ব্রিটিশ আমলে রাইটার্স বিল্ডিং। ছবি - Google
১১ই জুন, ২০২৬
কলকাতা মানেই আজ যানজট, ব্যস্ততা, পুরনো বাড়ি আর নস্টালজিয়ার শহর। কিন্তু একসময় এই শহরের গুরুত্ব ছিল এতটাই যে, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বহু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ছায়া পড়ত হুগলির তীরে। ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, উনিশ শতকের শেষভাগে ইউরোপের বহু লেখক ও প্রশাসক কলকাতাকে উল্লেখ করতেন, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ শহর হিসেবে। প্রথমটি অবশ্যই লন্ডন।
শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও, এক সময় কলকাতার গুরুত্ব ছিল এমন যে, লন্ডনের পর এটিই ছিল ব্রিটিশ শাসনের অন্যতম শক্তিকেন্দ্র।
১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের পর বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রভাব দ্রুত বাড়তে শুরু করে। এরপর ১৭৭২ সালে গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস প্রশাসনিক রাজধানী হিসেবে কলকাতাকে প্রতিষ্ঠা করেন। সেই সিদ্ধান্তই বদলে দেয় শহরের ভাগ্য।
কলকাতার উত্থানের পিছনে ছিল তার ভৌগোলিক অবস্থান। হুগলি নদীর তীরে অবস্থিত এই বন্দর ছিল ভারতবর্ষের পূর্বাঞ্চলের প্রবেশদ্বার। ইউরোপ থেকে জাহাজ এসে ভিড়ত কলকাতা বন্দরে। আবার এখান থেকেই আফিম, নীল, পাট, চা, কয়লা ও তুলোর মতো বিপুল সম্পদ রফতানি হত বিশ্বের নানা দেশে।
উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে কলকাতা বন্দর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্যতম ব্যস্ততম বন্দর হিসেবে পরিচিতি পায়। লন্ডনের আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সাংহাইয়ের ব্যবসায়ী— সকলের নজর ছিল কলকাতার বাজারে।
ইতিহাসবিদদের মতে, ব্রিটিশ ভারতের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের বড় অংশ নিয়ন্ত্রিত হত এই শহর থেকেই। ফলে কলকাতা শুধু একটি শহর ছিল না, ছিল সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক ইঞ্জিন।

কলকাতার চৌরঙ্গি, এসপ্ল্যানেড কিংবা ডালহৌসি স্কোয়ার— এই অঞ্চলগুলি একসময় ইউরোপীয় আভিজাত্যের প্রতীক ছিল। প্রশস্ত রাস্তা, গ্যাসবাতি, ঘোড়ার গাড়ি, ক্লাব সংস্কৃতি, অপেরা, বলরুম— সব মিলিয়ে ব্রিটিশরা কলকাতাকে সাজিয়েছিল নিজেদের সাম্রাজ্যের প্রদর্শনী হিসেবে।
রাজভবন নির্মিত হয় ব্রিটেনের অভিজাত প্রাসাদের আদলে। তৈরি হয় রাইটার্স বিল্ডিং, ফোর্ট উইলিয়াম, টাউন হল, সেন্ট জনস চার্চ, পরে কলকাতা হাইকোর্ট। অনেক বিদেশি পর্যটক সেই সময় কলকাতাকে বলতেন— City of Palaces বা প্রাসাদের শহর।
শুধু প্রশাসন বা ব্যবসা নয়, শিক্ষাক্ষেত্রেও কলকাতা ছিল অগ্রণী।
১৮৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। একই সময়ে গড়ে ওঠে প্রেসিডেন্সি কলেজ, হিন্দু কলেজ, মেডিক্যাল কলেজের মতো প্রতিষ্ঠান। আধুনিক শিক্ষার প্রসারে কলকাতা হয়ে ওঠে গোটা এশিয়ার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।
এই শহরেই জন্ম নেয় বাংলার নবজাগরণ। রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর— আধুনিক ভারতের চিন্তাধারার বড় অংশের উৎস খুঁজে পাওয়া যায় কলকাতাতেই।
তবে এই ঐশ্বর্যের অন্য মুখও ছিল। একদিকে ছিল সাহেবপাড়া, বিশাল প্রাসাদ, ইউরোপীয় জীবনযাপন। অন্যদিকে উত্তর কলকাতার ঘিঞ্জি জনবসতি, শ্রমিক মহল্লা ও দরিদ্র মানুষের জীবনসংগ্রাম। ব্রিটিশ শাসনের অর্থনৈতিক বৈষম্য সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যেত কলকাতার রাস্তাতেই। ‘হোয়াইট টাউন’ এবং ‘ব্ল্যাক টাউন’-এর বিভাজন ছিল ঔপনিবেশিক সমাজব্যবস্থার নগ্ন প্রতিচ্ছবি।
১৯১১ সালে দিল্লি দরবারে ব্রিটিশ সম্রাট পঞ্চম জর্জ ঘোষণা করেন, ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে দিল্লিতে।
সরকারি যুক্তি ছিল প্রশাসনিক সুবিধা। কিন্তু ইতিহাসবিদদের বড় অংশ মনে করেন, বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলন, স্বদেশি আন্দোলনের উত্থান এবং ক্রমবর্ধমান বাঙালি জাতীয়তাবাদ ব্রিটিশদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছিল। রাজধানী সরিয়ে নেওয়া ছিল সেই রাজনৈতিক চাপ সামাল দেওয়ারও কৌশল।

কলকাতার ঐতিহাসিক গুরুত্ব আজও অমলিন। এই শহরই দিয়েছে রবীন্দ্রনাথ, স্বামী বিবেকানন্দ, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, জগদীশচন্দ্র বসুর মতো ব্যক্তিত্বকে। এখান থেকেই ছড়িয়েছে স্বাধীনতা, শিক্ষা ও সামাজিক সংস্কারের বহু ধারা।
তাই কলকাতাকে শুধু একটি শহর বললে ভুল হবে। একসময় এটি ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পূর্বাঞ্চলীয় শক্তিকেন্দ্র, অর্থনীতির চালিকাশক্তি এবং বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের রাজধানী। সেই কারণেই ইতিহাস আজও কলকাতাকে মনে রাখে এক বিশেষ পরিচয়ে— “লন্ডনের পর সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় শহর”।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অনলাইন বাংলা ম্যাগাজিন।