১২ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
বাঙালিকে প্রতিষ্ঠানিক দুর্নীতি শিখিয়েছে কলকাতার ঘোষাল পরিবার!

গোকুলচন্দ্র ঘোষালের প্রতীকী ছবি - AI

বাঙালিকে প্রতিষ্ঠানিক দুর্নীতি শিখিয়েছে কলকাতার ঘোষাল পরিবার!

calender icon 2 ১লা সেপ্টেম্বর, ২০২৬

মূল বিষয়

বর্তমানে খবরের কাগজ খুললে, নিউজ পোর্টালে চোখ রাখলে বা টিভিতে সর্বক্ষণের খবরের চ্যানেলগুলোয় গেলেই এক ধরণের খবর বড় বেশি চোখে পড়ে। প্রভাবশালী কোনও রাজনৈতিক নেতার বেনামি সম্পত্তি, স্বজনপোষণ অথবা সরকারি নথিতে কারচুপি করে বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ, জায়গা জমি আত্মসাৎ করে নেওয়া। বা প্রতিষ্ঠানকে কাজে লাগিয়ে একসঙ্গে বহু মানুষকে চাকরি অথবা কোন‌ও কিছু পাইয়ে দেওয়ার নাম করে নির্লজ্জ প্রতারণা করা।

দিনের পর দিন এমনটা দেখতে দেখতে আমরা কিছুটা যেন অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি। আপনারা অনেকে ভাবেন, যতদিন যাচ্ছে রাজনীতি বুঝি ক্রমশ আর‌ও বেশি বেশি করে পচে যাচ্ছে। যদিও এই বিষয়টা নিয়ে অনেক বিতর্কে এর জায়গা আছে। তবে দুর্নীতির এই যে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ, এর শেকড় ঠিক কোথায় জানেন? মানে এর শুরুটা এই বাংলায় কবে হয়েছিল জানেন কি?

ইতিহাস বলছে, আজ থেকে ২০০ বছরেরও বেশি সময় আগে থেকে এই বাংলার বুকেই এমন সব প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির শিকড় গাঁথা হয়েছিল। তা আড়ে বহরে যা ছিল তাতে আজকের নেতা-মন্ত্রীরা পর্যন্ত লজ্জা পেতে পারে।

আঠারো শতকের বাংলাতে এক আশ্চর্য দক্ষতায় বেনামে জমি-দুর্নীতির 'ব্লু-প্রিন্ট' তৈরি হয়েছিল। আর লজ্জাজনকভাবে সেই চিত্রনাট্যের প্রধান রূপকার ছিলেন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাঙালি দেওয়ান গোকুলচন্দ্র ঘোষাল। সেই বিপুল প্রাতিষ্ঠানিক জমি কেলেঙ্কারি বাংলার ইতিহাসে 'নোয়াবাদ' দুর্নীতি বা কেলেঙ্কারি নামে পরিচিত।

নোয়াবাদ কেলেঙ্কারির প্রেক্ষাপট

সময় ১৭৬০ সাল। বাংলার নবাব মীর কাশিম বাধ্য হলেন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে চট্টগ্রামের শাসনভার তুলে দিতে। কোম্পানির তরফ থেকে চট্টগ্রামের দায়িত্ব নিয়ে হাজির হন হ্যারি ভেরেলস্ট। কিন্তু এই ব্রিটিশ ভদ্রলোক স্বাভাবিকভাবেই এদেশের ভূপ্রকৃতি চেনেন না, ভাষা বোঝেন না। এখানকার রাজস্ব ব্যবস্থাও তাঁর কাছে ছিল গোলকধাঁধার মতো। এই অবস্থায় তিনি কার্যত চোখ-কান হিসেবে তাঁর অত্যন্ত বিশ্বস্ত 'বেনিয়ান' বা সহকারী গোকুলচন্দ্র ঘোষালের উপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করতেন। এই সুযোগটাকে দারুনভাবে কাজে লাগালেন গোকুলচন্দ্র ঘোষাল। ভেরেলস্টের উপর প্রভাব বিস্তার করে নিজেকে চট্টগ্রামের দেওয়ান পদে বসিয়ে নেন। এরপর ১৭৬১ সালে কার্য তার তত্ত্বাবধানেই চট্টগ্রামে শুরু হয় প্রথম ব্রিটিশ ভূমি জরিপ।

চট্টগ্রামের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য বাংলার অন্যান্য জায়গা থেকে একটু আলাদা। সেখানে পাহাড় ও জঙ্গল কেটে স্থানীয় কৃষকরা যুগ যুগ ধরে যে নতুন আবাদি জমি তৈরি করতেন, তাকে বলা হতো 'নোয়াবাদ' বা নতুন আবাদ। এই জমিগুলোকেই টার্গেট করে ফন্দি আঁটেন গোকুলচন্দ্র।

