

গঙ্গা গোবিন্দ সিংহের মায়ের শ্রাদ্ধের প্রতীকী ছবি - AI
১লা সেপ্টেম্বর, ২০২৬
ক্ষমতার দম্ভ থেকে জন্ম নেয় হরেক কেলেঙ্কারি। ইতিহাস সাক্ষী, অষ্টাদশ শতকের বাংলাতেও ঠিক এমনই এক ঘটনা ঘটেছিল। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মদতে মুর্শিদাবাদের এক বাঙালি যা করেছিলেন, তা শুনলে বাঙালি হিসেবে লজ্জা পেতে পারেন। সেই কাহিনী শুনলে আজকের দিনের সিন্ডিকেট চক্রের মাথারা পর্যন্ত চমকে উঠতে পারে।
মাতৃ শ্রাদ্ধ হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে একটি অতি পবিত্র সামাজিক ও ধর্মীয় আচার। কিন্তু প্রথমে সেই মায়ের শ্রাদ্ধকেই নিজের প্রভাব প্রতিপত্তি জাহিরের উপায় করে তোলা এবং তারপর তার বিপুল খরচ তুলতে বাংলার তৎকালীন জমিদারদের কার্যত টুঁটি টিপে ধরেছিলেন। বাস্তবিক অর্থেই তোলাবাজি করে মায়ের শ্রাদ্ধের প্রায় ১২ লক্ষ টাকা অন্যদের থেকে জোগাড় করেছিলেন গঙ্গা গোবিন্দ সিংহ। আজকের দিনে ওটা কয়েকশো কোটি টাকার বেশি হবে। এই প্রসঙ্গে বলে রাখা, এই গঙ্গা গোবিন্দ সিংহ'ই কান্দি রাজ পরিবারে প্রতিষ্ঠাতা ও শ্রী বৃদ্ধি ঘটানোর প্রাণপুরুষ।
মুর্শিদাবাদের কান্দির এক সাধারণ পরিবারে জন্ম হয়েছিল গঙ্গা গোবিন্দ সিংহ'সর। তবে অল্প বয়স থেকেই সুযোগ বুঝে ক্ষমতাশালীদের কাছাকাছি পৌঁছনোর এক অদ্ভুত সহজাত দক্ষতা ছিল তার।
পলাশীর যুদ্ধ শেষে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার রাজস্ব ব্যবস্থার রাশ নিজেদের হাতে নিতে চাইছিল। তাদের এমন একজন দেশীয় মানুষের প্রয়োজন ছিল, যার নখদর্পণে রয়েছে বাংলার জমির নাড়িনক্ষত্র। গঙ্গা গোবিন্দ ঠিক সেই শূন্যস্থানটাই পূরণ করেছিলেন। ১৭৭৬ সালে বড়লাট হয়ে এসে ওয়ারেন হেস্টিংস বাংলার রাজস্ব ব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেন। এই উপলক্ষে গঠন করেন 'আমিনি কমিশন'। তার ব্যক্তিগত দেওয়ান ও ঘনিষ্ঠ গঙ্গা গোবিন্দ সিংহ-কে সেই কমিশনের প্রধান দেওয়ান করে দেন। হলে বাংলার জমিদার, ইজারাদার, দেওয়ান সকলের আয়ের যাবতীয় গোপন তথ্য তাঁর হাতের মুঠোয় চলে আসে।
হেস্টিংস গঙ্গা গোবিন্দ-কে অন্ধের মতো বিশ্বাস করতেন। আর সেই ব্রিটিশ ছত্রচ্ছায়াই তাঁকে রাতারাতি বাংলার অঘোষিত 'রাজস্ব-সম্রাট' করে তোলে।
তৎকালীন বাংলার রাজস্ব ব্যবস্থার কার্যত একচেটিয়া নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে গঙ্গা গোবিন্দ শুধু যে কোম্পানির কোষাগার ভরছিলেন, তা নয়। পাশাপাশি ফুলেফেঁপে উঠছিল তাঁর নিজস্ব সম্পত্তিও।
কৌশলটা ছিল বড়ই নির্মম। যেসব জমিদার কোম্পানির নির্ধারিত বিপুল কর মেটাতে পারতেন না, তাঁদের জমিদারি নিলামে উঠত। গঙ্গা গোবিন্দ সেই নিলামে কলকাঠি নেড়ে বেনামে জলের দরে ওই জমিদারিগুলো কিনে নিতেন। এভাবেই একসময় হুগলি, বর্ধমান, নদিয়া থেকে মুর্শিদাবাদ পর্যন্ত গড়ে ওঠে তাঁর বিশাল 'কান্দি এস্টেট'। প্রতিষ্ঠা করেন কান্দি রাজ পরিবার। অন্যের সর্বনাশের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে তিনি হয়ে ওঠেন বাংলার অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি।
ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে বিপুল সম্পত্তি করলেও গঙ্গা গোবিন্দের মনে একটা আক্ষেপ রয়েই গিয়েছিল। বিপুল বিত্ত থাকা সত্ত্বেও রক্ষণশীল হিন্দু সমাজে, বিশেষত কুলীন ব্রাহ্মণদের কাছে তিনি তেমন কোনও সামাজিক স্বীকৃতি পেতেন না। কারণ, জাতিতে তিনি ছিলেন সদগোপ।
হিন্দু সমাজের কুলীন শ্রেণির কাছে কদর পেতে মায়ের শ্রাদ্ধকেই পাখির চোখ করেন গঙ্গা গোবিন্দ সিং। সিদ্ধান্ত নেন, মায়ের এমন এক এলাহি শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করবেন, যা দেখে বাংলার সমস্ত পণ্ডিত ও ব্রাহ্মণ সমাজ তাঁর পায়ের কাছে এসে মাথা নোয়াতে বাধ্য হবে। কিন্তু গোল বাঁধল খরচের অঙ্কে। বিপুল সম্পত্তি থাকলেও নিজস্ব কোষাগার থেকে অর্থ খরচ করে এইসব কিছু করতে তিনি রাজি ছিলেন না। তাহলে উপায়?
