)। এছাড়াও বাঁধাকপি পাতা‌ও ব্যবহার করত কেউ কেউ। এছাড়াও গোলমরিচ এবং বেগুন মেশানো হত। আর্মেনীয়রা ধীরে ধীরে অটোমান সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে তাদের খাদ্যাভ্যাসেও এই দোলমার প্রচলন গভীরভাবে শিকড় গেঁড়ে বসে। তারা মাংসের কিমা, চাল, এবং মধ্যপ্রাচ্যের সুগন্ধি মশলা একসঙ্গে মিশিয়ে আঙুর পাতায় মুড়িয়ে তৈরি করত তাদের ঐতিহ্যবাহী 'টলমা' (Tolma)। অটোমানদের দোলমা অভিযোজিত হয়ে আর্মেনিয়ানদের কাছে হল টলমা।

আরও পড়ুন
ধর্মীয় গোঁড়ামি থেকে জন্ম নেয় কলকাতার ইহুদিদের এই লোভনীয় পদ!
কলকাতার খাবার টেবিলে এক টুকরো পারস্য
ব্যান্ডেল চিজ: পর্তুগিজ ঐতিহ্যের এক বাঙালি স্বাদ

এই পদটি ধীরে ধীরে আর্মেনিয়ানদের প্রতিটি পারিবারিক উৎসব এবং বিশেষ উদযাপনের প্রধান আকর্ষণ হয়ে ওঠে।

উপাদানের সঙ্কট থেকে বাঙালির প্রিয় পদের সৃষ্টি

১৭০৫ সালে কলকাতায় বসবাসরত আর্মেনিয়ানরা সেন্ট নজারেথ চার্চ নির্মাণ করেন। কিন্তু সেই সময় আর্মেনিয়ান পরিবারগুলির হেঁসেলে খুব একটা সুখ ছিল না। শীত-গ্রীষ্মের বাংলায় তারা নিজেদের ঐতিহ্যবাহী টলমা বা আঙুর পাতায় মোড়ানো মাংসের পদটি বানানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলেন। ফলে মুখে স্বাদ নেই, মনে শান্তি নেই। আসল সমস্যা দেখা দিল আঙুর পাতা পাওয়া নিয়ে। কলকাতায় নিয়মিত সবজির মতো করে আঙুর পাতা পাবেই বা কীভাবে! বাংলার মাটিতে তো আর ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের মতো আঙুর পাতার সহজলভ্যতা নেই।

আর এখান থেকেই কলকাতার রন্ধনশিল্পে সৃষ্টি হল এক অবিস্মরণীয় নতুন পদ। আর্মেনিয়ান গৃহিণীরা স্থানীয় বাজারগুলোতে খোঁজা শুরু করলেন, এমন কোনও সবজি পাওয়া যায় কিনা যার ভেতরটা ফাঁপা করা যাবে এবং যার বাইরের আবরণটি মাংসের পুরকে ধরে রাখতে পারবে। এইভাবেই তাঁদের চোখে পড়ল বাংলার পটল।

পটলের দোরমার জন্ম কাহিনী

আঙুর পাতার বিকল্প হিসেবে কলকাতায় বসবাসরত আর্মেনিয়ানরা বেছে নিল পটলকে! পটলের খোসা ছাড়িয়ে, চামচ দিয়ে ভেতরটা খুঁড়ে দানা বাইরে বের করে এনে ফাঁপা করে তার মধ্যে খাসি বা ভেড়ার মাংসের মশলাদার কিমার পুর ভরত। তারপর মুখটা এঁটে দিয়ে তেলে ভেজে বা কষিয়ে তৈরি করল এক অভিনব পদ। আর্মেনিয়ানদের প্রিয় 'টলমা' এভাবেই রূপান্তরিত হল কলকাতার নিজস্ব 'দোরমা'-তে।

তৎকালীন কলকাতার বাবু কালচার, ব্রিটিশ সাহেবদের খাসসামা এবং বাঙালি গৃহিণীদের হাত ধরে আর্মেনিয়ানদের এই পদটি ধীরে ধীরে বাঙালির হেঁশেলে প্রবেশ করতে শুরু করে। বাঙালি রান্নাঘরে ঢোকার পর এই পদে আরও কিছু ফিউশন ঘটল।

মাংসের কিমার পাশাপাশি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিরামিষের দিনে ছানার পুর, মোচার পুর, কিংবা ডালের পুর দিয়ে দোরমা বানানোর প্রচলন শুরু করল বাঙালি। পরবর্তীকালে অগ্রহয়ণ বা পৌষ সংক্রান্তিতে কিংবা বাঙালি বিয়েবাড়ির সুস্বাদু মেনুতে পটলের দোরমা এক অতি পরিচিত এবং জাতে ওঠা পদ হিসেবে জায়গা করে নেয়।

এভাবেই বাঙালির রন্ধে রন্ধ্রে মিশে আছে নানান ভিনদেশী সংস্কৃতির ইতিবাচক প্রভাব।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
কৌস্তভ ভৌমিক
কৌস্তভ ভৌমিক

কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য