

ভাইরাল ফিউশন ফুড থেকে মুখ ফেরাচ্ছে হুজুকে বাঙালি। ছবি - AI
ভাইরাল ফিউশন ফুডে মজে বছর খানেক আগে হ্যানো 'কু-খাদ্য' নেই যা হামলে পড়ে অনেকে খাননি। তবে সেই মোহ কাটতে বেশি সময় লাগেনি। তাই রসগোল্লা বিরিয়ানি বা চকলেট ফুচকা ছেড়ে আবার সুস্থ স্বাভাবিক খাদ্য-রুচিতে ফিরে এসেছে আমজনতা।
ফিউশন ফুডের নামে বাঙালির খাবারের পাতে বছরখানেক আগে বেশ এক বৈপ্লবিক ঝড় উঠেছিল। সে যেন চেনা পদের অচেনা রূপ। সোশ্যাল মিডিয়া খুললেই চোখে পড়ত নিত্যনতুন সব অদ্ভুত খাবারের ভিডিও। রাতারাতি ভাইরাল হওয়ার নেশায় অতি পরিচিত স্ট্রিট ফুডগুলোর উপর শুরু হয়েছিল দেদার কাঁটাছেঁড়া ও সার্জারি।
খাদ্যরসিক বাঙালিও প্রথমটায় কৌতূহল চেপে রাখতে পারেনি। নতুন জিনিসটা কেমন হল তা চেখে দেখার লোভে এইসব ফিউশন ফুডের দোকানে এক সময় লম্বা লাইন পড়ত। তালিকায় চকোলেট ফুচকা থেকে শুরু করে রসগোল্লা বিরিয়ানি- বিদঘুটে কী না কী ছিল।
কিন্তু পরিচিত খাবার নিয়ে এই মাত্রছাড়া কেরামতির সেই দিন এখন অতীত। এক প্রকার জবরদস্তি করে চাপিয়ে দেওয়া ফিউশনের মোহ কাটিয়ে বাঙালি আবার তার চেনা, খাঁটি আর পরিচিত সুস্থ স্বাদের কাছেই আবার আত্মসমর্পণ করছে।
গত কয়েক বছরে কলকাতা এবং শহরতলিতে এমন কিছু ফিউশন ফুডের চল শুরু হয়েছিল যা নিয়ে তর্কবিতর্ক কম হয়নি। এই তালিকায় একেবারে উপরের দিকে থাকবে চকোলেট ফুচকা এবং আইসক্রিম ফুচকা। আলু আর তেঁতুল জলের টক-ঝাল-মিষ্টি ম্যাজিকের জায়গায় ফুচকার পেটে ঢুকল ব্রাউনি আর চকোলেট সিরাপ।
এরপর এল ওভারলোডেড মেয়োনিজ ও চিজ দেওয়া রোল এবং মোমো। রাস্তার ধারের চেনা মোমো বা কাঠি রোলের উপর সস্তার লিকুইড চিজ আর রাশি রাশি মেয়োনিজ ঢেলে তাকে সম্পূর্ণ অন্য রূপ দেওয়া হয়।
এমনকি কলকাতার বিখ্যাত বিরিয়ানি নিয়েও এই ফিউশন নামক মশকরা করা হয়েছিল। আলু আর মাংসের সুবাসের মধ্যে সোজা গুঁজে দেওয়া হয় মিষ্টি রসগোল্লা! এভাবেই বাজারে আসে রসগোল্লা বিরিয়ানি! সেট তার কী ভয়ঙ্কর স্বাদ। পাশাপাশি ফায়ার পান থেকে শুরু করে চকোলেট চা বা ম্যাংগো চা পাড়ার মোড়ে মোড়ে বিক্রি হতে শুরু করে।
কিন্তু আজ এগুলোর অবস্থা ঠিক কেমন? খোঁজ নিলে দেখবেন, এই খাবারগুলো প্রায় বিলুপ্তির পথে। হাতেগোনা কয়েকটি জায়গায় শুধু ইউটিউবারদের ভিউ বাড়ানোর জন্য এগুলো টিকে আছে। সাধারণ মানুষ আর এগুলো খেতে চাইছেন না।