আমিনি কমিশনের দেওয়ান হওয়ার সুবাদে গঙ্গা গোবিন্দ বাংলার সমস্ত ছোট-বড় জমিদার, তালুকদার এবং ইজারাদারদের কাছে একটি অলিখিত ফতোয়া জারি করলেন। যা মাগন নামে পরিচিত ছিল। অর্থাৎ এক ধরনের বেআইনি আবদার বা সহজ কথায় বললে প্রাতিষ্ঠানিক জুলুমবাজি।
তৎকালীন বাংলার প্রত্যেক জমিদারের বার্ষিক রাজস্বের অনুপাতে এই চাঁদার অঙ্ক নির্দিষ্ট করে দিয়েছিল গঙ্গা গোবিন্দ। পদ্ধতিটি ছিল একেবারে মাফিয়াদের মতো। তাঁর মায়ের শ্রাদ্ধের জন্য কেউ উপঢৌকন বা চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে বা টালবাহানা করলে জুটত সরাসরি হুমকি। ভয় দেখানো হত, সরকারি খাতায় তাঁদের জমির আয় কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেখানো হবে অথবা নিলামে তুলে দেওয়া হবে সাধের জমিদারি। প্রাণের ভয়ে আর ভিটেমাটি বাঁচানোর তাগিদে জমিদাররা মহাজনদের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে গঙ্গা গোবিন্দের মায়ের শ্রাদ্ধের 'প্রণামী' মেটাতে বাধ্য হন।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় ছিল, ওয়ারেন হেস্টিংস সব জেনেও টুঁ শব্দটুকু করেননি।
তৎকালীন বাংলার ছোট-মেজ-বড় জমিদারদের রক্ত নিংড়ানো টাকায় কান্দিতে এলাহী আয়োজন করে মায়ের শ্রাদ্ধের আসর বসিয়েছিলেন গঙ্গা গোবিন্দ সিংহ। এর জন্য বাংলা, বিহার, ওড়িশা তো বটেই। সুদূর কাশী, কনৌজ থেকেও লক্ষাধিক ব্রাহ্মণ ও পণ্ডিতকে আমন্ত্রণ জানিয়ে নিয়ে আসেন। আয়োজন এতটাই বিশাল ছিল যে চাল, ডাল, চিনি আর ময়দার রীতিমতো পাহাড় তৈরি হয়েছিল। জনশ্রুতি আছে, রান্নার সুবিধার জন্য নাকি ঘিয়ের পুকুর তৈরি করা হয়েছিল! অর্থাৎ বিশাল পুকুর কেটে সেখানে ঘি ঢালা হয়েছিল।
বিদায়বেলায় প্রত্যেক ব্রাহ্মণ ও পণ্ডিতকে দেওয়া হয়েছিল দামি শাল, রেশমি বস্ত্র, হাতির দাঁতের পালঙ্কি এবং রূপোর মোহর। অনেককে তিনি হাতি ও ঘোড়াও দান করেছিলেন। টাকার দম্ভে সেদিনের আসরে সত্যিই মাথা ঝুঁকিয়েছিলেন তাবড় পণ্ডিতেরা।
গঙ্গা গোবিন্দের সামাজিক স্বীকৃতির উদ্দেশ্য এর ফলে হয়তো সফল হয়েছিল। কিন্তু এই আড়ম্বরের নেপথ্যে বাংলার জমিদাররা যে ভয়াবহ প্রাতিষ্ঠানিক তোলাবাজির সম্মুখীন হয়েছিলেন, তা বাংলার গ্রামীণ অর্থনীতিতে মারাত্মক রক্তক্ষরণ ঘটিয়েছিল।
শ্রাদ্ধের চাঁদা জোগাড় করতে গিয়ে বহু পুরোনো ও বনেদি জমিদারি আক্ষরিক অর্থেই দেউলিয়া হয়ে যায়। ঋণের দায়ে জর্জরিত জমিদাররা আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেননি। কিছুদিনের মধ্যেই রাজস্ব মেটাতে না পারায় তাদের জমিদারি নিলামে ওঠে। আর সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে গঙ্গা গোবিন্দ আরও বহু জমিদারি গ্রাস করেন।
ইতিহাস অবশ্য এর বিচার করেছিল অন্যভাবে। ১৭৮৭ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস যখন ইংল্যান্ডে অভিশংসন বা ইমপিচমেন্টের মুখে পড়েন, তখন প্রখ্যাত ব্রিটিশ বাগ্মী এডমন্ড বার্ক তাঁর ঐতিহাসিক বক্তৃতায় এই দুর্নীতির কথা তুলে ধরেন। বার্ক অত্যন্ত কড়া ভাষায় বর্ণনা করেছিলেন, কীভাবে হেস্টিংস এই গঙ্গা গোবিন্দকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে বাংলার সাধারণ মানুষ এবং জমিদারদের উপর লুঠতরাজ চালিয়েছেন।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
