শেষ আপডেট: 20 April 2026 16:45
মানুষ বিচিত্র, বিচিত্র তার মন। মানুষই লেখে ইতিহাস। তাই তার ইতিহাসও বিচিত্র।
জুলাই-এর এক দুপুরে হঠাৎই
১৫১৮ সালের জুলাই মাসের ১৪ তারিখ। ফ্রান্সের স্ট্রসবুর্গের সরু পাথর বিছানো নির্জন রাস্তা শুয়ে আছে অলসভাবে। ফ্রাউ ট্রফেয়া বেরিয়ে এলেন তাঁর বাড়ি থেকে। সাথে তাঁর মেয়ে ফ্রাউলিন এমা গোওৎজ। নৈঃশব্দকে সাক্ষী রেখে ফ্রাউ আর ফ্রাউলিন আচমকা রাস্তায় শুরু করলেন নাচ। কোনও সঙ্গীতের আবহ নেই, তাঁরা নাচতে লাগলেন এক অস্বাভাবিক ও অনিয়ন্ত্রিত ভঙ্গিমায়। সে নাচে না আছে কোনও নির্দিষ্ট ছন্দ, না কোনও বিশেষ অভিব্যক্তি। যেন নাচের জন্যই নাচ। দিন গড়িয়ে রাত, রাত গড়িয়ে আবার সকাল–ধীরে ধীরে সেই নাচে যোগ দিতে লাগলেন আরও মানুষ, প্রতিবেশী, অচেনা পথচারী। এভাবে চলে গেল এক সপ্তাহ। কিন্তু নাচ থামল না। ততদিনে জুটে গেছে আরও প্রায় তিরিশ জন। সকলে নেচে চলেছেন অবিরাম, অক্লান্ত। কিন্তু সে ছিল ঘটনার সূত্রপাত, যা পরে এক ভয়ানক আকার ধারণ করে থেকে যাবে ইতিহাসের পাতায়।
অগস্ট ১৫১৮
ট্রফেয়া শুরু করেছিলেন যে অবিরাম নাচ, তা থামল না। সে নাচের প্রকৃতি যেন অনিচ্ছাকৃত মাংসপেশীর চলনের (involuntary muscle movements) মত যা আর নাচিয়েদের নিয়ন্ত্রণে নেই। অবিরাম হাত পা ছুড়ে যাওয়া শুধু। এক মাসে এই ঘটনার শিকার হলেন আরও প্রায় চারশো মানুষ। অস্বাভাবিক ঘাম, পা থেকে অবিরাম রক্তক্ষরণ আর দুচোখে অভিব্যক্তিহীন শূন্য দৃষ্টি। কিন্তু কুছ পরোয়া নেহি।

স্বাভাবিক কারণেই অসুস্থ হতে শুরু করলেন একে একে। আকস্মিক হার্ট অ্যাটাকে, খিদে-তৃষ্ণায়, শরীর থেকে অতিরিক্ত জল বেরিয়ে গিয়ে একে একে ঢলে পড়লেন মৃত্যুর বুকে। প্রতিদিন প্রায় ১৫ জন মানুষ মারা যেতে থাকলেন, যদিও সঠিক সংখ্যা আজও অজানা রয়ে গেছে আরও অনেক কিছুর মত। নাচের মরণ-ফাঁদ জন্ম দিল মহামারীর, যা ইতিহাসে ‘ডান্সিং ম্যানিয়া’ বা ‘ডান্সিং প্লেগ’ বলে পরিচিত হয় পরে।
রহস্য
অনেক সপ্তাহ ধরে চলতে থাকা এই ‘মরণ-নাচ’ অবশেষে কর্তৃপক্ষের নজরে এল। চিকিৎসক, স্থানীয় বৃত্তান্ত, সিটি কাউন্সিলের রিপোর্ট ইত্যাদিতে মানুষ যে অবিরত নাচছিলেন তা নিশ্চিতভাবে বলা হলেও নাচের নির্দিষ্ট কারণ অজানাই রয়ে গেছে।
গিল্ডের পদক্ষেপ
দাবি রয়েছে, গিল্ড হলগুলো সংস্কার করা হয় ও নাচে আক্রান্ত মানুষদের সেখানে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। পাশাপাশি সঙ্গীতশিল্পী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের আনা হয় যাতে নাচের উন্মাদনায় আক্রান্তদের কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করে নাচ বন্ধ করা যায়। কিছু পেশাদার নৃত্যশিল্পীকেও ‘মরণ-নাচ’-এর দলে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়।
