

'দ্বিতীয় সেলুলার জেল' বক্সা দুর্গ। ছবি - Google
৩রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬
আজকের আলিপুরদুয়ার জেলার বুক চিরে চলে গিয়েছে বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের গহিন অরণ্য। সেই অরণ্যের এক প্রান্তে, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২,৮৪৪ ফুট উচ্চতায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এক প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ- বক্সা দুর্গ। আলিপুরদুয়ার শহর থেকে দূরত্ব মেরেকেটে ৩০ কিলোমিটার। বর্তমানে এটি নিছকই পাথর আর শ্যাওলায় মোড়া ভগ্নস্তূপ। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অন্যতম রক্তক্ষয়ী ও রোমহর্ষক অধ্যায় লুকিয়ে আছে ডুয়ার্সের এই দুর্গম দুর্গে।
বক্সা দুর্গের গোড়ার ইতিহাস মোটেও ব্রিটিশদের হাতে লেখা নয়। তিব্বতে যাওয়ার যে প্রাচীন রেশম বাণিজ্য পথটি ভুটানের মধ্যে দিয়ে যেত, সেটিকে সুরক্ষিত রাখার জন্যই ভুটানের রাজারা এই দুর্গটি ব্যবহার করতেন। সেই সময় এটি মূলত বাঁশ ও কাঠের তৈরি একটি সাধারণ কাঠামো ছিল। কিন্তু পরিস্থিতি বদলে যায় ১৮৬৫ সালে। ব্রিটিশদের সাম্রাজ্যবাদী বিস্তার নীতির কোপে পড়ে ভুটান। ওই বছরের ১১ নভেম্বর ব্রিটিশ ও ভুটানের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় ঐতিহাসিক 'সিঞ্চুলার চুক্তি'। এই চুক্তির মাধ্যমে বক্সা দুর্গ চিরতরে চলে আসে ব্রিটিশ ভারতের অধীনে। এরপর পুরনো বাঁশের কাঠামো ভেঙে ফেলে ব্রিটিশরা এই স্থানে গড়ে তোলে এক দুর্ভেদ্য পাথরের দুর্গ।
১৯৩০-এর দশকে ব্রিটিশ সরকার এই দুর্গটিকে এক নতুন ও ভয়ঙ্কর রূপ দেয়। বেঙ্গল ক্রিমিনাল ল অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্টের আওতায় এটিকে একটি উচ্চ নিরাপত্তাযুক্ত ডিটেনশন ক্যাম্প বা কারাগারে পরিণত করা হয়। ভৌগোলিক দুর্গমতা, চারপাশের ঘন জঙ্গল, আর বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণের কারণে এখান থেকে পালিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল। আন্দামানের কুখ্যাত সেলুলার জেলের পরেই বক্সা দুর্গকে তাই ভারতের দ্বিতীয় দুর্গম কারাগার হিসেবে বিবেচনা করা হতো। একে বলা হত দ্বিতীয় সেলুলার জেল।
অনুশীলন সমিতি ও যুগান্তর দলের মতো বিপ্লবী সংগঠনগুলির প্রথম সারির নেতাদের বিনা বিচারে এখানে বন্দি করে রাখত ব্রিটিশরা। কৃষ্ণপদ চক্রবর্তী, প্রমথ ভৌমিক, জ্ঞান চক্রবর্তীর মতো বহু দেশপ্রেমিক এই পাহাড়ের ওপর অবস্থিত দুর্গের ছোট ছোট কুঠুরির মধ্যে দিনের পর দিন অকথ্য নির্যাতন সহ্য করেছেন। ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত এখানে অন্তত ৫২৫ জন রাজনৈতিক বন্দিকে আটকে রাখা হয়েছিল।
তবে স্বাধীনতার পর ১৯৫০-এর দশকেও দমন পীড়নের কাজে এই দুর্গকে ব্যবহার করা হয়েছে। স্বাধীন ভারতে এই দুর্গ কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের বন্দিশালা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সতীশচন্দ্র পাকড়াশী, চিন্মোহন সেহানবীশ, বিনয় চৌধুরীর মতো বিশিষ্ট কমিউনিস্ট বুদ্ধিজীবীরা এখানে বন্দি ছিলেন। এই জেলের ভয়াল স্মৃতি নিয়েই সুভাষ মুখোপাধ্যায় তাঁর 'আমার বাংলা' বইটিতে লিখেছিলেন বিখ্যাত প্রবন্ধ— 'মেঘের গায়ে জেলখানা'।
বক্সা দুর্গের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক আবেগঘন ঘটনা। যা ঘটেছিল ১৯৩০-এর দশকে। একদিকে ব্রিটিশ পুলিশের কড়া পাহারা, অন্যদিকে বন্দি বিপ্লবীদের মনে মুক্তির অদম্য স্পৃহা। এই প্রবল বৈপরীত্যের মধ্যেই জেলের চারদেওয়ালের ভেতর বিপ্লবীরা একদিন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মজয়ন্তী পালন করেন। শুধু তাই নয়, তাঁরা দার্জিলিংয়ে অবস্থানরত কবিকে একটি অভিনন্দন পত্রও পাঠান। এই দুঃসাহসিক কাজের কথা জানতে পেরে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অত্যন্ত আপ্লুত হন। তিনি বিপ্লবীদের চিঠির এক অবিস্মরণীয় প্রত্যুত্তর দেন। সেই চিঠিতে কবি লিখেছিলেন, "অমৃতের পুত্র মোরা কাহারা শোনাল বিশ্বময়, আত্মবিসর্জন করি আত্মারে কে জানিল অক্ষয়"।
একটি কুখ্যাত কারাগারের বন্দিদের সঙ্গে স্বয়ং বিশ্বকবির এই পত্রালাপ ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে আক্ষরিক অর্থেই এক বিরলতম ঘটনা।
যে দুর্গ একসময় বিপ্লবীদের আর্তনাদ আর শৃঙ্খলের ঝঙ্কারে মুখরিত থাকত, সেটাই হঠাৎ করে পরিণত হল এক শান্ত, পবিত্র আশ্রমে! ১৯৫৯ সালে চিন যখন তিব্বত দখল করে, তখন প্রাণ বাঁচাতে বহু তিব্বতি বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ভারতে পালিয়ে আসেন। তিব্বতের বিখ্যাত দ্রেপুং মঠের শত শত সন্ন্যাসীকে ভারত সরকার এই বক্সা দুর্গেই প্রাথমিকভাবে আশ্রয় দিয়েছিল। একটি পরিত্যক্ত, স্যাঁতসেঁতে কারাগার এভাবেই পরিণত হয়েছিল তিব্বতি লামাদের প্রার্থনা ও বৌদ্ধধর্ম চর্চার এক প্রাণবন্ত কেন্দ্রে। ১৯৭১ সালে কর্ণাটকের বাইলাকুপে ও মুন্দগদে স্থানান্তরিত হওয়ার আগে পর্যন্ত বক্সা দুর্গই ছিল এই ছিন্নমূল বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের আশ্রয় স্থল।
দীর্ঘকাল ধরে অবহেলায় পড়ে থাকার ফলে বক্সা দুর্গ একসময় কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। তবে আশার কথা হল, প্রশাসন এই ঐতিহাসিক জায়গার অতীত গরিমা ফিরিয়ে দিতে সচেষ্ট হয়েছে। ২০২০ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে অবিকল ১০০ বছর আগের পুরনো চেহারায় দুর্গকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য জোরকদমে সংস্কারের কাজ শুরু হয়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিকদের নজরদারিতে এই হেরিটেজ সংরক্ষণের কাজ অনেকটাই এগিয়েছে।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