কোনও খাবার কেবল স্বাদ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আমাদের স্মৃতি আর সংস্কৃতি। ফিউশন ফুডের প্রতি আগ্রহ কমার সবচেয়ে বড় কারণ লুকিয়ে আছে স্বাদের মনস্তত্ত্বে। যে কোনও খাঁটি আঞ্চলিক খাবার শত শত বছর ধরে বিবর্তিত হয়। তার মধ্যে মশলার একটা নিখুঁত ভারসাম্য থাকে। যেমন ফুচকার নোনতা আর ঝাল স্বাদ বা বিরিয়ানির সুগন্ধি মশলার মেজাজ। এর মধ্যে চকোলেট বা মিষ্টি ঢুকিয়ে দিলে আমাদের মস্তিষ্ক সেই স্বাদকে গ্রহণ করতে পারে না। প্রথমবার চমক লাগলেও বারবার খাওয়ার ইচ্ছেটা মরে যায়।
অতিরিক্ত মেয়োনিজ বা চিজ দেওয়া খাবার খেয়ে অনেকেরই হজমের মারাত্মক সমস্যা দেখা দেয়। আজকের প্রজন্ম আগের চেয়ে অনেক বেশি স্বাস্থ্যসচেতন। তারা বুঝতে পারছে, এই অতিরিক্ত ক্যালরি আর সস্তার ফুড কালার শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকারক। সারাদিনের কাজের চাপের পর মানুষ এমন খাবার খোঁজে যা মনকে আরাম দেয়। যাকে বলে কমফোর্ট ফুড। ফিউশন ফুডের জটিল স্বাদ সেই মানসিক প্রশান্তি দিতে চূড়ান্ত ব্যর্থ।
ফিউশন ফুডের প্রতি এই বিতৃষ্ণা মানুষকে আবার তার শেকড়ে ফিরিয়ে এনেছে। ছুটির দিনে এখন আর কেউ পারতপক্ষে চিজ ব্লাস্ট মোমো খোঁজে না। বরং নদীর ধারে বসে আড্ডা দেওয়ার ফাঁকে একটা সাধারণ চপ বা ঘুগনির স্বাদ তাদের অনেক বেশি টানছে।
ক্যাফেগুলোতেও এসেছে বড়সড় বদল। সেখানকার চেনা আড্ডার আমেজ আবার ফিরে এসেছে। এইসব জায়গায় এক টুকরো টোস্ট আর ফ্রাইড এগ বা একটা মুচমুচে ফিশ ফ্রাই খাওয়ার মধ্যে যে খাঁটি তৃপ্তি লুকিয়ে আছে, তা আধুনিক ফিউশনে নেই।
বিরিয়ানির ক্ষেত্রেও বাঙালি এখন অনেক বেশি খুঁতখুঁতে। নামিদামি রেস্তোরাঁর উদ্ভট এক্সপেরিমেন্টের চেয়ে দম বিরিয়ানি বা লোকাল বিরিয়ানির দোকানের খাঁটি স্বাদ তাদের বেশি পছন্দ। সঠিক মশলা আর আলুর টেক্সচারটাই যে আসল ম্যাজিক তা তারা বুঝে গেছে। রান্নার উপকরণের ক্ষেত্রেও এই পরিবর্তন স্পষ্ট।
জবরদস্তি তৈরি করা এই ফিউশন খাবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক ধরনের পরিষ্কার ছবি ইতিমধ্যেই ফুটে উঠেছে। আগামী দিনে এগুলো হয়ত রন্ধনশিল্পের মূল স্রোত থেকে একেবারেই ছিটকে যাবে। তবে পুরোপুরি হয়ত হারাবে না। এগুলো পর্যবসিত হবে নিছকই কিছু ফুড চ্যালেঞ্জ বা সোশ্যাল মিডিয়া স্টান্টে। বন্ধুদের সাথে বাজি ধরে অদ্ভুত কিছু খাওয়ার চ্যালেঞ্জ হিসেবেই হয়ত বেঁচে থাকবে চকোলেট চা বা রসগোল্লা বিরিয়ানি।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
