১৩ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
স্তন ক্যানসার: ঋণের জালে সর্বস্বান্ত বাংলার নারীরা

ছবি - Google

স্তন ক্যানসার: ঋণের জালে সর্বস্বান্ত বাংলার নারীরা

মূল বিষয়

বাঁ স্তনে হালকা ব্যথাযুক্ত একটি চাকা প্রথম লক্ষ্য করেছিলেন তিন মাস আগে। কিন্তু সংসারের হাজারো কাজের ভিড়ে বিষয়টি চেপে গিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ এলাকার ৩২ বছর বয়সী গৃহবধূ মীনতি (নাম পরিবর্তিত)। কোনোদিন স্তন ক্যানসার স্ক্রিনিংয়ের কথা শোনেননি তিনি। অবশেষে স্থানীয় চিকিৎসকের পরামর্শে ম্যামোগ্রাফি করা হলে ম্যালিগন্যান্সির ইঙ্গিত মেলে। এরপর জেলা থেকে চার ঘণ্টার পথ পেরিয়ে কলকাতায় পৌঁছনোর পর বিভিন্ন পরীক্ষায় জানা যায়, রোগটি ইতিমধ্যে চতুর্থ পর্যায়ে (Stage IV) পৌঁছে গেছে এবং শরীরের অন্যান্য অঙ্গেও ছড়িয়ে পড়েছে।

কলকাতার চিকিৎসকদের পরামর্শে সরকারি ও সামাজিক অনুদানভিত্তিক চিকিৎসার জন্য মীনতিকে পাঠানো হয় মুম্বইয়ের একটি বিশিষ্ট ক্যানসার হাসপাতালে। কিন্তু ততক্ষণে চিকিৎসার চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় পথের দূরত্ব আর খরচের ধাক্কা।

অল্প বয়সে আক্রমণ ও সচেতনতার অভাব

ভারতে মহিলাদের মধ্যে স্তন ক্যানসারের প্রকোপ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। জাতীয় সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশে স্তন ক্যানসার ধরা পড়ার গড় বয়স ৪৭ বছর— অর্থাৎ আক্রান্তদের অর্ধেকের বয়সই এর নিচে। উন্নত দেশের তুলনায় ভারতে এই রোগে মৃত্যুর হার অনেক বেশি। এর অন্যতম প্রধান কারণ:

* নিয়মিত স্ক্রিনিং ও স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাব

* ক্যানসার নিয়ে সামাজিক ছুঁৎমার্গ ও কুসংস্কার

* প্রান্তিক, দরিদ্র ও কম শিক্ষিত মহিলাদের মধ্যে প্রাথমিক স্তরে স্বাস্থ্য পরীক্ষার সুবিধার অপ্রতুলতা

দেরিতে রোগ ধরা পড়ার কারণে চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদী হয়, শারীরিক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বাড়ে এবং বেঁচে থাকার সম্ভাবনা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়।

আরও পড়ুন
ডাক্তারকে সরাবে AI?
ট্রাইকোটিলোম্যানিয়া কি মানসিক অসুখ?
রাত হলেই পায়ে অজানা অস্বস্তি!

জমি বন্ধক ও ঋণের বোঝা

মীনতির স্বামী দিনমজুর; সম্বল বলতে ছিল মাত্র এক একর জমি ও সামান্য সঞ্চয়। মুম্বইয়ে চিকিৎসার জন্য চড়া সুদে জমি বন্ধক রেখে তাঁদের ২ লাখ টাকা ঋণ নিতে হয়। ট্রেন ধরে মুম্বই পৌঁছে হাসপাতালের পাশের এক ধর্মশালায় আশ্রয় নেন তাঁরা। সেখানে জেনারেল ক্যাটাগরিতে ভর্তুকিযুক্ত চিকিৎসা মিললেও খরচের রাশ টানা সম্ভব হয়নি।

একটি সাম্প্রতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, মুম্বইয়ের ওই কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন ৫০০ জন স্তন ক্যানসার রোগীর মধ্যে ৫৫ শতাংশেরও বেশি এসেছিলেন ভিন রাজ্য থেকে। রোগীদের গড়ে ১,০৭৬ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়েছিল।

চিকিৎসার খরচের আসল বোঝা

ক্যানসার চিকিৎসার ক্ষেত্রে হাসপাতালে ভর্তির খরচের চেয়েও আনুষঙ্গিক খরচ পরিবারগুলোকে বেশি চাপে ফেলে। ভর্তুকিযুক্ত রোগীদের ক্ষেত্রে চিকিৎসার গড় খরচ দাঁড়ায় প্রায় ২.৫৮ লাখ টাকা, যার অর্ধেকই চলে যায় যাতায়াত, থাকা ও খাওয়ার মতো চিকিৎসা-বহির্ভূত খাতে। ফলে রোগীদের পকেট থেকে মেটাতে হয় ব্যয়ের প্রায় ৬২ শতাংশ, যা গড়ে প্রায় ১.৭৮ লাখ টাকা।

স্বাস্থ্যবিমা থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা মোট খরচের মাত্র ২৭.৮ শতাংশ পর্যন্ত কভার করে। কারণ বিমা সাধারণত কেবল হাসপাতালে ভর্তি থাকার খরচ মেটায়; অথচ কেমোথেরাপির মতো ডে-কেয়ার চিকিৎসা এবং থাকা-খাওয়ার বিপুল ব্যয় এর বাইরেই থেকে যায়। সমীক্ষা অনুযায়ী, চিকিৎসা করাতে গিয়ে ৮৫ শতাংশের বেশি পরিবার মারাত্মক আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে এবং ৫৫ শতাংশ পরিবার নেমে যায় দারিদ্র্যসীমার নিচে।

অসমাপ্ত ফলো-আপ ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

দীর্ঘ চিকিৎসার পর মীনতির শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও লড়াই শেষ হয়নি। মুম্বইয়ের দূরত্ব ও সঞ্চয় সম্পূর্ণ শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে তিনি প্রয়োজনীয় ফলো-আপ চিকিৎসায় আর যেতে পারেননি। চিকিৎসকদের মতে, বহু রোগী আর্থিক সংকট ও দূরত্বের কারণে মাঝপথেই চিকিৎসা বন্ধ করতে বাধ্য হন।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রামীণ স্তরে যদি নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের ব্যবস্থা থাকত, তবে প্রাথমিক পর্যায়েই মীনতির রোগ ধরা পড়ত। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যবিমায় ডে-কেয়ার ও আনুষঙ্গিক খরচ অন্তর্ভুক্ত না হলে আগামী দিনেও বহু পরিবারকে চিকিৎসার দায় মেটাতে গিয়ে নিঃস্ব হতে হবে।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক
দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক

অভিজ্ঞ, সংবেদনশীল, অনুসন্ধিৎসু এবং সমকালীন ও আগামী সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কর্মঠ কিছু তরুণ-তরুণী নিয়ে দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক। ভারতীয় বাঙালি সংস্কৃতির পথ ধরে গ্লোবাল লেন্স দিয়ে দুনিয়াকে দেখে সকলের সামনে পরিবেশন করাই তাঁদের লক্ষ্য। মিলেনিয়াল-জেনX-এর অভিজ্ঞতা ও জেনZ-র উৎসাহর যথাযথ রসায়নে গঠিত 'দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক'।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য