১২ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
ট্রাইকোটিলোম্যানিয়া কি মানসিক অসুখ?

অজান্তেই চুল ছেঁড়া মানসিক অসুখ নয় তো? প্রতীকী ছবি -The Fourth Axis.

ট্রাইকোটিলোম্যানিয়া কি মানসিক অসুখ?

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আচমকাই চোখে পড়ল মাথার এক কোণে চুল পাতলা হয়ে গেছে। কারও ক্ষেত্রে ভ্রুর একাংশ নেই, কারও আবার চোখের পাপড়ি অস্বাভাবিকভাবে কমে গিয়েছে। প্রথমে মনে হতে পারে, অতিরিক্ত চুল পড়া বা কোনও ত্বকের সমস্যা। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই এর নেপথ্যে থাকে এক নীরব মানসিক অসুখ— ট্রাইকোটিলোম্যানিয়া (Trichotillomania) বা হেয়ার-পুলিং ডিসঅর্ডার।

এটি কোনও খারাপ অভ্যাস নয়, ইচ্ছাশক্তির অভাবও নয়। এটি Obsessive-Compulsive and Related Disorders (OCRD)-এর অন্তর্গত একটি স্বীকৃত মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি বারবার নিজের মাথার চুল, ভ্রু, চোখের পাপড়ি কিংবা শরীরের অন্য অংশের লোম টেনে তুলে ফেলেন। অনেকেই জানেন যে তাঁরা নিজেদের ক্ষতি করছেন, এমনকি বন্ধ করার চেষ্টাও করেন। তবুও সেই প্রবল তাগিদকে দমন করতে পারেন না।

কেন হয় এই রোগ?

ট্রাইকোটিলোম্যানিয়ার নির্দিষ্ট একটি কারণ এখনও জানা যায়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি একাধিক শারীরিক, মানসিক ও জিনগত কারণের সম্মিলিত ফল।

পরিবারে কারও এই রোগ থাকলে ঝুঁকি বাড়তে পারে। আবার মস্তিষ্কের যে অংশ আবেগ, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে, সেখানে কার্যকারিতার সূক্ষ্ম পরিবর্তনও এই রোগের সঙ্গে যুক্ত বলে মনে করা হয়।

অনেক রোগীর ক্ষেত্রে উদ্বেগ, মানসিক চাপ, দুঃখ, একাকিত্ব বা একঘেয়েমি চুল টানার প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়। কেউ পরীক্ষার চাপের মধ্যে, কেউ অফিসের উদ্বেগে, আবার কেউ টেলিভিশন দেখতে দেখতে বা বই পড়ার সময় অজান্তেই চুল টানতে শুরু করেন। অনেকের কাছে এটি সাময়িকভাবে মানসিক চাপ কমানোর একটি অবচেতন উপায় হয়ে ওঠে। চুল টানার পর কিছুক্ষণের জন্য স্বস্তি মিললেও পরে অপরাধবোধ, লজ্জা ও হতাশা গ্রাস করে।

কোন লক্ষণগুলি চিনে রাখা জরুরি?

এই রোগের সবচেয়ে বড় লক্ষণ হল বারবার চুল বা লোম টেনে তোলার প্রবণতা। অনেকেই নির্দিষ্ট জায়গা থেকেই চুল তুলতে থাকেন, ফলে মাথায়, ভ্রুতে বা চোখের পাপড়িতে ফাঁকা অংশ বা টাকের মতো দাগ তৈরি হয়। কেউ টুপি, স্কার্ফ, উইগ বা মেকআপ দিয়ে সেই দাগ ঢাকার চেষ্টা করেন। অনেকে আবার অন্যের সামনে যেতে অস্বস্তি বোধ করেন, সামাজিক মেলামেশা এড়িয়ে চলেন।

আরও পড়ুন
গুঁড়ো মশলার ফাঁদে স্বাস্থ্য? রান্নাঘরের সুবিধার আড়ালে লুকিয়ে বিপদের ইঙ্গিত
জ্বর মানেই ডেঙ্গু?
পেঁপে পাতায় ডেঙ্গু মুক্তি?