এই জমি জালিয়াতি করার জন্য সুকৌশলে গোকুলচন্দ্র ঘোষাল 'মনিব' ভেরেলস্টের নাম ও সই জাল করেছিলেন! এইভাবে তিনি ভেরেলস্টের নাম করে কোম্পানির আদেশনামা হিসেবে এক সম্পূর্ণ ভুয়ো ও জাল নির্দেশনামা তৈরি করেছিলেন। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সরকারি সেই জাল নথিতে বলা হয়, চট্টগ্রামের সমস্ত নোয়াবাদ জমির একচ্ছত্র মালিকানা দেওয়া হচ্ছে জয়নারায়ণ ঘোষালকে।

জয়নারায়ণ ঘোষাল কে?

জয়নারায়ণ ঘোষাল হলেন গোকুলচন্দ্র ঘোষালের নিজের ভাইপো। গোকুলচন্দ্র নিঃসন্তান ছিলেন।আজকের দিনে যেমন দুর্নীতিগ্রস্ত নেতারা নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে সন্তান, ভাইপো, শ্যালক, বাড়ির কাজের লোক, গাড়ির চালকের নামে বেনামি সম্পত্তি কেনে; গোকুলচন্দ্র ঘোষাল প্রায় আড়াইশো বছর আগেই ঠিক সেই কাজটাই করেছিলেন। এক্ষেত্রে তাকে দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদদের পথপ্রদর্শক বলা যেতে পারে!

এভাবেই ব্রিটিশদের চোখের আড়ালে রাতারাতি চট্টগ্রামের হাজার হাজার একর জমি ঘোষাল পরিবারের ব্যক্তিগত মালিকানাধীন হয়ে যায়। এভাবেই তারা ওখানকার একছত্র জমিদারি লাভ করে।

ক্ষমতার দম্ভ এবং শোষণ

আরও পড়ুন
বাংলার বুকে প্রথম ক্রিশ্চান রাজত্ব গড়েছিল এক জলদস্যু!
রাজহত্যা না করলে সিংহাসন নয়! বঙ্গে বিচিত্র প্রথা
বঙ্গে কৌলিন্য প্রথার জনক বল্লাল সেনের সঙ্গে ‘চণ্ডাল’ মহিলার প্রেম!

কাগজে-কলমে জমি লিখিয়ে নিয়েই গোকুলচন্দ্র ঘোষাল থেমে যাননি। তিনি সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করে নির্দেশ জারি করেছিলেন, যেসব স্থানীয় জমিদার বা তালুকদার আগে থেকেই ওই জমিগুলোতে চাষাবাদ বা পরিচালনা করেছেন, তাঁদের এখন থেকে জয়নারায়ণের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে এবং বাড়তি কর গুনতে হবে।

এর প্রভাব ছিল ভয়ঙ্কর। যুগ যুগ ধরে যে কৃষকরা জঙ্গল কেটে জমি বাসযোগ্য করেছিলেন, তাঁরা রাতারাতি নিজেদের মাটিতেই পরবাসী বা প্রজা হয়ে পড়েন। এদিকে চট্টগ্রামের প্রকৃত জমিদাররাও এই ঘোষাল পরিবারের হাতে সর্বস্বান্ত হতে শুরু করে। অনেক পরিবার, বহু মানুষের জীবন শেষ হয়ে যায়। ফলস্বরূপ শুরু হয় এক দীর্ঘস্থায়ী আইনি ও সামাজিক লড়াই, যা ব্রিটিশ প্রশাসনকে পরবর্তী দেড়শো বছর ধরে ভুগিয়েছিল।

চট্টগ্রামের অর্থে কলকাতায় ঘোষালদের বাবুয়ানি

চট্টগ্রামের মানুষের রক্ত ঘাম করা টাকা রাজস্ব হিসাবে সোজা চলে আসত কলকাতায়। সেই বিপুল অর্থে খিদিরপুরে ঘোষালরা গড়ে তোলে বিলাসবহুল 'ভূকৈলাস রাজবাড়ি'। তার ভিতরে প্রতিষ্ঠিত হয় দুটি বিশাল শিবমন্দির, যা আজও কলকাতার অন্যতম ঐতিহ্য।

পাপের টাকায় পুণ্য কেনার এই যে সংস্কৃতি, আজকের রাজনীতির সঙ্গে খুব বেশি কি তফাৎ আছে? একটু ভেবে দেখুন।

