

শেষ আন্তর্জাতিক গোল দিদিমা সেলিয়াকে উৎসর্গ মেসির। ছবি - Google
এতদিন জেনে এসেছিল, আর্জেন্টিনা দল মানে লিওনেল মেসি। মারাদোনার পরে এমন কেউ, যিনি পুরো দলের একটাই আত্মা। ‘ভিনগ্রহী’ এই মানুষটা এই দলে ছিলেন ২১ বছর। অনেকের জন্মের আগে থেকে, অনেকের বড় হওয়ার পুরোটা জুড়ে।
হাজার হাজার মানুষের গর্জন। বুয়েনস আয়ার্সের মনুমেন্টাল স্টেডিয়াম যেন কেঁপে উঠছে। জাতীয় দলের জার্সিতে শেষবারের মতো মাঠে নামা মানুষটিকে শেষবারের মতো অভিবাদন জানাচ্ছে আর্জেন্টিনা। চারপাশে একটাই ধ্বনি, ‘মেসি...মেসি...মেসি...’।
স্লোগান নয়, যেন প্রার্থনার মতো কিছু শোনাচ্ছিল সেইসময়। যাঁরা গাইছেন, তাঁদের কেউ কেউ শিশু, কেউ কেউ আবার খুব প্রবীণ’ও। সবাইকে বিদায়বেলায় এক করে দিলেন রাজপুত্র। তাঁরা এতদিন জেনে এসেছিল, আর্জেন্টিনা দল মানে লিওনেল মেসি। মারাদোনার পরে এমন কেউ, যিনি পুরো দলের একটাই আত্মা। ‘ভিনগ্রহী’ এই মানুষটা এই দলে ছিলেন ২১ বছর। অনেকের জন্মের আগে থেকে, অনেকের বড় হওয়ার পুরোটা জুড়ে।
একটা দেশে অনেক ভাগাভাগি থাকে। অনেক দল, অনেক মত। কিন্তু আজ আর্জেন্টিনা কয়েক ঘণ্টার জন্য ভুলে গিয়েছিল সব ভাগাভাগির কথা। আবেগ সবাইকে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। তাদের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবলার, হয়তো সেরাই, জাতীয় দলকে বিদায় বলে দিলেন। শেষবার আর্জেন্টিনা দলের জার্সি পরলেন।
মেসি কাঁদছিলেন স্টেডিয়ামে ঢোকার আগেই। বাসে বসে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিলেন। চোখের সামনে যেন ভেসে উঠছিল জাতীয় দলের জার্সিতে কাটানো দুই দশকের বেশি সময়। নিজের জীবনটাই যেন সিনেমার মতো লাগছিল সেইসময়। চোখের জল বাধ মানেনি, মানবেই বা কী করে!
মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে পৌঁছে আরও একবার আবেগের ধাক্কা। সাজানো ড্রেসিংরুম, চারিপাশে মেসিকে ঘিরে স্মৃতির আবহ। ফোন করে আগেই নিশ্চিত করেছিলেন, স্ত্রী আন্তোনেলা ও তিন সন্তান ভিআইপি বক্সে আছে কিনা। তারপর একের পর এক আবেগের মুহূর্ত। ওয়ার্মআপে নামার সময় গ্যালারি যখন উঠে দাঁড়াল, তিনি কান্না চেপে রাখার চেষ্টা করলেন, পারলেন না পুরোপুরি। শুধু হাত তুললেন, এক দিকে, আরেক দিকে, সব দিকেই। মাঠে প্রবেশ করে আকাশের দিকে তাকালেন মেসি। সঙ্গে তিন ছেলে। জাতীয় সংগীত বাজছে। কিন্তু এবার মেসি গলা মেলালেন না। গলায় তখন আবেগের বিশাল এক দলা। বারবার দেখা যাচ্ছিল কন্ঠনালী একবার উঠছে, আর নামছে। কষ্টকে আটকানোর চেষ্টা করছিলেন।
