

সেবাস্টিয়ান গঞ্জালভেস টিবাউ। ছবি - AI
২৮শে আগস্ট, ২০২৬
বাংলার প্রথম ক্রিশ্চান শাসক কে? প্রশ্নটা শুনে যে কেউ লর্ড ক্লাইভ বা ওয়ারেন হেস্টিংসের নাম নেবে। কিন্তু বাংলার মসনদে ইউরোপীয় বা ক্রিশ্চান শক্তির আধিপত্যের গল্পটা ক্লাইভকে দিয়ে শুরু হয়নি। পলাশীর ঠিক ১৪৮ বছর আগে মেঘনা নদীর মোহনায় ঘটেছিল এক অবিশ্বাস্য ঘটনা। এক সাধারণ পর্তুগিজ নাবিক, যে আদতে ছিল এক দুর্ধর্ষ জলদস্যু, সে বাংলার একটি আস্ত দ্বীপ দখল করে নিজেকে স্বাধীন রাজা হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন।
সেই ব্যক্তির নাম হল সেবাস্টিয়ান গঞ্জালভেস টিবাউ (Sebastião Gonsalves Tibau)। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বহু আগে, তিনিই ছিলেন অবিভক্ত বাংলার মাটিতে প্রথম স্বাধীন ও সার্বভৌম ক্রিশ্চান শাসক। কোনও দেশের রাজার সনদ নিয়ে তিনি শাসন করেননি। তার পেছনে কোনও সাম্রাজ্যের মদতও ছিল না। শূন্য থেকে শুরু করে স্রেফ তলোয়ারের জোর, চূড়ান্ত ধূর্ততা আর বিশ্বাসঘাতকতায় ভর করে টিবাউ গড়ে তুলেছিল এক নিজস্ব 'জলদস্যু সাম্রাজ্য'।
সময়টা ১৫৮০-এর দশক। পর্তুগালের লিসবনের কাছে সান্তো আন্তোনিও দো তোজাল নামে এক অখ্যাত গ্রামে জন্ম হয়েছিল টিবাউয়ের। পরিবার ছিল ভীষণ গরিব। কৃষক পরিবারে জন্ম নেওয়া টিবাউ বুঝেছিল, ইউরোপে পড়ে থাকলে তার ভাগ্যের চাকা ঘুরবে না। ১৬০৫ সালে তাই জাহাজে করে এসে পৌঁছন ভারতের গোয়ায়। প্রথমদিকে সাধারণ এক সৈনিকের কাজ করতেন। কিন্তু তাতে মন টিকল না। অল্পদিনেই অস্ত্র ছেড়ে ব্যবসায় নামলেন। লবণের ব্যবসা করতে এসে পৌঁছান বাংলার দিয়াঙে (বর্তমান চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর মোহনায়)।
সেই সময় দিয়াঙ ছিল পর্তুগিজদের বড় ঘাঁটি। কিন্তু ১৬০৭ সালে ঘটে গেল এক মর্মান্তিক ঘটনা। আরাকানের রাজা (মগ রাজা) মেং রাজি পর্তুগিজদের ওপর অতর্কিতে হামলা চালিয়েছিলেন। নির্মমভাবে হত্যা করা হয় প্রায় ৬০০ পর্তুগিজকে। ভাগ্যক্রমে একটি জাহাজে করে কয়েকজন মাত্র পালাতে পেরেছিল। সেই দলে ছিলেন টিবাউ। চোখের সামনে স্বজনদের মৃত্যু তাকে পুরোপুরি বদলে দেয়। লবণের ব্যবসায়ী টিবাউ রাতারাতি হয়ে উঠল এক ভয়ঙ্কর জলদস্যু। বাংলার উপকূলবর্তী মানুষ যাদের বলত 'হার্মাদ'।
এরপর টিবাউয়ের নজর পড়ল সন্দ্বীপের দিকে। অর্থনৈতিক এবং সামরিক দিক থেকে মেঘনার মোহনায় থাকা সন্দ্বীপ ছিল সেকালের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্দর। দ্বীপের দখল তখন ফতেহ খান নামের এক আফগান সেনাপতির হাতে। পর্তুগিজদের খতম করার শপথ নিয়ে ফতেহ খান এক বিশাল নৌবহর নিয়ে টিবাউয়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু লাভ হয়নি। জলযুদ্ধে ফতেহ খান পরাজয়ের পাশাপাশি নিজের প্রাণও খোয়ান।
এই জয় টিবাউয়ের উচ্চাকাঙ্ক্ষায় বাড়িয়ে দেয়। তিনি বুঝলেন, সন্দ্বীপ দখল করা সম্ভব। তবে একা নয়। সাহায্য দরকার। এরপর সোজা গেলেন বাকলার (বর্তমান বরিশাল) রাজা রামচন্দ্র বসুর কাছে। রাজার সাথে সামরিক চুক্তি হল। ১৬০৯ সালে টিবাউয়ের জলদস্যু বাহিনী এবং বাকলার রাজার সেনাদল একসঙ্গে সন্দ্বীপ আক্রমণ করে। দীর্ঘ অবরোধের পর পতন হল দ্বীপের। মুসলিম রক্ষীদের কচুকাটা করে টিবাউ। এরপর স্বাধীনভাবে সন্দ্বীপ শাসন করা শুরু করে। এভাবেই বাংলার বুকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল প্রথম কোনও ক্রিশ্চান শাসকের নিজস্ব রাজ্য।
টিবাউয়ের এই শাসনকাল ছিল সেকালের অন্যান্য ইউরোপীয় উপনিবেশগুলোর চেয়ে একেবারেই আলাদা। কারণ ডাচ, ফরাসি বা ব্রিটিশরা ভারতে উপনিবেশ গড়েছিল নিজেদের দেশের রাজার অনুমতি বা সনদের ভিত্তিতে। কিন্তু টিবাউয়ের সন্দ্বীপ ছিল পুরোপুরি ব্যক্তিগত উদ্যোগে তৈরি এক 'পাইরেট কিংডম'। গোয়ার পর্তুগিজ ভাইসরয় বা পর্তুগালের রাজা, কারোরই এর উপর কোনও নিয়ন্ত্রণ ছিল না।
১৬১৬ সালে আরাকান রাজার বিশাল বাহিনীর আক্রমণে টিবাউয়ের এই শাসনের অবসান ঘটে।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