ক্রমশ এই অভ্যাস পড়াশোনা, কর্মজীবন, পারিবারিক সম্পর্ক ও আত্মবিশ্বাস— সব কিছুর উপরেই প্রভাব ফেলতে শুরু করে। বহু রোগী বারবার নিজেকে প্রতিশ্রুতি দেন যে আর চুল টানবেন না, কিন্তু সেই চেষ্টা বারবার ব্যর্থ হয়।

কীভাবে ধরা পড়ে?

ট্রাইকোটিলোম্যানিয়া নির্ণয়ের জন্য কোনও রক্ত পরীক্ষা বা স্ক্যানের প্রয়োজন হয় না। রোগীর আচরণ, উপসর্গ এবং মানসিক অবস্থার মূল্যায়নের মাধ্যমেই মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট রোগ নির্ণয় করেন। প্রয়োজনে অন্য কোনও ত্বকের রোগ বা চুল পড়ার কারণ আছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হয়।

চিকিৎসায় কী উপকার মেলে?

এই রোগের সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা হল কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি (CBT)। এরই একটি বিশেষ পদ্ধতি হ্যাবিট রিভার্সাল ট্রেনিং (HRT) রোগীকে শেখায়, কোন পরিস্থিতিতে চুল টানার ইচ্ছে বাড়ে এবং সেই সময় কীভাবে অন্য একটি নিরাপদ অভ্যাস গড়ে তুলে সেই তাগিদ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। যেমন স্ট্রেস বল চেপে ধরা, ফিজেট টয় ব্যবহার, আঁকাআঁকি, বুনন বা হাত ব্যস্ত রাখার অন্য কাজ।

যে কারণে রোগীদের একটি ডায়েরি রাখারও পরামর্শ দেওয়া হয়। কখন, কোথায় এবং কী মানসিক অবস্থায় চুল টানার প্রবণতা বাড়ছে, তা লিখে রাখলে ট্রিগার চিহ্নিত করা সহজ হয়। পাশাপাশি নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, মেডিটেশন, শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণও চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

কিছু রোগীর ক্ষেত্রে উদ্বেগ, বিষণ্নতা বা অন্য মানসিক সমস্যাও একসঙ্গে থাকে। সে ক্ষেত্রে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ দিতে পারেন। তবে কোনও ওষুধই নিজে থেকে শুরু বা বন্ধ করা উচিত নয়।

কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?

যদি চুল টানার কারণে মাথায় বা ভ্রুতে স্পষ্ট টাক পড়ে যায়, নিজে থেকে অভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করতে না পারেন, পড়াশোনা বা কাজ ব্যাহত হয়, অথবা এই সমস্যার জন্য লজ্জা, উদ্বেগ বা বিষণ্নতায় ভুগতে শুরু করেন, তাহলে দেরি না করে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

ট্রাইকোটিলোম্যানিয়া কোনও চরিত্রগত দুর্বলতা নয়, কোনও বদভ্যাসও নয়। এটি একটি চিকিৎসাযোগ্য মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা। সময়মতো রোগটি চিহ্নিত করা গেলে এবং সঠিক থেরাপি শুরু হলে অধিকাংশ রোগীই ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারেন। তাই চুল টানার অভ্যাসকে লুকিয়ে না রেখে, সমস্যাটিকে গুরুত্ব দিয়ে চিকিৎসকের কাছে যাওয়াই সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
ডাঃ পৌলমী রায়চৌধুরী
ডাঃ পৌলমী রায়চৌধুরী

কলকাতায় জন্ম। উত্তর কলকাতার হোলি চাইল্ড ইনস্টিটিউট, বিডন স্ট্রীট স্কুলে প্রাথমিক পাঠ। এরপর ডাক্তারির পড়াশোনায় প্রবেশ। যাদবপুরে কে. পি. সি মেডিক্যাল কলেজ থেকে MBBS, তারপর পি. জি হাসপাতাল থেকে MD শেষ হতে হতে পেরিয়েছে অনেক গুলো বছর। লেখার ইচ্ছে ছোটবেলা থেকে। ভ্রমণ ভালোবাসেন। পেশা আর লেখা দুটোই উজ্জীবিত রাখে তাঁকে।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য