আজকের রাজনীতিতে গোকুলচন্দ্র ঘোষালদের ছায়া

গোকুলচন্দ্র ঘোষালের এই জালিয়াতির সঙ্গে আজকের দিনের রাজনৈতিক দুর্নীতির একটা অদ্ভুত এবং বিপজ্জনক মিল রয়েছে। আজকের রাজনীতিতে আমরা অহরহ দেখি 'বেনামি লেনদেন' বা 'শেল কোম্পানি'র ব্যবহার। ক্ষমতাশালী ব্যক্তিরা সরাসরি নিজের নামে কিছু করেন না, বরং প্রক্সির মাধ্যমে বিপুল সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলেন।

এই যেমন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চলা 'জমি মাফিয়া' বা রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে থাকা প্রমোটার চক্রের কথা বলা যেতে পারে। হাইওয়ে তৈরি বা শিল্পায়নের (SEZ) নামে কৃষকের উর্বর জমি জলের দরে অধিগ্রহণ করা হয় সরকারি বিজ্ঞপ্তির ভয় দেখিয়ে। তারপর সেই জমিই কয়েক গুণ বেশি দামে বিক্রি করে দেওয়া হয় কর্পোরেটদের কাছে। মাঝখান থেকে কাটমানি আর বেনামি প্লট চলে যায় রাজনৈতিক দাদাদের পকেটে। খাস জমি বা আদিবাসীদের জমি জবরদখল করে রিসর্ট বানানোর যেসব কেলেঙ্কারি আজ আমরা দেখছি, তার চরিত্র গোকুলচন্দ্র ঘোষালের সেই নোয়াবাদ জালিয়াতির চেয়ে বিন্দুমাত্র আলাদা নয়। কৌশল সেই একই- প্রশাসনের শীর্ষ স্তরের অজ্ঞতা বা উদাসীনতাকে কাজে লাগিয়ে নথিপত্রের জালিয়াতি এবং তারপর সবকিছু দখল করে নেওয়া।

একটি সফল 'হোয়াইটওয়াশ'

দুর্নীতির পরিণতির দিক থেকেও গোকুলচন্দ্র ঘোষালের কেস স্টাডি আজকের দিনের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। আজকের অনেক নেতাই দুর্নীতি ধরা পড়ার আগে ক্ষমতা ও অর্থের জোরে সমাজসেবকের মুখোশের আড়ালে নিজের দুর্নীতিগ্রস্ত মুখটাকে লুকিয়ে ফেলেন। ঘোষালদের ক্ষেত্রেও ঠিক সেটাই ঘটেছিল।

১৭৭৯ সালে গোকুলচন্দ্র ঘোষালের মৃত্যু হয়। অর্থাৎ দুর্নীতি ধরা পড়ার আগেই তিনি একজন প্রবল প্রতাপশালী ও সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবেই এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুর বহু বছর পর, ১৭৯৭ সালে ব্রিটিশ কাউন্সিল অবশেষে বুঝতে পারে যে হ্যারি ভেরেলস্টের ওই নির্দেশনামাটি গোটাটাই জাল ছিল। এরপর তারা জয়নারায়ণ ঘোষালের নোয়াবাদ এস্টেটের স্বত্ব বাতিল করে।

কিন্তু ততদিনে যা হওয়ার হয়ে গেছে। জয়নারায়ণ ঘোষাল পরিস্থিতি বেগতিক দেখে তাঁর বিপুল সম্পদ নিয়ে বারাণসীতে পাড়ি দেন। সেখানে গিয়ে তিনি শুরু করেন দেদার জনহিতকর কাজ। প্রতিষ্ঠা করেন 'জয়নারায়ণ হাই স্কুল', যা আজও বারাণসীর বুকে দাঁড়িয়ে আছে। এই বিপুল সমাজসেবা এবং কূটনীতির জোরে মুঘল সম্রাট তাঁকে 'মহারাজা বাহাদুর' উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।

দুর্নীতির কালো টাকা এভাবে সমাজসেবার মোড়কে চিরতরে সাদা হয়ে গেল। কোন‌ও শাস্তি হল না, উল্টে ঘোষাল পরিবার পেলেন আভিজাত্য আর সম্মানের তকমা। আজকের দিনেও যখন আমরা দেখি কোনও দুর্নীতিগ্রস্ত নেতা কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করে বড় বড় ট্রাস্ট, হাসপাতাল বা স্কুল চালাচ্ছেন, আর সমাজের মাথা হয়ে বসে আছেন, তখন বুঝতে অসুবিধা হয় না যে ইতিহাস আসলে বারে বারে ঘুরে আসে। গোকুলচন্দ্র বা জয়নারায়ণ ঘোষালরা মরেন না, তাঁরা শুধু যুগ ভেদে নাম আর রাজনৈতিক দলের রং পালটে আমাদের শাসন কাঠামোর মধ্যেই যুগের পর যুগ ধরে দিব্যি বেঁচে থাকেন।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
কৌস্তভ ভৌমিক
কৌস্তভ ভৌমিক

কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য