সেই মুহূর্তে যেন ফিরে গেলেন ছোট্ট লিওর কাছে। হয়তো মনে পড়ে গিয়েছিল দিদিমা সেলিয়ার কথা। হাত ধরে মাঠে নিয়ে যেতেন খেলা দেখতে। প্রথম কোচ সালভাদোর আপারিসিওকে একদিন সেলিয়া বলেছিলেন, ‘ওকে নামান, ও ম্যাচ বাঁচিয়ে দেবে।’ উত্তরটাও প্রায় স্পষ্ট মনে আছে মেসির, ‘ম্যাডাম, ও খুব ছোট, ওকে মেরে ফাটিয়ে দেবে। দিদিমা তবুও নাছোরবান্দা, ‘স্যার, আমার নাতিকে একবার মাঠে নামান।’
দিদিমাকেই মেসি তাঁর সাম্প্রতিক অ্যালবাম ‘লাস্ট ডান্স’ উৎসর্গ করেছেন, সঙ্গে বাবা হোর্সে মেসির জন্যও। ফুটবলের প্রতি তাঁর যে ভালবাসা, সেগুলি শুধুই ওই দুটি মানুষের জন্যই। আজ যার শেষ অধ্যায়টা শেষ হল! বিদায়ী ম্যাচেও প্রতিটি ফুটবল কালচার মানলেন মেসি। টসের পরে বেনিনের অধিনায়কের হাতে তুলে দিলেন আর্জেন্টিনার পতাকা। বেনিনের অধিনায়কও তাঁর হাতে তুলে দিলেন সঙ্গে আনা বিশেষ উপহার। সতীর্থদের প্রত্যেককে আলিঙ্গন করলেন। তারপর শুরু হল সেই ম্যাচ, যেটি আসলে ম্যাচের চেয়েও অনেক বেশি কিছু।
প্রথমে ছন্দ পাচ্ছিলেন না মেসি, দলও না। বেনিনের ফুটবলাররা একে একে মেসির কাছে এসে আলিঙ্গন করছিলেন। শ্রদ্ধা জানাচ্ছিলেন। মিনিট দশেকের সময় তো খেলাও একটু থেমে গেল সেই কারণে। তারপর মেসির যেন মনে হল, আনুষ্ঠানিকতা যত দ্রুত শেষ করা যায়, ততই ভাল। কারণ তিনি শেষবার মাঠে নেমেছেন দলকে জেতাতে, সমর্থকদের মুখে হাসি ফোটাতে।
খেলার দ্বিতীয়ার্ধে সেটাই করলেন লিও। নিকোলাস ওটামেন্ডির গোলে তাঁর অ্যাসিস্ট। আর্জেন্টিনা এগিয়ে গেল ১-০। এরপর নিকো পাজকে গোলের সুযোগ করে দেওয়ার আগে তাঁর সেই ম্যাজিকাল টাচ, ২-০। তারপর শেষটিও যেন নিজের মতো করে কবিতা লিখলেন মেসি। পেনাল্টি থেকে গোল, ৩-০।
সতীর্থরা তাঁকে ঘিরে গোল হয়ে দাঁড়ালেন। যেন জন্মদিনের কেকের চারপাশে সবাই। মেসি হাসছেন। সতীর্থরা তাঁকে মধ্যমণি করে রেখেছেন। জাতীয় দলের জার্সিতে তাঁর ১২৬তম গোল। দিদিমার জন্য এদিনের আরও একটি গোল। মেসি শুধু একজন ফুটবলার নন, তিনি একটি সোনালি প্রজন্মের প্রতিনিধিও। যাঁর খেলা দেখলে দিনআনা দিন খাওয়া মানুষও আনন্দ করেন, আবার কর্পোরেট মালিকও কোটি টাকার টিকিট কেটে মাঠে যান সাধারণ দর্শক হিসেবে। সেই মানুষটাই আর আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে মাঠে নামবেন না, আজ তাঁর জন্য সবাই কাঁদছে, কাঁদছে গোটা পৃথিবীও!
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার সিনিয়র ক্রীড়া সাংবাদিক। দুটি ফুটবল বিশ্বকাপ এবং দুটি ক্রিকেট বিশ্বকাপ কভার করা এই সাংবাদিকের একাধিক আরও আন্তর্জাতিক ইভেন্ট করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে। শুভ্র দুটি বইও লিখেছেন, একটা বিশ্বকাপের গল্প যুদ্ধ এবং শেষটি স্বপ্নের নায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো।