কিন্তু ফল হল উলটো। মানুষজন বিশ্বাস করতে শুরু করল যে এটি ‘সেন্ট ভিটাস’-এর শাস্তি। এই ভয়ে ও ‘পাপমুক্ত’ হওয়ার আশায় আরও অনেকে এই ‘নাচ-মহামারী’তে যোগ দিল।
১৫১৮ সালের অগস্টের শেষ নাগাদ প্রায় ৪০০ জন এই উন্মাদনায় আক্রান্ত হন। শেষ পর্যন্ত তাদের গাড়িতে তুলে একটি ‘আরোগ্য তীর্থস্থানে’ নিয়ে যাওয়া হয়। সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে এই মহামারী ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে ও থেমে যায়।
তত্ত্ব ও তথ্য
১৯৫২ সালে প্রকাশিত ‘Religious Dances in the Christian Church and in Popular Medicine’ বইটির লেখক ইউজিন ব্যাকম্যান (Eugene Backman) নৃত্য-উন্মাদনার একটি জৈবিক বা রাসায়নিক উৎস খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছিলেন। সেই সময় ব্যাকম্যান এবং অন্যান্য বিশেষজ্ঞরা কারণ হিসেবে বলেন, সবচেয়ে সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো এক ধরনের ছত্রাক, যা স্যাঁতসেঁতে রাই শস্যের কাণ্ডে জন্মায় ও খাবারের সাথে খাওয়া হলে এটি তীব্র খিঁচুনি ও বিভ্রম সৃষ্টি করতে পারে।
‘A Time to Dance, a Time to Die: The Extraordinary Story of the Dancing Plague of 1518’ বইয়ের লেখক জন ওয়ালার (John Waller) ব্যাকম্যানের তত্ত্বকে নাকচ করে দেন। তিনি বলেন, ছত্রাকের প্রভাবে দিনের পর দিন এভাবে নেচে যাওয়া অসম্ভব।
অস্ট্রেলিয়ার জেমস কুক বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট বার্থলোমিউ (Robert Bartholomew)-এর মতে নাচতে থাকা মানুষ একটি ধর্মদ্রোহী আচার (ritual) পালন করছিলেন। কিন্তু জন ওয়ালার এর বিরোধিতা করে বলেন, ‘নৃত্যকারীরা নাচতে চেয়েছে, এমন কোনো প্রমাণ নেই। বরং, লিখিত বর্ণনা অনুযায়ী, তারা ভয় ও হতাশা প্রকাশ করছিল।’
ওয়ালার অনুমান করেন যে এই নাচ ছিল ‘মানসিক চাপজনিত বিকার’ (stress-induced psychosis) যা গণপর্যায়ে ঘটে। কারণ যে অঞ্চলে এই নাচের ঘটনা ঘটেছিল সেখানে দুর্ভিক্ষ ও রোগব্যাধি সে সময়ে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং সেখানকার মানুষজন কুসংস্কারপ্রবণ ছিলেন। মধ্যযুগীয় সময়ে একই অঞ্চলে নাচের মহামারীর আরও সাতটি ঘটনার রিপোর্ট পাওয়া যায়।
কিন্তু কারণ যাই হোক, ইতিহাস সাক্ষী হয়ে রইল এক বিরল ঘটনার, এক বিরল মহামারীর।