

প্রতীকী ছবি -AI
২৭শে আগস্ট, ২০২৬
ক্ষমতার মোহ বরাবরই মানুষকে অন্ধ করে দেয়। কিন্তু সিংহাসন দখলের জন্য রাজহত্যাকে রীতিমতো একটি 'প্রথা'-তে পরিণত করার নজির বিশ্ব ইতিহাসে খুব একটা নেই। অথচ এই বিস্ময়কর, রোমহর্ষক ঘটনাটি ঘটেছিল আমাদের এই বাংলাতেই! যে ব্যক্তি বর্তমান সুলতানকে হত্যা করে সিংহাসনে বসতে পারবে, সেই হবে রাজ্যের নতুন সুলতান- পনেরো শতকের শেষের দিকে একটা সময়ের জন্য এটাই হয়ে দাঁড়িয়েছিল তৎকালীন বঙ্গের রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক প্রথা।
প্রাচীন বঙ্গের মতো এমন এক সমৃদ্ধ অঞ্চলে এই ভয়ঙ্কর প্রথার জন্ম হলো কীভাবে, তা জানতে হলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে ইলিয়াস শাহি বংশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাসক সুলতান রুকনউদ্দিন বারবক শাহের রাজত্বকালের দিকে। তাঁর নেওয়া একটি আপাত-নিরাপত্তামূলক সিদ্ধান্তই যে বঙ্গের ইতিহাসে অত্যন্ত কলঙ্কজনক অধ্যায় হয়ে দাঁড়াবে, তা হয়ত তিনি ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেননি।
১৪৫৯ সালে সুলতান রুকনউদ্দিন বারবক শাহ বঙ্গের সিংহাসনে বসেন। শাসক হিসেবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সুদক্ষ। তাঁর আমলে সাম্রাজ্যের সীমানা যেমন বেড়েছিল, তেমনই শিল্প-সাহিত্যেরও অভাবনীয় বিকাশ ঘটেছিল। কিন্তু রাজপ্রাসাদের ভেতরের ছবিটা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। দেশীয় এবং তুর্কি-আফগান অভিজাতরা (আমির-ওমরাহ) ততদিনে অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। তারা সুযোগ পেলেই সুলতানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করত।
চারপাশের এই বিশ্বাসহীনতার বাতাবরণে বারবক শাহ প্রমাদ গোনেন। তাঁর মনে হয়, এই স্বার্থান্বেষী দেশীয় সেনাপতিদের উপর নির্ভর করা বোকামি হবে। তাই তিনি এক অভিনব উপায় বের করেন। সুদূর পূর্ব আফ্রিকার ইথিওপিয়া (বা আবিসিনিয়া) থেকে তিনি প্রায় আট হাজার 'হাবশি' দাস কেনেন।
সুলতানের যুক্তি ছিল খুব সোজা। এই হাবশিদের বাংলায় কোনও রাজনৈতিক শেকড় বা আত্মীয়স্বজন নেই। তাই এরা স্থানীয়দের মতো ক্ষমতার লোভে ষড়যন্ত্র করবে না, বরং প্রভুর প্রতি অন্ধ অনুগত থাকবে। বারবক শাহ এই বিশাল হাবশি বাহিনীকে কেবল প্রাসাদরক্ষী হিসেবেই সীমাবদ্ধ রাখেননি, তাদের সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের বড় বড় পদেও বসিয়েছিলেন। আর এখানেই তিনি করে ফেলেন তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় এবং মারাত্মক ভুলটি।
১৪৭৪ সালে বারবক শাহের স্বাভাবিক মৃত্যুর পর বাংলার রাজনৈতিক সমীকরণ দ্রুত বদলাতে শুরু করে। তাঁর জীবদ্দশায় হাবশিরা বাধ্য থাকলেও, তাঁর মৃত্যুর পর তারা নিজেদের আসল ক্ষমতা উপলব্ধি করতে সফল হয়। তারা দেখে, রাজপ্রাসাদের চাবিকাঠি, সৈন্যবাহিনী এবং নতুন সুলতানের নিরাপত্তা- সবকিছুই আক্ষরিক অর্থে তাদের হাতের মুঠোয় ছিল।
এই চরম উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রথম প্রকাশ বা বিপদ ঘটে ১৪৮৭ সালে। বারবক শাহের ভাইপো সুলতান জালালউদ্দিন ফতেহ শাহ হাবশিদের এই ক্রমবর্ধমান ক্ষমতা খর্ব করার চেষ্টা করেন। হিল হয় বিপরীত। হাবশি সেনাপতি সুলতান শাহজাদা খোদ প্রাসাদের ভেতরেই ফতেহ শাহকে নিষ্ঠুরভাবে গুপ্তহত্যা করেছিলেন এবং নিজে সিংহাসন দখল করেন।
সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হল, এই রাজহত্যার পর রাজ্যের অভিজাত শ্রেণি, সৈন্যবাহিনী বা সাধারণ মানুষ কেউ টুঁ শব্দটি করেনি! তারা অতি সহজেই এই ক্ষমতা দখলকে মেনে নেয়। আর এই নীরবতার সুযোগ নিয়েই জন্ম নেয় তৎকালীন বঙ্গের সেই কুখ্যাত ও অদ্ভুত প্রথা।
মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা জহিরুদ্দিন মুহম্মদ বাবর তাঁর আত্মজীবনী 'বাবরনামা'-তে বঙ্গ বা বাংলার এই সময়কার রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব নিয়ে চমৎকার এবং তীব্র বিস্ময়পূর্ণ এক বিশ্লেষণ রেখে গেছেন।
বাবর লিখছেন, "বাংলার একটি অদ্ভুত প্রথা হল, বংশানুক্রমিক উত্তরাধিকারের চেয়ে সিংহাসন দখলই সেখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।" বাবরের মতে, বাংলার মানুষ বা সেনাবাহিনী কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা রাজবংশের প্রতি অনুগত ছিল না; তাদের সমস্ত আনুগত্য ছিল ওই 'মসনদ' বা রাজকীয় কোষাগারের প্রতি।
বাবর আরও বিস্ময়ের সঙ্গে উল্লেখ করে গিয়েছেন, যদি কোনও ব্যক্তি, সে হোক কোনও সেনাপতি বা সাধারণ রক্ষী, তৎকালীন সুলতানকে হত্যা করে কোনওভাবে একবার সিংহাসনে বসতে পারে, তবে সমস্ত সৈন্য এবং প্রজারা নির্দ্বিধায় তার বশ্যতা স্বীকার করে নেয়। কেউ জানতে চায় না সে কে বা কেন সে রাজহত্যা করল। নতুন সুলতান তখন আগের সুলতানের মতোই সমান সম্মান ও ক্ষমতা ভোগ করে। বাবরের এই তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ প্রমাণ করে, বাংলার রাজনীতি সেই সময়ে কতটা নীতিহীন ও সুযোগসন্ধানী হয়ে উঠেছিল।
১৪৮৭ থেকে ১৪৯৩ এই মাত্র ছয় বছরকে বাংলার ইতিহাসে 'হাবশি শাসন' বলা হয়। কিন্তু এই ছোট্ট সময়টাই ছিল বাংলার এক প্রবল রক্তাক্ত অধ্যায়। এই ছয় বছরে মোট চারজন হাবশি সুলতান সিংহাসনে বসেছিলেন, এবং আশ্চর্যের বিষয় হল এদের মধ্যে তিনজনই পূর্ববর্তী সুলতানকে হত্যা করে ক্ষমতায় এসেছিলেন!
রাজপ্রাসাদ হয়ে উঠেছিল ষড়যন্ত্রের এক চিরস্থায়ী আঁতুড়ঘর। রাজার কোনও নিরাপত্তা ছিল না। রক্ষীরাই রাজা হতে চাইছে, আবার সেই রাজাকে মেরে আরেকজন রক্ষী সিংহাসন দখল করছে। চরম অরাজকতা, লুণ্ঠন আর গুপ্তহত্যায় বাংলার জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। এর চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় সিদি বদর বা শামসুদ্দিন মুজাফফর শাহের রাজত্বকালে। তাঁর সীমাহীন অত্যাচারে পিঠ দেওয়ালে ঠেকে যায় বাংলার মানুষের।
অবশেষে ১৪৯৩ সালে বাংলার অভিজাতরা একজোট হয়ে বিদ্রোহ করেন। সিদি বদরকে হত্যার মধ্য দিয়ে পতন ঘটে হাবশি শাসনের। সিংহাসনে বসেন এক বিচক্ষণ এবং দূরদর্শী প্রশাসক সৈয়দ হোসেন মক্কা, যিনি ইতিহাসে 'আলাউদ্দিন হোসেন শাহ' নামে অমর হয়ে আছেন।
ক্ষমতায় এসেই হোসেন শাহ বুঝতে পেরেছিলেন, ওই হাবশি বাহিনীকে রাজ্যে রাখা মানেই ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরির উপর বসে থাকা। তাই তিনি কঠোর হাতে সমস্ত হাবশিদের বাংলা থেকে চিরতরে বিতাড়িত করেন। এভাবেই অবসান ঘটে রাজহত্যার সেই অদ্ভুত, রোমহর্ষক প্রথার।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
